Showing posts with label play. Show all posts
Showing posts with label play. Show all posts

Wednesday, 20 May 2020

দ্য লস্ট ওয়ার্ল্ড


যে বন্ধুর ভূমির প্রেক্ষিতে আমাদের কাহিনির সূত্রপাত হইতেছে, তাহা এই দেশের অতি সাধারণ অঞ্চলগুলির একটি মাত্র। নিয়মিত বর্ষণস্নিগ্ধ সে স্থানের মাটি সরস ও উর্বর, বনানীর নিবিড় সবুজের অন্তরাল হইতে প্রভাতসূর্য উঁকি মারিয়া নিত্য তাহার কোমল রোদের পরশ বুলাইয়া দিয়া যায়। 

এমত এক সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা ধরিত্রীর বুকে যদিও অনায়াসে কৃষিমাতৃক সভ্যতা গড়িয়া উঠিতেই পারত, বস্তুত তাহা হওয়াই স্বাভাবিক ছিল – কোনো অজানা রহস্যহেতু এই জমিতে অদ্যাবধি একটিও মানুষের পা পড়ে নাই। হয়তো সেই কারণেই, সভ্যতার নিবিড়তম গোপন কথাটি আজিও অতি কৌতূহলী, মুনাফালোভী বা জ্ঞানতাপস কাহারো কৌতূহলী চক্ষে ধরা দেয় নাই।
কথাটি হইল - এ অঞ্চল জনহীন, কিন্তু প্রাণহীন নয়। এই মানবচক্ষুর অন্তরালে, বসতিশূন্য অঞ্চলে অখণ্ড প্রতাপে, সানন্দে, স্বচ্ছন্দে ঘুরিয়া বেড়ায় একদল অমিতশক্তিধর জীব।

ডাইনোসর!

হ্যাঁ, অবিশ্বাস্য হইলেও এ কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্য।

এই পৃথিবীরই এক নিরিবিলি নির্জনে, আজিকেও সেই প্রাগৈতিহাসিক  প্রজাতির এক অনন্য শাখা অপ্রতিহত গতিতে রাজত্ব করিয়া চলিয়াছে।

তবে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তদ্রনুরূপ পরিবর্তিত হইতে হইতে, আদিম জাতভাইদের সহিত ইহাদের আকারে প্রকারে উল্লেখযোগ্য তফাৎ হইয়া গিয়াছে বইকি! ইহারা আকারে ক্ষুদ্রতর, ইহাদের দৈহিক গঠন তুলনায় অনেক পেলব ও নমনীয়। প্রাচীন ডাইনোসর হয় সম্পূর্ণ মাংসাশী, নতুবা বিশুদ্ধ নিরামিষাশী হইত। কিন্তু ইহারা সর্বভুক। সেইসঙ্গে ইহারা বুদ্ধিমান, বলিষ্ঠ, সুকৌশলী, ক্ষিপ্র এবং সংযমশীল। তবে সর্বাধিক আশ্চর্য এদের শৃঙ্খলাবোধ ও দলবদ্ধতা। ইহারা যখন যেস্থলে যায়, সকলে একসঙ্গে যায়। সর্বদা সারি বেঁধে চলাফেরা করিয়া থাকে, একজনের কিছুমাত্র বিপদে অন্যরা সবাই আগাইয়া আসে সাহায্য করিতে। খাদ্যদ্রব্য যাহা পায়, সকলে মিলিয়া ভাগ করিয়া খায়। সবচাইতে বড় কথা, মনান্তর বা মতান্তর হয় কিনা জানা নাই, কিন্তু হইলেও কখনো দলমধ্যে কেউ অন্য কারো সহিত বিবাদ করে না।

ইহাদের দেখিলে মাঝেমধ্যে মনে হইবে, সভ্যতার যথার্থ প্রসার মানবসমাজের পরিবর্তে ইহাদের মধ্যেই অধিক গতিতে হইয়াছে।

আপাতত, দলটি বিক্ষিপ্তভাবে তৃণভূমিতে অলস পদচারণা করিতেছিল। ইহাদের পারস্পরিক ভাব বিনিময় বোঝার ক্ষমতা যদি আমাদের থাকিত, তাহা হইলে হয়তো বা শুনিতে পাইতাম যে ইহারা আসন্ন বর্ষাঋতুর নিমিত্ত খাদ্যসঞ্চয় করিয়া রাখা লইয়া আলোচনা করিতেছে।

সহসা বিনা মেঘে বজ্রপাততুল্য এক ঘটনা ঘটিল। আকাশ হইতে তাহাদের মাথার উপর শুভ্র, কঠিন বরফের ন্যায় খণ্ড খণ্ড কী যেন ঝরিয়া পড়িতে লাগিল। দলের সকলেই প্রথমে এই আকস্মিক আবির্ভাবে ভীত হইয়া দৌড়াদৌড়ি করিতে আরম্ভ করিয়াছিল, যে যেখানে সম্ভব, উচ্চাবচ ভূমির খানাখন্দে লুকাইয়া পড়িতেছিল প্রাণরক্ষার তাগিদে।

যেমনই আচমকা এই শ্বেতখণ্ড ধারাপাত শুরু হইয়াছিল, তেমনই আচমকা তাহা আবার থামিয়াও গেল কিছুক্ষণ পরে। তখন লুক্কায়িত স্থান হইতে এক এক করিয়া আমাদের গল্পের মূল চরিত্ররা উঁকিঝুঁকি মারিতে লাগিল। তৎপরে আকাশে তেমনই নির্ভার নীলিমা, তরুলতাগণ তেমনই সবুজ সতেজ, চারিদিক তেমনই নিঃশব্দ নির্জন - দেখিয়া দুঃসাহসী কয়েকজন সতর্ক পদক্ষেপে বাহির হইয়া এল। তাহাদেরই একজন, মুখ তুলিয়া বাতাসে কিসের যেন গন্ধ শুঁকিল।

অতঃপর চকিতে ছুটিয়া গেল অপেক্ষাকৃত নিকটস্থ একটি শ্বেতখণ্ডের দিকে।

এক রুদ্ধশ্বাস মুহূর্ত, তাহার পর তাহার দিক হইতে দলের বাকিদের প্রতি যে ইঙ্গিত প্রদত্ত হইল, তাহার ভাষা আমরা না বুঝিলেও সে যে পরম উৎফুল্ল, তাহা বুঝিতে বাকি থাকে না।

সঙ্গে সঙ্গে প্রবল এক হর্ষের জোয়ার বহিয়া যাইল যেন সেই ভূমিখণ্ডে। সেটা স্বাভাবিকও অবশ্য, খাদ্য সংগ্রহের ভাবনা শুরু করিবামাত্র যদি এইরূপ শূন্য হইতে খাদ্য বর্ষণ হয়, কে না উল্লসিত হইবে? যথার্থ, ঐ শ্বেতখণ্ডগুলি এই প্রজাতির ভক্ষণযোগ্য, শুধু তাহাই নহে, অতি স্বাদু, অতি মনোরম খাদ্য। এই অকল্পনীয় সৌভাগ্যে তাহাদের উচ্ছ্বল আনন্দ, উদ্বেল চঞ্চলতা দেখে কে!

খণ্ডগুলি অবশ্য আয়তনে তাহাদের শরীর হইতেও বড়। কিন্তু তাহাতে ইহাদের কিছুমাত্র দমিয়া যাইবার লক্ষণ দেখা গেল না। কেহ একাই, কেহ বা দুইজনে মিলিয়া ধরিয়া, অটুট ধৈর্যের সহিত ধীরে ধীরে, এক এক করিয়া খণ্ডগুলি তাহাদের গোপন খাদ্যভাণ্ডারে লইয়া যাইতে শুরু করিয়া দিল। ক্রমে ক্রমে সবগুলিই নির্বিঘ্নে স্থানান্তরিত হইয়া গেছে, আর একটি কি দুটি পড়িয়া আছে মাত্র, হেন কালে...

“অ্যাই!!! আমার চিনির কৌটো নিয়ে ওখানে কী করছিস?”

“হুশ্‌! মা, আস্তে! খেতে দিচ্ছি।“

“কাকে আবার চিনি ছড়িয়ে খাওয়াচ্ছ এখন! দেখি?”

জানলার ধাপিতে কয়েকটা গাছের টব। এবড়ো খেবড়ো মাটি, যেমন হয়। মেয়ের পোঁতা ছোলাগাছগুলো সবে মাথাচাড়া দিচ্ছে। মা মেয়ের পিছন থেকে মুণ্ডু বাড়িয়ে দেখে সেই মাটিতে একটি দুটি চিনির দানা তখনো পড়ে, আর ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছে একদল কালো কালো ...

“দেখেছ মা? আমি পুষেছি! ওদের নাম কী বলো তো? চিটিসরাস!”


Saturday, 24 August 2019

দ্রিঘাংচু

 
যেই একটু নিজের কাজে বসব, অমনি অবধারিতভাবে ছোট মানুষটির আগমন ঘটবে। হুস করে ঢুকে হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে হুস্‌-তর গতিতে বেরিয়ে যেতে যেতে বলে গেল,
“মাঁ! গণেশটা কী সুন্দর এঁকেছি না? পরশুরামও আছে।“
সে তো দিব্যি নাচতে নাচতে পালাল, আমি এদিকে কাগজটার এপিঠ ওপিঠ আগাপাস্তলা খুঁজে ট্যান খেয়ে বসে রইলুম। ওপিঠে কিস্যু নেই, এপিঠে দিব্যি নধর গণুবাবা আছেন, তাঁর মাথায় মুকুট, হাতে কুঠার, সামনে লাড্ডুর থালা, পায়ের কাছে পুঁচকে ও মিচকে ইঁদুর সব আছে, কিন্তু সেই ক্রোধী মুনিটি কই? তাঁর জটার একগাছা চুলও তো দেখতে পাচ্ছি না!
ইতিমধ্যে লাট্টুর মত পাক খেতে খেতে তিতির পুনঃপ্রবেশ করেছে।
“অমন ঘুরপাক খাচ্ছিস কেন, পড়ে যাবি যে!”
“আমি এখন আথ্‌! আথ্‌ এমনি করে চলে।”
বড়ই ভাবনার বিষয়। খাটের পাশের অপ্রশস্ত জায়গায় আহ্নিক গতি হতে থাকলে আমি যাই কোথায়!
আমার চিন্তা টের পেয়েই হয়তো তিতির আশ্বস্ত করল,
“তোমায় একটা কথা বলতে এলুম খালি!”
ভনিতা করছে মানেই গড়বড়, কিছু উৎপটাং বায়না আসছে মনে হয়। তড়িঘড়ি কথা ঘোরাই,
“হ্যাঁ রে, তোর পরশুরাম কই?”
সলজ্জ হাসি সহযোগে উত্তর এল, “ওটাই তো বলতে এলুম! ভুল বলেছি, পরশুরাম নয়, পরশু। গণেশের হাতে আছে।"
বেচারি! প্রবাসে বড় হয়েও বাংলা শব্দভাণ্ডার তার এত বড়সড়, গুলিয়ে গেলে কী আর করা! বাংলা, ইংলিশ, হিন্দি এবং মারাঠী নিয়ে জাগলারি করতে হলে অমন একটু আধটু হতেই পারে। নাহয় এখনো ‘ফেব্রিক কালার’কে সমানে ‘ফাইব্রাস কালার’ বলে যাচ্ছে, এই কিছুকাল আগেই আমাদের সে খাবার ‘সার্ভাইভ’ করে দিতে চেয়েছিল – তাই বলে পরশুকে পরশুরাম বলে ফেলেছে বলে হাসব নাকি! শব্দটা জানে এই না কত!
এইসব বিবেচনা করে খুব গম্ভীর থাকার চেষ্টা করছিলুম, হাসিটাকে গালভরা পানের মত একবার এদিক একবার ওদিক করছি, হঠাৎ খেয়াল হল হোমটাস্ক বাকি আছে।
কম্পি টম্পি ফেলে হাঁক পাড়লুম, “ওরে ল্যাবেঞ্চুশ, বলি সারাক্ষণ ছবি আঁকলে আর নেত্য করে বেড়ালেই চলবে? শিগগির বইখাতা নিয়ে আয়!”
গতিজাড্য খুব খারাপ জিনিস বুঝলেন? ওতে গালে হামি পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু কচি মাথার গুঁতোয় চশমাও নাক থেকে খসে পড়ে যায়।
যাইহোক। পনেরো মিনিট পরের দৃশ্য।
খাটে বইখাতা ছড়ানো। মেয়ে ছোট টেবিল পেতে লিখছে। মা অতি বিপন্ন ভাবে নেট হাতড়াচ্ছে।
মায়ের হিন্দির যা অপূর্ব দক্ষতা, নেট না হাতড়ে উপায়ও নেই। দিম্মা থাকলে তিনিই করান এই সাবজেক্টটি, তিনি একদা স্কুলে হিন্দি পড়েছেন, কর্মসূত্রে বলেওছেন বহুবার, মায়ের চেয়ে অন্তত ভালো জানেন। দাদুমণির হিন্দি শোনার অযোগ্য ভয়াবহ, অতএব মায়ের আপাতত গুগলঠাকুর ভরসা।
ক, কা, কি... ইত্যাদি দিয়ে শব্দগঠন ছিল। দিব্যি চলছিল, ঠেকে গেল ‘ঃ’তে এসে।
তিতির যেই না নাকের ডগায় চশমা ঠেলে প্রবল সিরিয়াস মুখে বলেছে, “কঃ!” অমনি আমার ‘দ্রিঘাংচু' মনে পড়ে গেছে! তারপর না হেসে পারা যায়? হাসামাত্র ওদিক থেকে কৈফিয়ত তলব, “হাসছ কেন, হাসছ কেন?” তখন ছোট্টটাকে বলতেও হয় গল্পটার কথা, তারপর দুজনে মিলে জাপটাজাপটি করে হেসে কুটিপাটি হতেও হয়, তারপর রাত্রে আসল গল্পটা পড়ে শোনাব কথাও দিতে হয়,  তারপর দেখা যায় সর্বনাশ সমুৎপন্ন হইয়াছে।
কঃ দিয়ে আমি কোনো শব্দ জানি না। কোনোই না।
এদিকে তিতির ‘আমার মা সব জানে’ গোছের মুখ করে চেয়ে আছে।
কী আর করি, লেখার সময় শব্দ ভেবে না পেলে যা করি, তাই সাজেস্ট করলুম।
“চ, বার বার বলে দেখি, ঠিক মাথায় কিছু না কিছু এসে যাবে।“
আরো মিনিট দশ পরের দৃশ্য। মা আর মেয়ে মুখোমুখি বসে “কঃ?” “কঃ!” করে যাচ্ছে, করেই যাচ্ছে, দাদুমণি আর আন্টি উঁকি মেরে দেখে পালিয়েছে। এমন সময়ে ডাকাডাকিতে আকৃষ্ট হয়ে নাটকের পরবর্তী কুশীলব জানলায় এসে বসল, তারপর সেও আমাদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ‘ক্কঃ!’ ‘ক্যাঁঃ’ করতে লেগে গেল।
কে জানে সেটা কাক না দ্রিঘাংচু!

Monday, 15 April 2019

নববর্ষ

নববর্ষ না আমড়া!

একে তো অফিস ছিল। শুধু অফিসই ছিল না, কাজও ছিল পাগলপারা। 

বাড়ি এসে তিতির ও তার দিম্মাকে নিয়ে ফের বেরোলুম ঘুরতে। বচ্ছরকার দিন বলে কথা! ঘুরতে ঘুরতে খেয়াল হল, ঘরে পরার চটির স্ট্র‍্যাপ পটাং হয়েছে। আহা, কী আনন্দ, এই তো নতুন কিছু কেনার উপলক্ষ্য পাওয়া গেছে! 

ডি-মার্ট থেকে যখন বেরোলাম, একহাতে দু লিটার কোল্ডড্রিঙ্ক, অন্যহাতে ঠাসা উপচে পড়া থলি, সে এত ভারী যে বেঁকে গেছি সেদিকে। 

ওদিকে আমি কিন্তু নিজের জন্য ওই  একজোড়া ঘরে পরার হাওয়াই-ই কিনেছি! বাকিসব "কোথা হইতে কী হইয়া গেল" কেস।

বাড়ি এসে দেখলুম, প্লে ডো। স্বাভাবিক। তিতির গত কয়েকদিন ধরেই এটার বায়না করছিল। তারপর আরো দুই না তিন জোড়া ধুমসো হাওয়াই চটি। কার, কেন, কিচ্ছু জানি না। একটা বদখৎ দেখতে হাতা, তার সবটাই প্রায় ফুটো। 'খামোকা দাম দিয়ে ফুটো কিনেছ কেন' বলতে যাওয়ায় যুগপৎ দিম্মা-নান্নীর কণ্ঠনির্ঘোষে যে প্রতিবাদসমুদ্র উৎপন্ন হল তার কথা  আর না বলাই ভালো।

তার প্রতিশোধও নিয়েছি অবশ্য। হাতে পেলুম একটা কাপড়ের টুকরো, সেটা ঝাড়নও হতে পারে, ঘরমোছা ন্যাতাও হতে পারে, এমনকী পাপোশ হলেও আশ্চর্য হব না। পাওয়ামাত্র সুন্দর করে মায়ের বাথরুমের রডে টাঙিয়ে দিয়ে এসেছি, কাল চেঁচামেচি করলে বলব ভেবেছিলুম তোয়ালে বুঝি। 

তারপর আরো হাজার গণ্ডা কাজ সেরে ফেললুম।

দিনের শেষে, ক্লান্ত শরীরে ধুপুস করে বিছানায় পড়ে যাবার পরেও দিন ফুরোয় না।

"মা, ও মা?"

"উঁ?"

"সারপ্রাইজ! এই নাও।"

একটা নানারঙের প্যাস্টেল কালারের দাগে ছয়লাপ পুরোনো পেন্সিল বক্স, যাকে কোনো অজ্ঞাত কারণে তিতির "কম্পাস" বলে। এবছর নতুন কম্পাস পেয়েছে নতুন ক্লাসে উঠে, তাই এটা বাতিল হয়েছিল। সেইটি হাতে ধরিয়ে দিয়ে,  মেয়ে আগ্রহে হুমড়ি খেয়ে বুকে উঠে পড়ে প্রায়।

"খোলো না? খোলো?"

খুলি।

দুটো পেন। ইয়ার ফোন। আপিশের ড্রয়ারের চাবি। ফোন খোলার কাঠি। গ্লু স্টিক। 

আপিসের ব্যাগের বাইরের খোপে পড়ে থাকে এগুলো। দরকারমত হাতড়ে বার করে নিই। 

পরিপাটি গুছিয়ে রাখা।
আর একটা পুঁচকে প্লাস্টিকের ল্যাজমোটা শেয়াল। 

"ওইটে নিয়ে খেলবে মাঝে মাঝে, হুঁ? তোমায় পয়লা বৈশাকে দিলুম, তোমার তো কম্পাস নেই একটাও..."

নববর্ষে নতুন জিনিস গিফট করার নিয়ম যে করেছিল সে কিচ্ছুই জানে না। আমার যেন বছর বছর এমন বাতিল গিফটই জোটে। 

ভালবাসার পুরোনো হয় না যে!



Sunday, 21 October 2018

টুম্পা'স ওয়ান্ডার কোম্পানি


ফ্লাফি, কুকি, ট্রিকি, ঋদ্ধি আর সিদ্ধি। পাঁচ বন্ধু। খুব ভাব ওদের, সদা সর্বদা একসঙ্গে থাকে। সেদিন ওরা মাঠে গেছিল খেলতে। দুম দাড়াক্কা করে খুব খেলেছে।  তারপর না সারা গায়ে 'ধুলমিট্টি' মেখেজুখে একশা। সে কি রাম নোংরা, বললে পেত্যয় যাবেন না। কিছুতেই উঠছে না গা থেকে। 



কী করা যায়! অগতির তো একটাই গতি। মা----!



মাকে, সুতরাং, 'টুম্পা' ওয়ান্ডার কার ওয়াশিং কোম্পানি' খুলতে হল। সেকি, বোঝেননি এখনো? এরা পুতুল তো নয়ই, এমনকি সফট টয়ও নয়। এরা আমাদের বাড়ির অগুনতি চারচাকা আর দুচাকার বাছাই পাঁচ। একটা ট্রেন ইঞ্জিন, একটা মাটি-খাওয়া গাড়ি, একটা মশলা-গাড়ি, মানে সিমেন্ট  মিক্সার আর কী, একটা ক্রেনগাড়ি আর একটা ঘোড়ার গাড়ি। কোনটা কে জিজ্ঞেস করে লজ্জা দেবেন না। খালি কুকি হল ঘোড়ার গাড়ি এটা মনে আছে, কারণ তার আফটার ওয়াশ সার্ভিস অন্যরকম।



নতুন কোম্পানি সেট আপ করা কি মুখের কথা! ওঠো রে, পাশে চায়ের কাপটি নিয়ে থেবড়ে বোসো রে, প্ল্যান করো রে, যন্তরপাতি সাজাও রে, তাপ্পর খদ্দেরদের লাইন করে দাঁড় করাও রে, লাইনের অর্ডার নিয়ে বিনুনি বাঁধা ক্লায়েন্টের সঙ্গে ঝগড়া করো রে, তাপ্পর ঝগড়ায় হেরে গিয়ে গোঁজ হও রে, তাপ্পর গালে মধুর মত মিষ্টি হামি খেয়ে এথিক্স টেথিক্স ভুলে ক্লায়েন্টকে চটকু করো রে, তাপ্পর সেই চটকুর ধাক্কায় ছিটকে যাওয়া ফ্লাফি, কুকি, ট্রিকি, ঋদ্ধি আর সিদ্ধিকে কুড়িয়ে আনো রে।



এইরকম মহাসমারোহে শুরু হয়ে গেল আমাদের কোম্পানির যাত্রা। খুব সিস্টেমেটিক পদ্ধতি। প্রথমে একটা রুমাল, না সরি, প্ল্যাটফর্মের উপর গাড়ি দাঁড়াচ্ছে, জেট দিয়ে, যেটা কিনা আমার একটা বাতিল কলমের মত দেখতে, স্পীডে তার গা ধুইয়ে দেওয়া হচ্ছে। তারপর আরেকটা প্ল্যাটফর্মে, সেটা একটা পাজলের পিস কাঠের চৌকো, নিয়ে গিয়ে গায়ে ভালোওওওও করে ইরেজার ঘষা, আরে দ্যুৎ, সাবান মাখানো হচ্ছে। আবার আগের প্ল্যাটফর্মে এনে ধুইয়ে দেওয়া হচ্ছে৷ ধৌত গাড়ি যাচ্ছে হলুদ নরম ঝাড়নে গা মুছে নিতে, ব্যাপারটা হচ্ছে মায়ের কোলে শুয়ে। তারপর হাতে করে তুলে (ওটা রোবোটিক লিফটার মেশিন ধরে নিতে হবে) ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একটা হাতে ধরা পাখা দিয়ে শুকনো করা হচ্ছে একদম। তারও পর মোম পালিশ হচ্ছে, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একটা ফেল্টের টুকরো দিয়ে। তারপর? গাড়িরা একটা গোলাপী কাপে স্ট্র থেকে পেট্রোল খাচ্ছে। 



শুনতে সোজা মনে হলেও মোটেই সোজা নয়। আর ক্লায়েন্টটিও মহা বায়নাকুটে। জেট চালানোর সময় মুখ দিয়ে ঠিক একরকম 'ঝোপ্ ঝোপ্ ঝপ্পাসসসস্' আওয়াজ না করলে কাঁই কাঁই করছে, পাখা সমান স্পীডে না চালালে গোঁসা হচ্ছে, গাড়ির নাকে এক্সট্রা মোমপালিশ না ঘষলে হাত পা ছুঁড়ছে। পেট্রোল  খাওয়ানো নিয়ে তো হাতাহাতিই হয়ে গেল, আমি গাড়ির পেছনবাগে স্ট্র গুঁজেছিলুম, তিতির মুখ দিয়ে খাওয়াবেই খাওয়াবে। শেষমেশ একটা রফা করে পেটে ইনপুট চ্যানেল করা হল, সেই 'কাস্তে দিয়া পেট চিরিয়া ঘাস ভরিয়া দেয়' স্টাইলে। 



কুকি অবশ্য পেট্রোল খায় না, তাকে পিঙ্ক প্লাস্টিকের ফুলকাটা প্লেটে 'দানাপানি' দিতে হল। সেই সঙ্গে আবার মোম পালিশের সাথে ফ্রী 'দলাইমলাই' যদিও সেটা ঘোড়ার প্রাপ্য কিন্তু বিচ্ছু ক্লায়েন্ট নিজেই কোলে এসে বসে নিয়ে নিল। 



এর মধ্যে 'রবাহূত', মানে দাদুমণি, এসে হাজির। তাকে গাড়িদের পরিচয় দেওয়া হল। তার পর পড়া ধরা হল, 'বলো কোনটা কে' কিন্তু রহস্যের বিষয় হল, যদিও তিতির কিচ্ছুউউউউউ জানে না, দাদুমণির হাতে পড়া বলার জন্য দেওয়া গাড়ির ফাঁকে ফাঁকে একটা প্যালেস সেট এর অন্য কী যেন খালি চলে যাচ্ছিল। ফলে পড়া বলা হচ্ছিল এইরকম -



"ফ্লাফি"

"এটা তো কমোড!"

"--- ট্রিকি"

"কমোড"

"কুকি!"

"কমোড"

"ভুলে গেছি...(মায়ের ঠোঁট নাড়া) ... ঋদ্ধি"

"কমোড

"সিদ্ধি ( বাই প্রোসেস অফ এলিমিনেশন)"

"আবার কমোড!"

এইখানে আর হাসি সামলাতে না পেরে পুরো হিজিবিজবিজের মত মাটিতে হাত পা ছুঁড়ে ক্লায়েন্টের গড়াগড়ি। হাসি চাপতে চাপতে দাদুমণির প্রস্থান।



তারপর ঝকঝকে সাজা পাঁচ গাড়ি দল বেঁধে চলল পিকনিক করতে। এত খাটনির দাম পাওয়া গেছে মোটে পাঁচখানা লুডোর ঘুঁটি, তাও আবার তার একটাও লাল নয়৷ কোম্পানি তুলে দেব ভাবছিলুম বসে বসে, জনান্তিকে খবর পাওয়া গেল পিকনিকের মাঠে নাকি বেজায় কাদা হয়েছে। রিপিট অর্ডার এল বলে



তাই এখনো দোকান খুলে বসে আছি। চাই নাকি কারো? ফাস্-কেলাস সার্ভিস করে দেওয়া হবে, চাই কি বাম্পার লাকি ড্রয়ের মাধ্যমে বেছে নেওয়া কোনো ক্রেতাকে প্রাইজ হিসেবে ওই প্লাস্টিকের কমোডটাও গিফট করা যেতে পারে।