Sunday, 19 February 2017

তিতিরের মাম্মা


 


সেই কার্পেট কান্ডের পর থেকে নিজের ক্ষমতা ও প্রতিভা সম্বন্ধে ধারণাটা যাকে বলে গগনচুম্বী হয়ে গেছে। কার্পেট কাণ্ড জানেন তো, সেই যে বন্ধু দেখাল, সামনে কার্পেট বিপজ্জনক রকম উঁচুনীচু হয়ে আছে, আর আমি ধীর স্থির ভাবে “দেখেছি” বললুম, তারপর নিখুঁত তাক করে সেই লটঘটে পা ঢুকিয়ে রাম-হোঁচট খেয়ে ফেললুম? তারপর থেকে এটা মোটামুটি মেনে নিয়েছি যে আমি নিজেই জানি না আমি কি কি করতে পারি।

এই যেমন গতকাল। নিদ্রাকাতর পরিশ্রান্ত অবস্থায় বহুবার নেমন্তন্ন খেয়ে ফিরেছি রাত্রে। কিন্তু কালকের মত কাণ্ড হয়নি তো কক্ষণো!

সে এক রহস্যময় ব্যাপার। যদিও সরাসরি নয়, তবে তাতে তিতিরেরও একটা জরুরী ভূমিকা ছিল বইকি।

হল কি, ফিরে কন্যাকে পরিপাটি করে শুইয়ে দিয়েছি। দিয়ে নিজে কাঞ্চন-কাঞ্জীভরম মুক্ত হয়ে, ল্যাগব্যাগে নাইটি গলিয়ে, শুয়ে পড়ার আগে একটু চোখমুখ সাফাই করতে গেছি।

তুলো নিলুম। তাতে অনেকটা গোলাপজল ঢেলে, কাজল লিপস্টিক ঘাম সব বেশ করে ঘষে ঘষে তুলতে লেগে গেলুম। কপাল থেকে নামতে নামতে ঠোঁট অবধি পৌঁছেছি, হঠাৎ মনে হল খুব গরম লাগছে।

সেটা তো হবার কথা নয়! রোজ ওয়াটার দিলে তো একদম ফ্রেশ ফুরফুরে লাগে! তার ওপর শীতকাল, তায় রাতের বেলা – এমনিই ঠান্ডা লাগার কথা!

ভাবছি আর তুলো চালাচ্ছি, আর আয়নায় দেখছি মুখটা ক্রমশ আরো আরো আরো চকচকে হয়ে যাচ্ছে!

ভূতুড়ে ব্যাপার নাকি! হচ্ছেটা কি!

হবে আবার কি! ডাবর গুলাবারি আর জনসন্স বেবি অয়েল দুটোই একরকম দেখতে গোলাপি ঢাকা দেওয়া শিশি যে! তাদের মোটেও পাশাপাশি থাকার কথা নয়, কখনোই নয়, কিন্তু তিতির সকালে মায়ের ড্রেসিং টেবিল গুছিয়ে দিয়েছিল কিনা ভালবেসে!

(এই অবধি পড়ে যাঁরা খ্যাঁকশিয়ালের মত হাসির মওড়া দিচ্ছে, তাঁরা আরেকটু ধৈর্য ধরে বসুন দিকি।)

এবার আর রাত্তির না, ঘোর দিনের বেলা। ঘুম পাওয়ার কোন সীন নেই, রীতিমত মাছের বাজার সবজি দোকান সব ঘুরে টুরে চাগিয়ে চাঙ্গা হয়ে আছি। তৃতীয়বার বেরিয়েছি মুদিখানার সামগ্রী কিনতে। এবারে কন্যারত্নটি লেজুড় হয়ে এসেছেন সঙ্গে।

“মা মা দ্যাকো দ্যাকো ডাস্টবিন!”

চচ্চড়ে রোদে চরে বেড়াচ্ছি সেই থেকে, দুধ কফি শ্যাম্পু ইত্যাদি প্রভৃতির এক ভারি ব্যাগ হাতে, চা-তেষ্টায় গলা কাঠ, মাথায় তাড়া আরো গন্ডাখানেক বিচ্ছিরি কিন্তু জরুরি কাজের, এখন এসব আদিখ্যেতা ভাল্লাগে? ডাস্টবিন একটা দ্যাখার জিনিস হল? নাকি আমি ইহজীবনে সেটা দেখিনি? বোলে তো, গোটা জীবনটাই কালো প্যাকেট মুড়ে উক্ত বস্তুতে পাঠিয়ে দিতে ইচ্ছে করে মাঝে মধ্যে! দিলুম এক রাম ধমক -

“চ চ আর ডাস্টবিন দেখতে হবে না!”

মিনিট পাঁচেক চুপ করে পাশাপাশি চলার পর মেয়ের ক্ষুব্ধ ক্ষুণ্ণ অভিযোগ, “তুমি দেখলেই না! ও কিন্তু আমার ব্যামের ক্লাসে পড়ে।”

‘ব্যামের ক্লাসে’ কি করে পড়া যায়, সে কি জীবনের নানা ওঠাপড়ার পড়া; মনে তৎক্ষণাৎ উদয় হওয়া এসব কূট প্রশ্নকে পাত্তা না দিয়ে বললুম, “কে? কাকে দেখলুম না?”

“ঐ যে? দোকানে দাঁড়িয়ে ছিল? মাথায় পাগ্‌গি?”

আবছা মনে পড়ল, একটি কচি সর্দারবালক ‘মাথায় পাগ্‌গি’ সহ দোকানের মুখে মায়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিল বটে! আমি তাদের পাশ দিয়েই সড়াৎ করে ঢুকে মালপত্তর তুলে এনেছি ঝড়ের গতিতে। চলে আসার সময়ে, অতিসজ্জিতা মা-টি যে আমার দিকে একটি জ্বলন্ত কোপকটাক্ষ নিক্ষেপ করেছিলেন সেটাও মনে পড়ল এইবার। তা নিত্য্ সময়াভাবের চাপে, এরকম গেরিলা অ্যাটাক আমি করেই থাকি। সবাইই করে। যস্মিন দেশে যদাচারঃ! কিন্তু সে বালক যে আমার মেয়ের এক্সারসাইজ গ্রুপে ব্যায়ামবীর হবার সাধনায় রত, সে আমি জানব কেমন করে?

“বলবি তো সেটা! দেখতুম তাহলে।”

“বঁল্লুঁম তোঁ! ঐ যে বল্লুম না, দ্যাকো ‘জসমিন’?”

জসমিন?

জসমিন!!!

জসমিন।

হুম।

ভাবছি আগামী অন্তত এক সপ্তাহ দেরি করে বাড়ি ফিরব, যাতে কোনমতেই “ব্যামের ক্লাস” ফেরত মাতাপুত্রের সাথে দেখা না হয়।

Sunday, 22 January 2017

কথাবার্তা


একটি শিশুকে দেখতে চলেছি আমি আর তিতির। আমার সহপাঠী বন্ধুর খোকা্‌, সে ছেলের জন্ম হয় যখন তখন আমরা দেশের বাইরে ছিলুম। তাপ্পর গত কয়েক মাস ধরে যাচ্ছি যাব করে করে এদ্দিনে হয়ে উঠল। একা নই, সঙ্গে আরেক সহপাঠী ও তার গিন্নী। এই আঙ্কল আন্টি তিতিরের বড় প্রিয়, কারণ ওর সব উৎপাত ওরা শুধু হাসিমুখে সহ্যই করে না, রীতিমত উৎসাহ দেয় উলটে। তবে তিতির কিনা তিতির, তাই গাড়ি ছাড়তে না ছাড়তেই আন্টিকে একটা ঝটকা দিয়ে দিল।


আন্টি বড়ই ভালমানুষ, সে শুধু বলতে গেছিল, “তোমার ওখানে একটা বন্ধু হবে, বেশ খেলা করতে পারবে...”

“কে গো? কে গো মা?”

“ওই যে, আমরা যাকে দেখতে যাচ্ছি!”

“ দ্যূৎ! ওটা তো বেবি!”

তারপর আন্টির দিকে ফিরে পরম গম্ভীরভাবে, “আমি ফাইব ঈঈর্স হয়ে গেছি, জানো না?”

-----

বোম্বের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত যাত্রা। প্রতিবার এমন জার্নি করলেই মনে হয় শরীরে এত হাড়গোড় কেন যে আছে! তিতির যথারীতি মাথা খেয়ে ফেলছে “আর কদ্দূর” করে করে। অগত্যা অক্ষর দিয়ে শব্দ বলার খেলা খেলতে শুরু করি।

“পা” – তিতির বলে।

“পাহাড়” – আন্টি জোড়ে।

“পাতাল” – আমার ফোড়ন। প্রবেশের ইচ্ছাসহ।

“পাপোশ” – সামনের সীট থেকে আঙ্কল।

এইভাবে ‘পাখি’, ‘পালকি’, ‘পাথর’ করে করে পা-এর সম্ভার ফুরিয়ে যায়। আঙ্কল এবার নতুন অক্ষর দেয় – ‘কি’।

কিছুই মনে পড়ছে না যে! ও হ্যাঁ, ‘কিছু’!

“কি! চাবি!” – তিতিরের দাবি।

না তিতির, ওটা ইংলিশ। বাংলা বল।

“কিলবিল” – আন্টি এতক্ষণ ভেবে বার করে।

বলামাত্র তিতির এইসা কিলবিল করার ডেমো দিতে থাকে যে আমার হাত থেকে চশমার খাপ, আন্টির হাত থেকে জলের বোতল এবং তিতিরের পা থেকে জুতো খসে পড়ে যায়।

কিন্তু আর যে কিছু মনে পড়ছে না আমার, ‘কিষাণ বিকাশ পত্র’ ছাড়া!

আঙ্কল সামনে থেকে বলে ‘কিষ্কিন্ধ্যা’।

তিতিরকে বোঝাতে হয় সেটা কি। রামায়ণ দেখা, তাই অসুবিধে হয় না। ওদিকে আঙ্কল মুডে এসে গেছে। এবার বলে, “কিচক!”

এটা আমি প্রতিবাদ করতে বাধ্য হই। “ক এ ঈ তো সেটা। হবে না!”

আঙ্কল অদম্য। বলে, “কিংকর্তব্যবিমূঢ়!”

এমন শব্দাঘাতে কিনা জানি না, তিতির এর পর ঘুমিয়ে পড়ে। আরো কতক্ষণ ধরে গাড়ির স্রোত পেরিয়ে, সিগনালে গোঁত্তা খেয়ে খেয়ে, জি পি এসের চক্করে চক্কর কেটে অবশেষে গিয়ে পৌঁছই।

-----

আহা কি মিষ্টি বেবি গো! কিন্তু তাকে নিয়ে বেশিক্ষণ খেলতে পারলুম না, আমার বেবিটির ক্ষুধার উদ্রেক হইয়াছে। ভাতের থালা নিয়ে বসে পড়ি।

বসে একটু বেকায়দায় পড়ি। যাই দেখাই মেয়ে ডুগডুগ করে মাথা নেড়ে বলে ‘এটা খাব না’।

ওদিক থেকে বন্ধুর প্রস্তাব – “ও না খেতে চাইলে আমায় বলিস।”

তোকে? মানে তুই খাইয়ে দিবি? এত খুশি বহুকাল হইনি। রীতিমত কৃতজ্ঞ বোধ করতে থাকি।

“ও যা যা না খাবে আমি খেয়ে নেব।”

অ্যাঁ!!! ধুত্তোর...বাজে বদ রেকারিং ডেসিমেল কোথাকার!

এমনকি তিতিরও ফ্যাক ফ্যাক করে হেসে ফ্যালে আঙ্কলের কথা শুনে।

----------

আরো দুই খুকি আসে অভ্যাগত হয়ে। একজন তিতিরের চেয়ে একটু বড়, অন্যজন একটু ছোট। ভাব হতে বেশি সময় লাগে না। তিতির অলরেডি একটা পিঙ্ক ডলফিন সফট টয় জোগাড় করে ফেলেছিল এসেই, দ্বিতীয়া দেখি একটা রাবারের ফোলানো মাছ পেয়েছে কুড়িয়ে। দুজনে সে দুটো ঠেকিয়ে “পিঙ্ক পিঙ্ক ম্যাচিং ম্যাচিং” করছে দেখে আমি, সরল, নিরীহ, দরদী হৃদয়ে তৃতীয়াকে বলতে গেলুম, “তোমার জামাটা তো পিঙ্ক, ম্যাচিং ম্যাচিং!”

তিনি অবিকল তিতিরের মত ভ্রূ কুঁচকে আমায় ধমকে দিলেন, “পিঙ্ক নয়, পীচ।”

অসীম লজ্জায় পড়ে যাই। এই ধেড়ে বয়েসেও এসব বর্ণবিচার করতে পারি না, কি হবে বল দিকি আমার!

ওদিকে তিতির জিগ্যেস করতে থাকে, পানের পিচ কি এমন রং এর হয়, কারণ রাস্তার পিচ তো কালো মানে ব্ল্যাক! হাসি টাসি চেপে বোঝাই যে এটা সেসব নয়, এমনকি আঙ্কলরা যা নিয়ে এত চিন্তিত সেই ক্রিকেট মাঠের পিচও না, এটা একটা ফলবিশেষ। তাতে বিশেষ হুকুম হয় যে শিগগির যেন সেটা এনে দেখাই।

---------

তিনকন্যার তুমুল হট্টরোলে বেবির গেল ঘুম ভেঙ্গে।অমনি খুদে দিদিদের দাবি, তারা বেবিকে কোলে করবে। তাদের খাটের ওপর সেট করে, অনভ্যস্ত কোলে বেবিকে দিয়ে কটা ছবি তোলা হয় – তিন ত্রস্ত মা আশেপাশে ফিল্ডারের ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে থাকে।


যেই না ছবি তোলা শেষ হয়েছে, তিতির দেখি বাকি দুজনের হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে, “চল এবার আমরা কথাবার্তা বলি।”

---------------

কি কথাবার্তা হয় সারাদিন ধরে জানি না। মাঝে মাঝে ঝড়ের মত তিনজন বেরিয়ে আসে, আমাদের সোফার চারদিকে বোঁ বোঁ করে ঘুরপাক খায়, তারস্বরে হাসে, মিছিমিছি টুপি খুলে আমাদের ‘বাও’ করে, আবার ঘরে ঢুকে সেই মিস্টিরিয়াস ‘কথাবার্তা’ বলতে লেগে যায়।

সে কথাবার্তার কিছু নমুনা পাই বিকেলে, তিতিরের চুল বাঁধতে বসে। আমি খাটে থেবড়ে বসেছি (আমার যা নধরকান্তি তনু, ধেবড়ে বসেছি বললেই হয়তো বেটার হয়।) আমার সামনে তিতির বাবু হয়ে, পিঠ ফিরিয়ে, আর তার সামনে তার নতুন বান্ধবী, সেও পরিপাটি বাবু, আমাদের দিকে ফিরে। কেশচর্চা করতে করতে শুনে যাই,

“আমার ডলফিন আছে।”

“আমারও আছে।”

“আমার এলিফ্যান্ট আছে।”

“আমারও আছে।”

“আমার দুটো আছে।”

“আমার তিনটে...না, চারটে আছে।”

এতগুলো ঢপ, এই আশায় বান্ধবী আমার দিকে সসংশয়ে তাকায়। তিতিরও আধখানা ঘুরে যুদ্ধং দেহি ঢং এ তাকায় (চুলের গোড়া আমার হাতে তাই পুরো ঘুরতে পারে না।) তাল মিলিয়ে বিনুনি সামলাতে গিয়ে ডি এন এর মত পেঁচিয়ে যাওয়া অবস্থায়  বলতে বাধ্য হই যে সত্যিই চারটে আছে বটে।

“আমার এলিফ্যান্টগুলো তোরগুলোর চেয়ে অনেক বড় বড়!”

“বড় না।”

“বড়!!!”

“আমার খাসনবীশ আছে!”

“কি?”

“খাসনবীশ”

(আমি প্রাণপণে হাসি চাপছি)

“কিইই??”

“খাসনবীশ। ভ্যাবাচ্যাকা খাসনবীশ।”

(পুরো মাই নেম ইজ বন্ড। জেমস বন্ড।)

বালিকা নিজেই ভ্যাবাচ্যাকা হয়ে আমার দিকে আকুল চোখে তাকায়। বুঝিয়ে বলি যে তিতিরের একটা হাসিমুখো কাপড়ের পুতুল আছে, তার নাম ভ্যাবাচ্যাকা খাসনবীশ।

ও বাবা, এ খুকু দেখি অপ্রতিরোধ্য! বুঝে নিয়েই বলে বসে,

“আমারও আছে।”

“হতেই পারে না! তোর নেই!”

“আছে! আমারও অমন ডল আছে। আমি আজ গিয়েই তার নাম ভ্যাবাচ্যাকা খাসনবীশ করে দেব।”

বোঝো!

মনে পড়ল কিছুকাল আগে, একটি কচি বছর দেড়ের স্বল্পভাষী কন্যা বেড়াতে এসে তিতিরের খেলনাসমূহ দেখে গেছিল। খাসনবীশ কেও। তার কিছুদিন পর তার মা মেসেজ করে জানালেন সে তিনি একটি নতুন ডল প্রাপ্ত হইয়াছেন, এবং পাওয়ামাত্র নির্দ্বিধায় নাম ঘোষণা করেছেন, “ভ্যাবাচ্যাকা!” এই রেটে চললে, অচিরাৎ সব চেনাজানা শিশুর বাড়িতে এক পীস করে ভ্যাবাচ্যাকা খাসনবীশ অধিষ্ঠান করবে, যা দেখছি!

এদিকে তিতিরের চোখের জল প্রায় গড়িয়ে পড়ে আর কি! আঁই আঁই করে নালিশ করে যাচ্ছে ভ্যাবাচ্যাকার ওপর এরকম আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। ওদিকে আমি সবে একখানা বিনুনি শেষ করে অন্যদিকেরটা পেঁচাতে শুরু করেছি, এখন স্থিরমাথায় বসিয়ে রাখতে না পারলে চিত্তির! সুতরাং কথা ঘুরিয়ে দিই।

“জানিস তো, আমাদের বাড়ির পাশে না, একটা আমগাছ আছে।”

“আমাদেরও আছে।”

ভারি খুশি হই। এমন লড়াকু ছানা আমার ভারি পছন্দ। কিন্তু তিতির ফুঁসে ওঠে,

“তাতে কাঠবিড়ালি আছে।”

প্রতিপক্ষ একটু মিইয়ে যায়। তিতির তাতে আরো উৎসাহিত হয়ে ওঠে,

“কাঠবিড়ালি আছে, মাংকি আছে, টিয়াপাখি আছে।”

“সত্যিকারের টিয়াপাখি?”

“হ্যাঁ তো! অনেক আছে। ট্যাঁ ট্যাঁ করে ডাকে না?”

শান্তিস্থাপনার সুযোগ পাওয়া গেছে, ছাড়ি!

“তিতির বন্ধুকে বল আমাদের বাড়ি আসতে? টিয়াপাখি দেখবে?”

তিতির ভারি খুশি হয়ে ‘নেওতন্ন’ করে ফ্যালে। সে বালিকা ততোধিক খুশি হয়ে সে ‘নেওতন্ন’ গ্রহণ করে ফ্যালে। আহ্লাদে গলে জল হয়ে দুজনে দুজনের হাত জড়িয়ে ধরে বসে থাকে, কে বলবে এইমাত্র শিং এ শিং ভেড়ার লড়াই হচ্ছিল! আমি সেই ফাঁকে শিং এর, মানে বিনুনির বাকিটুকু শেষ করে, দুদিকে দুটো ক্লিপ আটকে স্যাট করে পালাই।

পাগল! আর উলুখাগড়া হবার রিস্ক নিতে আছে, এক্ষুণি ‘কথাবার্তা’ শুরু হল বলে আবার!
  
 

Tuesday, 6 December 2016

ভারতমাতা


ফ্যান্সি ড্রেস নিয়ে প্রতি বছর কি যে ফ্যাসাদে পড়ি সে আর কহতব্য নয়। আরে ঐ যে বচ্ছর বচ্ছর ইশকুলে হয় গো? যাতে সারি সারি গলায় স্টেথো মিনি-ডাক্তার, টপ হ্যাট ম্যাজিশিয়ান থেকে শুরু করে গাউন নিয়ে লটপট করা ব্যক্তিত্বময় বিবেকানন্দ, ক্ষীণতনু চার্লি চ্যাপলিন থেকে আরম্ভ করে নাদুশনুদুশ কেষ্টঠাকুর, আর মেয়েমহলে পিঠে ডানা হাতে জাদুদন্ড পরী, নাকে নথ বালিকা বধূ থেকে আদি নীল-সাদা শাড়ির হকদার মাদার টেরিজা অবধি ঘুরে বেড়ায়, স্টেজে উঠে ভাষণ দেয় তবে সুখের কথা তিতির কিনা এখনো বাচ্চা, ওদের শুধু স্টেজে উঠে একটা পোজ দিয়ে দাঁড়ালেই চলে, কিছু বক্তব্য পেশ করতে হয় না।
    কিন্তু পোজ দিতে হলেও তো কিছু একটা সাজতে হবে? ধরে নাও আমি একটা জিবেগজা, কি ইলেকট্রন, কি মিসিং লিংক – বলে দাঁড়িয়ে পড়লেই যদি ল্যাঠা চুকে যেত! আচ্ছা কেন যায় না বলুন তো, আমি তো দিব্যি ‘এই মনে কর আমি একটা গাছ’ বলে হাত টাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়ি, আর তিতিরও দিব্যি ‘আর আমি একটা কুইরেল’ বলে তর তর করে ভুঁড়ি বেয়ে কোলে উঠে পড়ে। কিংবা তিতির বলে ‘মনে কর আমি একটা চিতাবাঘ’, আমিও অমনি দেখতে পাই গায় চাকা চাকা দাগওলা এক অতি বিচ্ছু ছানা-চিতা, রাজকীয় চালে যেতে যেতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়েছে, ল্যাজের ডগাটা একটু একটু নড়ছে, এমনকি বেঘো গন্ধটাও নাকে পেয়ে যাই। কিন্তু তিতিরের ক্লাসের ছানাপোনাগুলো যদি বা এসব দেখতে পারে, তাদের বাবা মা বা টীচাররা দেখতে পাবেন আশা করা বাতুলতা।
অগত্যা মেয়েকে বেশ একটা খোলতাই দ্রষ্টব্য কিছু রূপ ধারণ করাতে হবে – মানে ভেবেচিন্তে চরিত্র চিত্রায়ন থেকে নাট্যরূপ প্রদান, মায় ফার্স্ট (ও একমাত্র)এডিশন পাবলিশ করা অবধি সব আমার আর তিতিরের দিম্মার হোমটাস্ক! দু সপ্তাহ ধরে দুজনে প্রাণ ভরে মস্তক ঘর্মাক্ত করতে লাগলুম, আর তিতির প্রতিদিন নতুন নতুন দাবি করতে লাগল। তার অনেকগুলোই খারাপ না, কিন্তু ঐ যে আমার মাথায় ক্যারাপোকা এবং বাজারে কিঞ্চিৎ ক্রিয়েটিভ বদনাম আছে, যেটা সম্বন্ধে আবার কোন পাপের ফলে কে জানে তিতিরের টীচার মহলও ওয়াকিবহাল, ফলে চেনাজানা ‘প্রজাপতি’ (খুব সহজ বানানো, রেডিমেড ডানা, অ্যান্টেনা সব আছে), ‘ফেয়ারি প্রিন্সেস’ (ওই ডানা দিয়েই চলবে, আর জুহু থেকে কেনা পেন্সিলের মাথায় স্টার, আর কাগজ কেটে মুকুট) বা ‘রাধা’ কি ‘মীরাবাই’ (সেম ঘাগরা মেকাপ আর কান্নিক মেরে চুল বাঁধা, খালি একটু গয়নাগাটির রকমফের ব্যাস!) করতে তো মন চাইছে না!
ফলে কিছুদিন এই চলল -
“ক্যাটারপিলার! মা আমি ক্যাটারপিলার হব!”
সবুজ চার্টপেপার কিনতে হবে তাহলে, গোল গোল কেটে বডি, কালোও লাগবে, পা আর শিং বানাতে হবে, কিন্তু পিছনে বোর্ড না দিলে কি শক্তপোক্ত হবে? আর ক্যাটারপিলার স্টেজে কি পোজ দেবে? চাট্টী ফুলকপির পাতা ধরিয়ে দেব নাকি হাতে?
ভাগ্যিস কিনে ফেলিনি। পরদিনই মেয়ের মন পালটে গেল।
“আমি ডাক হব মা! ইয়েলো ডাক! প্যাঁক প্যাঁক করে ডাকব স্টেজে উঠে।”
মানে হলুদ চার্টপেপার। চলবে। অরেঞ্জ লেগিংস পরা পা। কমলা ঠোঁট – কেলেংকারি করেছে! ওরকম থ্যাবড়াপানা হংসচঞ্চু বানাইব ক্যাম্নে? ঘোর দুশ্চিন্তায় জল খেতে গিয়ে ভুল করে কাফ সিরাপ খেয়ে ফেলি।
“আর ল্যাজ করে দেবে, ল্যাজ নাড়ব বেশ স্টেজে উঠে!”
এবার থপাস করে এমন জোরে বসে পড়ি যে নিজের ল্যাজে, আহ নেই, মানে থাকলে যেখানটায় থাকত সেখানে ব্যথা লেগে যায়।
নাড়ানোর যোগ্য ল্যাজ বানাতে হবে? হাঁস সাজতে গিয়ে আমায় হাঁসফাঁস করিয়ে দিচ্ছিস তো!
পরদিন সেটাও পালটে যায় আবার। তিনি স্বপ্নে জিরাফ দেখেছেন। অতএব এবার জিরাফত্বের দাবি।
এককথায় নাকচ করে দিই। অত লম্বা গলা খালি চার্ট পেপারের কম্মো নয়। আর অফিসের পর ঘুরে ঘুরে অত বড় থার্মোকল জোগাড় করে এনে তাতে জিরাফ কাটা, পড়তায় পোষাবে না। আর সেই এক সমস্যা, স্টেজে উঠে কি বা পোজ দেবে? তার চেয়ে হাতি হ!
“এলি! এলি দ্য এলিফ্যান্ট!”
ছাই রঙের চার্ট পেপার কি হয়? না হলে সাদা এনে রং করতে হবে। দুটো ধ্যাবড়া কান, শুন্ড, ও হো সাদা তো লাগবেই দাঁত করতে হবে, ওরকম ছাই ছাই রঙের লেগিংস আছে মনে হচ্ছে, ব্ল্যাক শু। একটা পুঁচকে কলাগাছ পাওয়া যায় কিনা খুঁজব চেম্বুরের বাজারে?
পরদিন আবার মন খুঁতখুঁত করে। ঠিক তেমনটা হচ্ছে না।
আচ্ছা, তোর ইশকুল কি চিড়িয়াখানা নাকি? খালি জীবজন্তু সাজতে চাইছিস কেন?
তিতির আর কিছু ভেবে না পেয়ে বোধহয় গাছ হতে চাইল এবার।
এটা কিন্তু আমাদেরও মনে ধরল। বেশ দুহাত ছড়িয়ে দাঁড়াবে, সারা গায় ব্রাউন পেপার জড়িয়ে দেব। সবুজ চার্ট পেপার কেটে পাতা করে ডালে আটকে দেব, ফুল-ফলও লাগিয়ে দেব কিছু, আর ছোট পুতুল মাংকিটা ঝুলিয়ে দেব এক হাতে। মাথায় একটা ঝাঁকড়া পাতা-ফাতাওলা হেডব্যান্ড, তার মধ্যে একটা পাখির বাসা বসিয়ে দেব নাহয়, ঐ ম্যাকাও পুতুলটা আর গোটা দুই ছোট বলকে ডিম করে...
“সত্যিকারের ডিম দেবে! আন্ডা!”
“আরে! পড়ে গেলে ফেটে যাবে, সব চটচট হবে!”
“না সত্যিকারের ডিম দিতে হবে। ম্যাকাওটা বেশ তা দেবে!”
কদিন এটা নিয়ে জল্পনা কল্পনা চলল। তারপর এক ঘনঘোর সন্ধ্যায় তিতিরের দিম্মার ব্রেনওয়েভ।
সরস্বতী পুজোয় পরবে বলে কেনা লাল-পাড় উজ্জ্বল হলুদ শাড়ি আছে।
তিতিরের মাথায় লম্বা চুল আছে।
এক কাঁড়ি হার-বালা-টিপ ইত্যাদি আছে।
ছ মাস আগে নতুন ওয়াশিং মেশিন কেনার দরুণ একটা জম্পেশ চৌকো শেপের থার্মোকল আছে।
শাড়িটি পেঁচিয়ে, চুড়োখোঁপা বেঁধে, মালা টালা পরিয়ে, আর ঐ থার্মোকলে ভারতের ম্যাপ সেঁটে দড়ি দিয়ে পিঠে বেঁধে দিলেই
“ভারতমাতা”!
যুগোপযোগী রূপ? আরে দূর, আমাদের বঙ্কিম অরবিন্দ রবীন্দ্রনাথ অবনীন্দ্রনাথের ভারতমাতা, আদি, আবহমান, চিরন্তন
সবাই মিলে এটা ফাইনাল হয়ে গেল। কাজেই আর না ভেবে কাজে লেগে গেলুম। পরদিনই ফিরতি পথে নীল, কমলা, গাঢ় সবুজ, কলাপাতা সবুজ, আর হলুদ সব রকম চার্ট পেপার নিয়ে এলুম। অত বড় ম্যাপ কোন একটা পেপারে হবে না, আর জোড়াই যখন দেব তখন একটু রং নিয়ে নিই! টুলে চড়ে, কোন অঘটন না ঘটিয়ে থার্মোকলটিও প্রত্যন্ত মাচা থেকে আহরণ করে ফেললুম।
পরের দিনটা গেল তাতে মাপসই চারটে ফুটো করতে যাতে তিতিরের পিঠে ওটা বাঁধা যায়। বেঁধে দেখে নিতে হল আন্দাজ করার জন্য, আর তার ফলে আরেকটু হলেই সব প্ল্যান ভোগে যাচ্ছিল, কারণ তিতির ওটা পিঠে বাঁধা অবস্থাতেই খেলার ঘরে যেতে গিয়ে দরজায় আটকে গেছিল। আমি পৌঁছনোর আগে আরেকটু টানাটানি করলেই দুর্বল থার্মোকল দেহরক্ষা করত। উদ্ধারপর্ব সেরে, তাতে আগাপাশতলা আকাশ নীল পেপার সেঁটেও ফেললুম। একদিনের পক্ষে যথেষ্ট!
তিতির কাউকে বলবি না কিন্তু কি সাজছিস! সারপ্রাইজ, হ্যাঁ?
অতএব, পরদিনই তিতিরের সারা ক্লাস, এবং বাড়ির সব বন্ধু জেনে গেল ‘ভারতমাতা’ কারে কয়! সবাইকেই গুছিয়ে বারণ করে হয়েছে অবশ্য কাউকে যেন না বলে, কারণ এটা ‘সারপ্রাইজ’!
---
শনিবার ফ্যান্সি ড্রেস কম্পিটিশন। বিষ্যুদবার রাত অবধি কাজ আর বিশেষ এগোল না। শুক্রবার আধবেলা ছুটি নিলুম শেষে। একটু ফাঁকিবাজির চেষ্টা করলুম, দোকান থেকে বড় সাইজের ভারতের ম্যাপ কিনে আনতে গেলুম। কিন্তু পেলুম না, নেই। যাকগে যাক, বয়েসকালে রাখীদির তত্ত্বাবধানে কয়েকশোবার ভারতের ম্যাপ এঁকেছি, এটাও এঁকে দেব। বাইরের ঘরে ঠ্যাং ছড়িয়ে বসা গেল, চার্ট পেপার, ফেভিকল, কাঁচি, পেন্সিল রবার সব নিয়ে, রেফারেন্স হিসেবে ট্যাবে ভারতের ম্যাপ খুলে। কমলায় উত্তর ভারত, হলুদে পশ্চিম, কলাপাতা সবুজে পূর্ব আর গাঢ় সবুজে দক্ষিণ ভারত। উত্তরটা অনেক কসরত করে এঁকে মুখ তুলে দেখি তিতির ট্যাব নিয়ে পগারপার।
তাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে এনে পাশে বসিয়ে, ম্যাপ খুলে আবার আঁকতে বসলুম। ওরে চা দিচ্ছিস না কেন? পিঠে ব্যথা হয়ে গেল যে!
আমাদের কচিবেলায় প্যাকম্যান বলে একটা গেম ছিল মনে আছে? আজকের ভিডিও গেমস এর পূর্বজ? সেই একটা আধখানা মুখ কপ কপ করে গুল্লি খেতে খেতে যেত? গুজরাট আঁকতে গেলেই আমার সেটার কথা মনে পড়ে যায় – কেমন একটা হাঁ মুখের মত না? খুব যত্ন করে সেই হাঁয়ের খাঁজগুলো আঁকছি, মাতৃদেবীর মন্তব্য, খুব তো কারুকার্য করছ, ঐ সঘন কম্পমান রেখা বরাবর যে কাটতে হবে সে খেয়াল কি আছে?   
শুনেই তো আমি নেই! অ্যাঁ, আবার কাটতেও হবে?
সে তো হবেই! নইলে অত কষ্ট করে নীল কাগজ মারলি কেন ঢ্যাঁড়শ? সমুদ্দুর বোঝাবি বলে না?
তাই তো! তেমনই তো ভেবেছিলুম বটে। নাগাড়ে এতক্ষণ উপুড় হয়ে ম্যাপ আঁকতে গিয়ে সে তো ভুলেই মেরে দিয়েছি। আচ্ছা দেখা যাক কদ্দূর কি পারি। আগে দেখ তো চারটে অংশ সমঞ্জস হল কিনা।
তিতির দেখে বলল “কি সুন্দরী হয়েছে মাম্মা!”
মা দেখে বলল ডানদিক উঠে আর বাঁদিক নেমে গেছে।
সে তো আমার মাগো, এঁকে এঁকে ডান কাঁধ টনটন আর ভর দিয়ে বসে থেকে থেকে বাঁ কাঁধ অসাড় হয়ে গেছে!
কিন্তু ম্যাডামজী ঠিকই বলেছেন, উঠে দাঁড়িয়ে দেখি ত্যাড়াব্যাঁকা হয়ে গেছে ব্যাপারটা। এত বড় স্কেলে আগে তো আঁকিনি। আবার রবার পেন্সিল নিয়ে লেগে পড়ি।
উফফ কি খাটনি! হ্যাঁ রে, আইডিয়া! তুই ‘স্কুলগার্ল’ সেজে যা না?
দিম্মা আর নান্নির যৌথ দৃষ্টিক্ষেপে প্রায় ভস্ম হয়ে গেলুম। কিন্তু আরেক কাপ চা না দিলে মাইরি পারছি না যে! আর তোমরা বাপু নিচে খেলতে যাও, তিতির এরকম চারদিকে ধেই ধেই করে নেচে বেড়ালে আর মিনিটে মিনিটে কানের কাছে ফোঁস ফোঁস নিঃশ্বাস ফেললে মন দিতে পারছি না তো!
---
রাত নটা। তিতির খেতে বসেছে। ম্যাপ আঁকা শেষ, চার টুকরো জুড়ে আটকানো হয়ে গেছে, থার্মোকলের ফুটো দিয়ে জরির ফিতে পরিয়ে রাখা আছে, স্টেজে ওঠার আগে বেঁধে দিলেই হবে। দিম্মা বিকেলে বেরিয়ে ঘুড়ির কাগজের মত পাতলা ফিনফিনে কাগজ কিনে এনেছেন, এখন সেগুলো কায়দা করে কুঁচি বানিয়ে তাই দিয়ে হাতের গলার খোঁপার মালা গাঁথছেন। আমি এখনো ভূমিতলে, এবার ভারতমাতার হাতের ঝান্ডা বানাচ্ছি। সাইজমত লাঠি খুঁজে পাইনি, একবার ভাবছি আলমারির সাইডের একটা রড খোলা যায় কিনা, একবার ভাবছি মপার এর ডান্ডাটা খুলে নিলে কি মা চেঁচাবে, একবার ভাবছি তিতিরের ভাঙ্গা ছাতার ডাঁটিটা কি চলবে, করতে করতে মনে পড়ল একগাদা ইলেকট্রিক লাইনের কভারের টুকরো পড়ে আছে, তার একটা মাপমত এনে কাগজ পেঁচিয়ে দিলেই হবে। আরো একটা টাস্ক লিস্টে জুড়ল তার মানে।
রাত সাড়ে দশটা। ম্যাপ – চেক। ফ্ল্যাগ – চেক। বেশ পাকাপোক্ত পতাকা হয়েছে – ঐ যাঃ, অশোকচক্র আঁকতে ভুলে গেছি যে! থাক, কাল সকালে হবে, এখন আঁকলে সে চক্র বড়ই বক্র হবে। কাগজের মালাসমূহ – চেক। এক্সট্রা ব্যাকাপ গয়নাগাঁটি - চেক (যা শান্ত মেয়ে, যদি কাগজ ছিঁড়ে ফ্যালে স্টেজে ওঠার আগেই?)শাড়ি – চেক। আর যা যা লাগতে পারে – চেক। চ চ শুতে চ এবার।
----
পরদিন ব্রাশ করেই আগে অশোকচক্র প্রদান করি, মানে পতাকাকে আর কি। তারপর ভারতমাতা নির্মাণ পর্ব। শাড়ি পরা সাজুগুজু সব কিন্তু সুন্দর চটপট হয়ে গেল, খালি মাঝে একবার ভারতমাতা আত্মবিস্মৃত হয়ে খাটে উঠে ধেই ধেই করে লাফাচ্ছিলেন আর শাড়ি গোঁজার সময় তাঁর খুব কাতুকুতু লাগছিল বলে তিনি গোঁসা হয়েছিলেন দু মিনিটের জন্য।
    তারপর আমরা শোভাযাত্রা করে রওনা দিই। সবার আগে ‘ভারতমাতার অঙ্গসজ্জায়’ দিম্মা, তার কাঁধের ব্যাগে ব্যাকাপ গয়নাগাঁটি আর হাতে একটা প্লাস্টিকে খুব সন্তর্পণে নেওয়া কাগজের মালাগুলো। তার পিছনে একহাতে পতাকাটি উঁচু করে ধরে আর অন্য হাতে খাবার জলের বোতল নিয়ে ‘ফ্ল্যাগ-গার্ল’ বন্দনা। তার পিছনে স্বয়ং ভারতমাতা, সুহাসিনী, সুভাষিনী – মানে খিল খিল করে হাসছে আর অনর্গল বকবক করছে। আর সবার শেষে ‘দেশের ধারক ও বাহক’ আমি, হাতে ঐ গোবদা ম্যাপ রাস্তা দিয়ে যেই যাচ্ছে চেনা হোক বা অচেনা, বেশ একগাল হেসে দিচ্ছে। দেখে মনে পড়ল, গত বছরও এই ফ্যান্সি ড্রেস হয়েছিল। তিতির সেবার সেজেছিল পাকানো গোঁফ ওলা, মাথায় পাগড়ি, পিঠে তীর ধনুক, হাতে তরোয়াল “বীরপুরুষ”। হ্যাঁ মশাই, ওর প্রিয় কবিতা যে! তো সেবার এত মালপত্তর ছিল না, আমি একাই ওর হাত ধরে যাচ্ছিলুম। পথে এক বয়স্কা মহিলা, স্থানীয় ঢঙ্গে কাপড় পরা, ওকে দেখে হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তারপর ‘জয় রামজী’ বলে এক বিশাল নমস্কার!
    এবারে অবশ্য সেরকম কিছু হল না। স্কুলে গিয়ে বেশ খানিকক্ষণ দাঁড়াতে হল, বন্দনার সাথে ম্যাপ আর ফ্ল্যাগ পালটাপালটি করলুম – গোটা ভারতবর্ষের ভার আর কতক্ষণ একা বওয়া যায়, বলুন? আরো সব ছেলেমেয়েরা আসছে – ভুল বললুম। আজ ছেলেমেয়ে না। আজ আসছে মৌমাছি, প্রজাপতি, লুডোর ছক্কা, ম্যাজিশিয়ান, প্রজাপতি, রামচন্দরজী, সেলফোন, কৃষ্ণ, রকেট, আবার প্রজাপতি, আবার কৃষ্ণ, মাদার টেরিজা (কি বলেছিলুম? থাকবেই), পুলিশ, আবার আবার প্রজাপতি, নিনজা, আবার আরেকটা রকেট, এটা কি – খনিশ্রমিক বোধ হয় – ও না, কৃষক, বার্বি ডল, ঝাঁসীর রানি, জলদস্যু – বা বেশ তো, স্পঞ্জবব, গাজর, কাশ্মিরী কন্যা, বোঝো! নরেন্দ্র মোদী! প্রিন্সেস, পোস্ট বক্স, এ আবার কে? কিউপিড – অ্যাঁ, পাঁচ বছরের ছানা কিউপিড মানে বোঝে? ডাক্তার, মারাঠী ভাউ। যাহ! এ বছর একটাও হনুমান নেই? গত বছর গোটা দুই ছিল, সেই সাথে এক নগ্নদেহ পল্লবমেখলা-আবৃত আফ্রিকান ট্রাইব-বালক।
    যাই হোক এরা ভিতর যায়। আমরা সারি বেঁধে হলে গিয়ে বসি। তারপর এরা আবার লাইন করে এসে এক পাশে দাঁড়ায়। অমনি আমরা সবাই হুড়োহুড়ি করে উঠে গিয়ে যার যার ছানাটাকে ফিনিশিং টাচ দিয়ে দিই। দিম্মা মালাগুলো ঠিকঠাক করে দেয়, আমি আর বন্দনা মিলে ভারতবর্ষকে যথাস্থানে বেঁধে ফেলি। তিতির অতিরিক্ত সতর্ক হয়ে যায় তারপর, ম্যাপে কেউ যেন ‘টাচ না করে!’ হবি তো হ তার পিছনে দাঁড়িয়েছে কৃষক বালক - সে সমানে ‘চল কোদাল চালাই’ করছে। তিতিরের নির্বন্ধাতিশয্যে তাকে আবার একটু বাবা-বাছা করে বলে দিই সে যেন এই ভারতবর্ষের মাটিতে চাষ করতে না লেগে যায়।
    বসে বসে দেখতে কিন্তু ভারি ভাল লাগে যাই বলুন। কৃষ্ণ লাল-কালো কাবলি চপ্পল পরত, জানতেন? নরেন্দ্র মোদীর দাড়িটা বোধহয় টুথপেস্ট দিয়ে বানিয়েছে, গরমে ঘামে গলে গলে গেছে। ঝাঁসির রানি বেশ স্মার্ট তো, কি সুন্দর পিঠে পুতুল বেঁধে, তরোয়াল বাগিয়ে বেঁকে দাঁড়াল! এই যাহ, রকেটের তিনকোণা টুপি খুলে পড়ে গেছে, টিচার পরিয়ে দিতে আবারো খুলে পড়ে গেল – থাক থাক, এ রকেট ওয়ার্ক ইন প্রোগ্রেস। রুবিক কিউব নিজেই চারপাক ঘুরে গেল স্টেজে। সব মিলিয়ে হাসির ফোয়ারা। ভারতমাতা হাসিমুখে ফ্ল্যাগ ধরে দাঁড়িয়েছেন, ভাল হাততালিও পেয়েছেন।
    শেষ হবার পর আরেকটু ইনফর্মাল ছবি তোলা টোলা হয়। তিতিরের পিঠ থেকে ম্যাপটা খুলে নিয়েছি, সে রামচন্দ্র আর নিনজার সাথে দৌড়াদৌড়ি করে খেলছে। ঝাঁসির রানী আর মীরাবাই পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে দেখে শখ হল তিনকন্যার একটা ছবি তুলি। তা তাদের তখন খেলার মুড – তুললাম তো ছবি, তাতে দেখি ভারতমাতা আর মীরাবাই খামচাখামচি করছে আর ঝাঁসির রানী তরোয়াল বাগিয়ে কোনটাকে আগে পেটাবে তাই ভাবছে। কি অপূর্ব ছবি, ভাবছি ‘অগ্নিকন্যা’ ক্যাপশন দেব কিনা, চোখে পড়ে কে যেন এসে ম্যাপ-টা তুলে নিয়ে যাচ্ছে। হাঁ হাঁ করে উঠতে গিয়ে দেখি তিতিরের ক্লাস টিচার – মাতৃদেবী সলজ্জ মুখে জানান টিচাররা নাকি বলেছেন ঐ ম্যাপ এখন থেকে স্কুলে সাজিয়ে রাখা হবে। ভ্যাবলাপানা হাসিমুখে দেখি আমার এই এত ঘন্টার পরিশ্রমের ফসল ম্যাপ, মায় ফ্ল্যাগটা অবধি দুই টিচারের হাতে অন্তর্হিত হল। কি ভাগ্যিস আলমারির কি মপারের রড খুলে ফ্ল্যাগের ডান্ডা বানাইনি!
    ---
এক বিশাল পর্ব নির্বিঘ্নে সমাপন করায় মন বেশ প্রফুল্ল ছিল। রাত্রে ‘যেদিন সুনীল জলধি হইতে উঠিলে জননী ভারতবর্ষ’ গাইতে গাইতে ঘুমোতে যাচ্ছিলুম, কন্যার প্রশ্ন,
“জননী মানে মা তো?”
“হ্যাঁ মাভারতবর্ষ আমাদের দেশ তো, দেশকে ভালবেসে মা বলা হচ্ছে।”
“ভারতবর্ষ আমাদের মা?”
“হ্যাঁ, তাই তো বলছে।”
“আর ভারতবর্ষ আছে পৃথিবীর মধ্যে, তাই তো?”
“ঠিক।”
“তাহলে পৃথিবী হল ভারতবর্ষের মা, মানে পৃথিবী আমাদের দিম্মা
নিজের মা আর দিম্মাকে যুগপৎ হতভম্ব করিয়ে দিয়ে ছোট্ট মেয়ে শুতে চলে গেল।

Sunday, 30 October 2016

বাঁদোর


তিতির না, বাঁদর ওড়াতে ভারি ভালবাসে।

আরে না না আমার মাথা খারাপ হয়নি। বোম্বেতে সত্যিই বাঁদর ওড়ানো হয়। বেলুন দিয়ে তৈরি বাঁদর। জুহু বিচে হু হু করে হাওয়া দেয় তো, ঐ বাঁদরের সঙ্গে লম্বা সুতো দেয়, ঠিক ঘুড়ি ওড়ানোর মত করে লোকে ওড়ায়।

ওগুলো বানায়ও খাসা। গোল বেলুনের মাঝে বেঁধে মাথা ও পেট, লম্বাটে বেলুন দিয়ে হাত আর পা, একটা সরু লম্বা পাকানো গোছের বেলুনের ল্যাজ। এহেন বাঁদর যে তিতিরের পছন্দ হবে সেটা বলাই বাহুল্য। তার ওপর উড়ন্ত বাঁদর। তিতিরের চেয়েও, তার দাদুমণির বেশি পছন্দ দেখি। ছোট্টবেলার ঘুড়ি লাটাই নিয়ে ছাতে ভোকাট্টা করার স্মৃতি ফিরে আসে মনে হয়। তাই সময় সুযোগ হলেই পল্টন নিয়ে জুহু যাবার চেষ্টা করি। কিন্তু ইদানীং সেটা আর হচ্ছে না, অফিসে কাজের চাপে ফেঁসে চিপিটক-মূর্তি ধারণ করিতেছি কিছুকাল ধরে, সময় বার করতেই পারছি না।

কিন্তু পুঁচকি মেয়ের কি বেড়াতে না গেলে ভাল্লাগে, না আমারই ভাল্লাগে ওকে নিয়ে যেতে না পারলে! কাজেই জুহু যখন হচ্ছে না তখন জিজাই সই! মানে রাজমাতা জিজাবাই উদ্যান, অর্থাৎ রানীবাগ, অর্থাৎ বাইকুল্লা জু - বোম্বের একমাত্তর চিড়িয়াখানা।

কলকাতার চিড়িয়াখানা গিয়ে যারা অভ্যস্ত তারা অবশ্য নাক সিঁটকোবে। বলতে গেলে কিছুই প্রায় নেই জন্তু জানোয়ার। কয়েকটা হাতি হরিণ বাঁদর (না উড়ন্ত নয়) জলহস্তী কুমীর নীলগাই নেকড়ে আর কিছুকিঞ্চিৎ পক্ষীকূল চিড়িয়াখানার নাম রোশন করার ঝিমন্ত চেষ্টা করে। এক ঘন্টার বেশি লাগে না ঘুরতে।

কিন্তু কপালগুণে আমার মেয়ে মায়ের সাথে বেই-বেই বড় ভালবাসে। সে সামান্য একটা দোলনাওলা পার্কে নিয়ে গেলেও ভারি খুশি হয়। আরেকটা সুবিধে হল ভারি কাছে, টুক করে আধ ঘন্টায় পৌঁছনো যায়। সুতরাং রোববার জলখাবার খেতে খেতেই ঠিক করলুম আপাতত রাজমাতাকেই দর্শন করে আসি।

সেজেগুজে বেরোতে যা দেরি। তিতিরের প্রশ্নাবলী শুরু হয়ে গেল।
আমারও মন ফুরফুরে, তাই উত্তর দিতে কার্পণ্য নেই।

'মা আমরা জু যাচ্ছি, না?'
'
হ্যাঁ মা। জু যাচ্ছি তো।'

'মা আর কদ্দূর?'
'
আরে এই তো শুরু করলুম। একটু সময় লাগবে দাঁড়া।'

'মা জুতে হাতিগুলোর আমাকে মনে আছে?'
'
হ্যাঁ! ওরা তো রোজ বলে তিতির কবে আসবে, এখনো আসছেনা কেন।'
(
আহ্লাদে তিতির এক গাল হেসে ফেলে।)

'মা আর কদ্দূর?'
'
আরো খানিকটা মা।'

'মা আমি কিন্তু খেলাও কব্বো, আমায় খেলা করতে দেবে তো?'
'
বেশ তো, করিস। স্লিপ দোলনা কিসব আছে তো চ দেখি।'

'কি মজা না, আমরা জু যাচ্ছি?'
'
হ্যাঁ মা।'
(
মা এবার একটু পরিশ্রান্ত)

'মা আর কদ্দূর?'
'
আর একটু সোনা।'

'কুমীর আমায় খেতে আসবে না তো?'
'
না না অমন দুষ্টুমি করলে আমি কুমীরের কান মলে দেব।'

তিতিরের গম্ভীর মুখে আপত্তি,
'
কি করে মলবে? কুমীরের মোটেই কান নেই, কানের ফুটো আছে। আমি ছবি দেখেছি।'
বিব্রত মা মেকাপ দিতে চেষ্টা করে,
'
আহ হ্যাঁ ওই কানের ফুটোয় চাঁটি মারব।'

'মা আর কদ্দূর?'
'
এইবার এসে গেছি, আর একটু রে।'

'মা আর কদ্দূর?'
'
চুপ করে বোস না আর তো একটুখানি।'

'মা আর কদ্দূর?'
শুনতে পাইনি ভাব করে জানলা দেখতে থাকি, আহা কি নীল আকাশ মৃদু সমীরণ ছ্যাঁকছ্যাঁক রোদ উড়ু উড়ু মন...
ধৈর্যর মহতী পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়ে চিড়িয়াখানার গেটে নামি অবশেষে। ছোট্ট মানুষের হাত ধরে গটগট করে ঢুকে পড়ি। পরক্ষণেই হোঁচট খেয়ে পড়তে পড়তে সামলে নিই।

লেঃ! একেই কিছু নেই, তায় আবার চারদিকে খুঁড়ে টুঁড়ে একাকার করে রেখেছে। কি বানাইতেছ হে হরিপদভাই?
হরিপদ না, জাকিরভাই। সব সারাই হচ্ছে। ঝকঝকে নতুন হবে। জনরব নাকি পেঙ্গুইনও আসবে!

বেশ বেশ। আপগ্রেড হচ্ছে দেখে পরম পুলকিত হয়ে পক্ষীঘরের দিকে হাঁটা দিই। ও তিতির, কাকাতুয়া না, ওটা ম্যাকাও। এইদিকে কাকাতুয়া দেখ। আর এদিকে পিছন দিকে ধনেশ পাখি তার ঠোঁট সামলে বসে আছে দেখেছিস? আর এই খাঁচাটায় ব্ল্যাক আইবিস আর পেইন্টেড স্টর্ক, মনে আছে দিম্মা চিনিয়ে দিয়েছিল?

পাখপাখালি দেখে আর কিছু খুঁজে পাইনা। যে খাঁচায়ই উঁকি দিই, সেটাই খালি। এমনকি এঁকেবেঁকে যাওয়া খালটাও। রেগেমেগে খেলার জায়গাটায় চলে গেলুম দুজনে। সেটা পেয়ে অবশ্য তিতিরের আহ্লাদ আর ধরে না। নেচেকুঁদে চড়ে দুলে ঘুরপাক খেয়ে হেসে লাফিয়ে তার দিলখুশ, আম্মো খুশ।

তারপর যে দুটো অবধারিত থাকে, সেই কুমীর আর হাতি দেখিয়ে নিই।
কুমীর জলে পেট ডুবিয়ে শুয়ে ঘুমঘুম করছে, আর হাতিরা তেড়েফুঁড়ে কান আর ল্যাজ নাড়ছে।
তিতিরের তাই দেখেই মহানন্দ। যাই বল বাপু, ভারি তৃপ্তি হয় ঐ হাসিটা দেখলে।

তারপর মা-মেয়ে হাত ধরাধরি করে দোলাতে দোলাতে, পপ কর্ণ কিনে, ভোঁ করে বাড়ি ফিরে আসি। এসে স্নান করার আগে তেল মাখতে মাখতে তিতিরের হঠাৎ খেয়াল হল, 'বাঁদর দেখলুম না তো!'

ভাবলুম বলি দিবারাত্রি রাস্তায় বেরোলেই দেখিস তো, এই জঙ্গল ভরা কলোনিতে তারা সদলবলে বিরাজ করে। যত পায়রা, তত কাঠবিড়ালি আর ততই লালমুখো বাঁদর।

তার আগেই, কন্যা বললেন, 'এই দ্যাকো আমি কি সুন্দর বাঁদোর হইচি!'

আমি মুগ্ধ চোখে তেলচুকচুকে গায়, দু হাঁটু অল্প ভেঙ্গে, দু হাত কুস্তিগীরের পোজে তুলে গাল ফুলিয়ে দাঁড়ানো মেয়ের খুশিমুখ দেখি। নাহ, পরের রোববার এই মিষ্টি বাঁদরটাকে বাঁদর ওড়াতে জুহু নিয়ে যেতেই হবে দেখছি!