Showing posts with label drawing. Show all posts
Showing posts with label drawing. Show all posts

Saturday, 24 August 2019

দ্রিঘাংচু

 
যেই একটু নিজের কাজে বসব, অমনি অবধারিতভাবে ছোট মানুষটির আগমন ঘটবে। হুস করে ঢুকে হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে হুস্‌-তর গতিতে বেরিয়ে যেতে যেতে বলে গেল,
“মাঁ! গণেশটা কী সুন্দর এঁকেছি না? পরশুরামও আছে।“
সে তো দিব্যি নাচতে নাচতে পালাল, আমি এদিকে কাগজটার এপিঠ ওপিঠ আগাপাস্তলা খুঁজে ট্যান খেয়ে বসে রইলুম। ওপিঠে কিস্যু নেই, এপিঠে দিব্যি নধর গণুবাবা আছেন, তাঁর মাথায় মুকুট, হাতে কুঠার, সামনে লাড্ডুর থালা, পায়ের কাছে পুঁচকে ও মিচকে ইঁদুর সব আছে, কিন্তু সেই ক্রোধী মুনিটি কই? তাঁর জটার একগাছা চুলও তো দেখতে পাচ্ছি না!
ইতিমধ্যে লাট্টুর মত পাক খেতে খেতে তিতির পুনঃপ্রবেশ করেছে।
“অমন ঘুরপাক খাচ্ছিস কেন, পড়ে যাবি যে!”
“আমি এখন আথ্‌! আথ্‌ এমনি করে চলে।”
বড়ই ভাবনার বিষয়। খাটের পাশের অপ্রশস্ত জায়গায় আহ্নিক গতি হতে থাকলে আমি যাই কোথায়!
আমার চিন্তা টের পেয়েই হয়তো তিতির আশ্বস্ত করল,
“তোমায় একটা কথা বলতে এলুম খালি!”
ভনিতা করছে মানেই গড়বড়, কিছু উৎপটাং বায়না আসছে মনে হয়। তড়িঘড়ি কথা ঘোরাই,
“হ্যাঁ রে, তোর পরশুরাম কই?”
সলজ্জ হাসি সহযোগে উত্তর এল, “ওটাই তো বলতে এলুম! ভুল বলেছি, পরশুরাম নয়, পরশু। গণেশের হাতে আছে।"
বেচারি! প্রবাসে বড় হয়েও বাংলা শব্দভাণ্ডার তার এত বড়সড়, গুলিয়ে গেলে কী আর করা! বাংলা, ইংলিশ, হিন্দি এবং মারাঠী নিয়ে জাগলারি করতে হলে অমন একটু আধটু হতেই পারে। নাহয় এখনো ‘ফেব্রিক কালার’কে সমানে ‘ফাইব্রাস কালার’ বলে যাচ্ছে, এই কিছুকাল আগেই আমাদের সে খাবার ‘সার্ভাইভ’ করে দিতে চেয়েছিল – তাই বলে পরশুকে পরশুরাম বলে ফেলেছে বলে হাসব নাকি! শব্দটা জানে এই না কত!
এইসব বিবেচনা করে খুব গম্ভীর থাকার চেষ্টা করছিলুম, হাসিটাকে গালভরা পানের মত একবার এদিক একবার ওদিক করছি, হঠাৎ খেয়াল হল হোমটাস্ক বাকি আছে।
কম্পি টম্পি ফেলে হাঁক পাড়লুম, “ওরে ল্যাবেঞ্চুশ, বলি সারাক্ষণ ছবি আঁকলে আর নেত্য করে বেড়ালেই চলবে? শিগগির বইখাতা নিয়ে আয়!”
গতিজাড্য খুব খারাপ জিনিস বুঝলেন? ওতে গালে হামি পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু কচি মাথার গুঁতোয় চশমাও নাক থেকে খসে পড়ে যায়।
যাইহোক। পনেরো মিনিট পরের দৃশ্য।
খাটে বইখাতা ছড়ানো। মেয়ে ছোট টেবিল পেতে লিখছে। মা অতি বিপন্ন ভাবে নেট হাতড়াচ্ছে।
মায়ের হিন্দির যা অপূর্ব দক্ষতা, নেট না হাতড়ে উপায়ও নেই। দিম্মা থাকলে তিনিই করান এই সাবজেক্টটি, তিনি একদা স্কুলে হিন্দি পড়েছেন, কর্মসূত্রে বলেওছেন বহুবার, মায়ের চেয়ে অন্তত ভালো জানেন। দাদুমণির হিন্দি শোনার অযোগ্য ভয়াবহ, অতএব মায়ের আপাতত গুগলঠাকুর ভরসা।
ক, কা, কি... ইত্যাদি দিয়ে শব্দগঠন ছিল। দিব্যি চলছিল, ঠেকে গেল ‘ঃ’তে এসে।
তিতির যেই না নাকের ডগায় চশমা ঠেলে প্রবল সিরিয়াস মুখে বলেছে, “কঃ!” অমনি আমার ‘দ্রিঘাংচু' মনে পড়ে গেছে! তারপর না হেসে পারা যায়? হাসামাত্র ওদিক থেকে কৈফিয়ত তলব, “হাসছ কেন, হাসছ কেন?” তখন ছোট্টটাকে বলতেও হয় গল্পটার কথা, তারপর দুজনে মিলে জাপটাজাপটি করে হেসে কুটিপাটি হতেও হয়, তারপর রাত্রে আসল গল্পটা পড়ে শোনাব কথাও দিতে হয়,  তারপর দেখা যায় সর্বনাশ সমুৎপন্ন হইয়াছে।
কঃ দিয়ে আমি কোনো শব্দ জানি না। কোনোই না।
এদিকে তিতির ‘আমার মা সব জানে’ গোছের মুখ করে চেয়ে আছে।
কী আর করি, লেখার সময় শব্দ ভেবে না পেলে যা করি, তাই সাজেস্ট করলুম।
“চ, বার বার বলে দেখি, ঠিক মাথায় কিছু না কিছু এসে যাবে।“
আরো মিনিট দশ পরের দৃশ্য। মা আর মেয়ে মুখোমুখি বসে “কঃ?” “কঃ!” করে যাচ্ছে, করেই যাচ্ছে, দাদুমণি আর আন্টি উঁকি মেরে দেখে পালিয়েছে। এমন সময়ে ডাকাডাকিতে আকৃষ্ট হয়ে নাটকের পরবর্তী কুশীলব জানলায় এসে বসল, তারপর সেও আমাদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ‘ক্কঃ!’ ‘ক্যাঁঃ’ করতে লেগে গেল।
কে জানে সেটা কাক না দ্রিঘাংচু!

Wednesday, 15 August 2018

ইকড়িমিকড়ি

ব্যাপার হল তিতির তো বড় হচ্ছে, হোমটাস্ক, গান প্র্যাকটিস, আরো নানাবিধ অ্যাকটিভিটি, জন্মদিনের নেমন্তন্ন স্কুলের পিকনিক ইত্যাদি সামাজিকতা এরকম কত কিছু ঢুকে যাচ্ছে রোজের রুটিনে আগের চেয়ে আরো বেশি বেশি সময় নিয়ে মা-মেয়ের হাপুটি-জুপুটি খেলার সময় যাচ্ছে কমে, ফলে এখন আর সব সময় তেমন গল্প গজায় না
তবু, ফাঁকফোকরে সেই যেটুকু সময় বেরোয়, তাতে যেমন মঈশাসুরের গপ্পো গজায়, তেমনি এগুলোও গজায় টুক টুক করে তাই ভাবলুম এগুলোর কথাও লিখেই রাখি, পড়ে হয়তো আর কোনো পুঁচকেপানা আর তার কোনোগাজ্জেনএসবখেলার মজাটা পাবে
ইকড়িমিকড়ি
===========
মাম্মার সঙ্গে লাফাতে লাফাতে বাড়ি ঢুকল কন্যা, জামা ছাড়াতে গিয়ে দেখা গেল তার হাতের মুঠোয় একমুঠো গম মাম্মা যখন মুদির দোকানে হিসেব করে দাম দিচ্ছে, সামনের ড্রাম থেকে তুলে এনেছে
কী করবি রে?
খাব
কাঁচা গম খাবি! তুই কি পায়রা?
এঁ, না, পায়রা নোন্না করে
তবে কী করবি?
আচ্ছা, এইখানে পুঁতে দিলে হয় না? গম গাছ গজাবে বেশ, তারপর আমরা সেটা পিষে আট্টা বানাবো
আন্টি হাউমাউ করে ছুটে না এলে দিম্মার সদ্য লাগানো সং অফ ইন্ডিয়ার দফা রফা হয়ে যাচ্ছিল আরেকটু হলে
তিতিরের দেখি মুখে মেঘ অগত্যা দিম্মা ভোলাতে বসল, ঐ দশদানা গমের গাছ দিয়ে আট্টা বানালে তো আমরা কেউই কিছু খেতে পারব না, তাঁর চেয়ে অন্য একটা জিনিস শেখাই তোকে চল একটা পিজবোর্ড জোগাড় করে কিছু একটা আঁক দিকি!
আঁকার নামে তো তিতির এক পায়ে খাড়া পিজবোর্ড খোঁজা নিয়ে খানিক এটা ওটা টানাটানির পর দাদুমণি একটা টুকরো জোগাড় করে দেন মাম্মা ততক্ষণে বুঝে নিয়েছে কী শেখাতে চলেছেন দিম্মা, আহা, দিম্মারই তো মেয়ে তিনি, যতই না কেনঢ্যাঁড়শপ্রকৃতির হোন! মহা উৎসাহে রান্নাঘর তল্লাশি করে মুসুর ডাল, চিঁড়ে আর পেঁয়াজের খোসা সংগ্রহ করা হয়ে গেছে তার
আর কী? একটা ফেভিকলের শিশি, পেন্সিল দিয়ে একখানা আউটলাইন ড্র করা, কাঁচি দিয়ে পেঁয়াজের খোসা তিনকোনা করে কাটা আর মা-মেয়ে মিলে দিম্মার তদারকিতে পটাপট লাগিয়ে ফেলা অমনি কাগজের উপর ঝলমল করে পাখনা নাড়তে লাগল নিমোর কোনো এক ভাই-বেরাদর
এই যে তিনি!















ইকড়িমিকড়ি
============
তিতির সেদিন সবেতেইবোরহয়ে যাচ্ছে বই পড়বে না, গান শুনবে না, ছবি আঁকবে না, বিল্ডিং ব্লক নিয়ে খেলবে না, ক্রাফট বানাবে না, মেকানো দিয়ে ব্রীজ বা সাইকেল করবে নানোঁতুন কিঁচুচাই তার, মানে সেই চ্চাঁই চ্চাঁই চ্চাঁই!
তখন মায়ের মাথায় ঝিং ঝিং করে আইডিয়া এল, কবে কোনো এক সিপিয়া রঙের ছোটবেলায় এটা খেলত সে তার দিদার সঙ্গে, প্রতি পনেরো দিনে গোগ্রাসে গেলা আনন্দমেলা পত্রিকা থেকে শেখা সম্ভবত
দে তো রে তোর ছবি আঁকার খাতাটা
ন্নাঁ!!! ছবি আঁকতেবোরহচ্ছে!
আরে এটা নতুন খেলা দে নাময়ূরিকাকে
হাসবেন না বাপু আমাদের বাড়িতে একটু মজার নাম দেওয়া হয় বরাবর তিতিরের পুতুলভ্যাবাচ্যাকা খাসনবিশএর কথা তো আপনারা জানেনই, তারপর ধরুন আমাদের কলকাতার বাড়ির পাম্পের নামপাম্পুমোহন পুরকায়স্থ’, বাজারের থলিদের নাম ভাণ্ডারীআরমৎস্যগন্ধা তেমনি তিতিরের লেটেস্ট খাতাটার ওপর একটা ল্যাজঝোলা ময়ূরের ছবি আছে, তাই তার নামময়ূরিকাবলা বাহুল্য এসব দাদুমণির অবদান
খাতা এনে দিতে কয়েকটা আয়তাকার কাগজ কেটে বার করি একেকটার সাইজ ঐ এ-ফোর পাতার আদ্ধেক ধরুন তার একটা নিয়ে তিন ভাঁজে ভাঁজ করি তারপর খেলাটা বুঝিয়ে দিই
প্রথম ভাঁজে তিতির একটা মুন্ডু আঁকবে যে কোনো জীবের পশু, পাখি, মানুষ, বয় গার্ল যা প্রাণ চায়
শুধু আমাদের দেখতে দেবে না কী আঁকল মুণ্ডুর নিচ থেকে গলার দাগটা লম্বা করে পৌঁছে দেবে পরের সাদা অংশে, দিয়ে আবার এমন ভাঁজ করবে যাতে মুণ্ডু দেখা না যায়, খালি গলার দাগটুকু দেখা যায়
পরের জন, ধরুন আমি, দ্বিতীয় অংশে সেই গলার দাগ থেকে একটা শরীর আঁকব আবার সেই পশু, পাখি, মানুষ, বয় গার্ল যা প্রাণ চায়আবারও, আর কাউকে দেখতে দেব না কী আঁকলাম
কী বললেন, মুণ্ডু কার না জেনেই আঁকতে হবে? হ্যাঁ তো! সেটাই তো মজা
তারপর আমি শরীরের নিচ থেকে পায়ের দাগ শুরু করে আবার পরের, মানে শেষ সাদা জায়গাটায় বাড়িয়ে দেব দিয়ে আমার পার্টটাও ভাঁজ করে পরের জনকে দেব ধরুন এই যেমন দিম্মাকে দিলুম
সে মাথা গা কিচ্ছু না জেনে, আবার তার ইচ্ছে মত পা আঁকবে ঐ দাগ ধরে যা প্রাণ চায়
তারপর ভাঁজ খুলে পুরোটা দেখুন - হাসিমুখ মেয়ের ঝুঁটি বাঁধা মুখ, তার নিচে হয়তো চিতাবাঘের চাকা চাকা গা থাবা ল্যাজ, আর গরু বা হরিণ বা ছাগলের ঠ্যাঙ - আর হেসে লুটিয়ে পড়ুন সবাই মিলে
হেব্বি না? এইটে এখন তিতিরের হট ফেভারিট, চলছে মাঝে মধ্যেই কয়েকটা নমুনা নিচে দেওয়া গেল








Sunday, 4 February 2018

সাইকেল

দুপুরবেলা। খেয়েদেয়ে লম্বা হয়েছি। আজ কিনা আলুপোস্ত হয়েছিল, সেটা আবার তিতির খুব ভালবেসে চেয়ে চেয়ে খেয়েছে বলে আমি এবং তার আন্টি দুজনেরই দিল খুশ। তায় আবার খেতে খেতে তুতু-ভুতু পড়েছে, বগা পুলিশের কাণ্ড দেখে হি হি করে হেসেছে। ফলে দাদুমণিও দিব্য খুশ।
সদ্য গতকালই সাইকেলটা সার্ভিসিং করিয়ে এনেছি তাঁর। কাজেই ছোট্ট হৃদয় ঐ সিঁড়ির নিচের পিঙ্ক দ্বিচক্রযানে বাঁধা পড়ে আছে, আকুলিবিকুলি চলছে সাইকেল চালাতে যাবার। ইদিকে রাস্তায়্ একে রোদ ঝাঁ ঝাঁ, তায় দেখতে পাচ্ছি বাম্পারগুলোয় সাদা হলুদ ডোরা কাটা রঙ করার কাজ চলছে, দুজন উবু হয়ে বসে তুলি বোলাচ্ছেন। ভুলিয়ে ভালিয়ে রোদটা না পড়া অবধি কন্যাকে সাইকেল থেকে দূরে রাখতে হবে।
এমন ঝাঁ ঝাঁ রোদ ভরে থাকত সিঁথির দোতলার ছাতটাতেও। সেটা তখনো এমন গাছের টবে ভরাভর্তি হয়ে যায়নি। ফাঁকা জায়গায়, বোঁ বোঁ করে সাইকেল নিয়ে পাক খেত এইরকম ছ-সাত বছরের মেয়েটা। ঝাঁকড়া ঝুমরো চুল মুখেচোখে এসে পড়ত বলে মাঝে মাঝেই মাথা ঝাঁকিয়ে সরিয়ে নিত। উঁহু, তার এমন দেখনদার সাইকেল ছিল না। একটা তিনচাকা ছিল, কার বলো তো? তার দিদার ছোটবেলার। এক বাক্স পিতলের কুচি কুচি রান্নাবাটি আর আদ্যিকালের হারমোনিয়ামটার সঙ্গে সঙ্গে এই সাইকেলটাও সে উত্তরাধিকারে পেয়েছিল দিদা-বড়দিদার সেই কোনকালের ঢালা বিছানা, রঙীন কাচের জানলা আর রোজের লুচি-পরোটার জলখাবারের শিশুকাল থেকে।
এদ্দিন অটুট রইল কী করে? কী যে বলেন না! আগাগোড়া লোহার তৈরী তো, এখনকার প্লাস্টিকের ফঙ্গবেনে জিনিস নাকি! লোহার রড, বসার সীটের বেস, চাকা। দাদু যখন মাচার সম্পত্তি থেকে সেটা টেনে বার করে আনল, তখন কিঞ্চিৎ জীর্ণ মরচে ধরা দশা, সীট আর টায়ার গায়েব। ঘষেমেজে, তার উপর কটকটে আকাশী নীল রঙ করে, সীট টায়ার লাগিয়ে সেটা ছাতে তুলে দিয়েছিল দাদু। মা কলেজ যায়, মেয়ে বাঁই বাঁই করে নীল সাইকেলে চক্কর কাটে। তিনচাকা নিয়ে ব্যালেন্সের খেল খুব একটা সম্ভব হত না, কিন্তু স্পীডের যে কী নেশা! আর চাকায় নিয়মিত তেল দিতে ভুলে গেলেই ক্যাঁচ কোঁচ আওয়াজ। ঐ আওয়াজের জ্বালায় এরকম দুপুরে সাইকেল চালানোটা হত না মেয়ের, চুপি চুপি ছাতে গিয়ে শুরু করলেই হয় দাদু ঘুম ভেঙে ধমক দিত, নয় দিদা এসে ধরে নিয়ে যেত।
তা, আমায় ভুলিয়ে রাখা বড় সোজা ছিল। একটা আগে না পড়া আনকোরা বই হাতে ধরিয়ে দিলেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে অখণ্ড শান্তি। গল্পের বইয়ের অভাব হলে বাংলা ব্যকরণ বা মধুসূদন রচনাবলীও চলত।
কিন্তু আমার বুকে শেল হেনে তিতির এখনো গল্পের বইয়ে ‘নিজে নিজে’ বুঁদ হয়ে যেতে পারে না। তাকে গল্প শোনাতে হয়। কাজেই তাকে ভুলিয়ে রাখার অনেক ফন্দিফিকির করতে হয় এখনো।
“তিতির আয় আমরা অক্ষর দিয়ে ফুল-ফল-পাখি-জন্তু খেলি।”
“ইয়েয়েয়েয়েয়েয়ে!”
তিনটি ভিন্ন অ্যাঙ্গেলে ঝম্পপ্রদান খাটের ওপর। শেষেরটা প্রায় আমার পেটের মধ্যে।
নাগালে পেতেই, জাপটে সাপটে শুইয়ে ফেলি, “বল দেখি পি দিয়ে।”
“পি...পাইনাপল!”
“ফল হ’ল, এবার ফুল বল?”
“প্পপ্পপ্পপ্যারট্‌”
“আচ্ছা বার্ড হ’ল। ফুল?”
“পি ইউ এম এ পুমা!”
“আচ্ছা, অ্যানিম্যালও হ’ল। কিন্তু ফুলটা বল?”
“বুঝলে মা, প্যারট না, পেঙ্গুইন। আমি পেঙ্গুইন বেশি ভালবাসি।“
“ফুল মনে পড়ছে না, তাই তো?”
কিলিরবিলির করে মাথা দিয়ে গুঁতো আর ভুবনমোহিনী হাসি।
“কেন কত তো আছে, প্যানজি, পপি, দিম্মার বাগানে দেখেছিলি না?”
“হুঁউউউ...মাম্মা আমি না ফুল বলব না। কালার বলব হুঁ? পি দিয়ে পাপ্পল্‌!”
ফাঁকিবাজ কি সাধে বলি। যাই হোক আর দুবার এমন খেলার পর বিচ্ছুটা আমায় ‘কিউ’ দিয়ে বলতে দিল। তখন বাধ্য হয়ে অন্য খেলা আমদানি করতে হল। একটা মিনি কালারিং বুক পড়্রে ছিল, তাই হাতে ধরিয়ে বললুম, র‍্যাণ্ডম একটা পাতা খুলে যা ছবি পাবি সেটা আমায় শুধু বর্ণনা দিয়ে বোঝা, কিসের ছবি বলবি না আমি গেস করব। একদম নতুন গেম, সদ্য বানিয়েছি, তাই প্রবল উৎসাহে খেলতে লেগে গেল। এত বকবকানির মধ্যে ঘুমোনোর চেষ্টা বৃথা বুঝে দাদুমণি  উঠে বসেছিল ততক্ষণে, তিনিও যোগদানের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন।
“একজনের নাকে না...(ফিসফিস করে দাদুমণিকে, এটাকে কী বলে গো? ফিসফিস ফিসফিস)...নাকে না...খড়গো আছে।”
“গণ্ডার! এত সহজ হিন্ট দিস না, শক্ত শক্ত দে।“
“উম্মম...আচ্ছা, একজনের শুঁড় আছে।“
“হাতি! বলছি না শক্ত দে?”
“হয়নি, হয়নি, ফেল!” মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে বলে সহর্ষ কন্যা।
অ্যাঁ! হাতি নয় শুঁড় আছে? সে আবার কী? ও, বুঝেছি, শুঁড়ের অবস্থানে ভুল করেছি। মৌমাছি? তাও নয়? তাহলে প্রজাপতি?
“আরে ধ্যাৎ! মাথায় নয়! এমনিই শুঁড় আছে।“
এবার রাম ট্যান খাই। এমনি এমনি কার আবার শুঁড় হয়?
“ছোট্ট শুঁড়। পুঁচকি পানা।“
শুঁড়ের সন্ধানে অ্যানিম্যাল কিংডম হাতড়াই। কে রে ভাই! ওদিকে ফিসফিস চলছে, দাদুরও নাকি নামটা মনে পড়ছে না। ওঃ! পেয়েছি, ‘সূর্যদেবের বন্দী’র ক্যাপ্টেন হ্যাডক-কে মানসচক্ষে দেখতে পেয়েছি!
“ওটাকে পিপীলিকাভুক বলে বুঝলি। পিপীলিকা মানে পিঁপড়ে, আর ভুক মানে যে খায়। ওটা পিঁপড়ে খায়। শিখিয়েছিলুম তোকে আগে, ভুলে গেছিস।“
“আচ্ছা এইটে বলো। একজনের পিছন দিয়ে ধোঁয়া বার হয়।“
হাঁ হয়ে যাই। ওদিকে দাদু উঁকি মেরে ছবিটা দেখে বেদম হাসতে লেগে গেছে।
অনেক কসরৎ করেও এ অসম্ভব জিনিস পারি না। শেষে তিতির বই দেখায়, দেখি...
একটা ট্রাক।
“এ আবার কী! একজন বললি কেন? এক’জন’?”
“আহা, ট্রাকও তো একজন লোক। আমি চোখ মুখ এঁকে দিইনি তাই বুঝছ না।“
বুঝতেই পারছেন এমন গোলমেলে মেয়ের সঙ্গে আমি আর খেলতে রাজি হইনি। তাছাড়া সে রঙ পেন্সিল এনে ট্রাকের চোখ মুখ আঁকতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল তারপর।
একটু আবার চোখটা লেগে এসেছে, মাথার কাছে তারস্বরে চীৎকার -
“হ্যালো লোক!!! রঙ কি শুকিয়েছে এবার?”
চেয়ে দেখি তিনি জানলার সামনে বাবু হয়ে বসে রাস্তায় রং করা দুজনের উদ্দেশ্যে হাঁকডাক জুড়েছেন। ধড়মড় করে উঠে বসতে বসতে স্বগতোক্তি শুনি -
“ও না না, দুজন লোক তো, একের বেশি। তাহলে…”
আবার পাড়া কাঁপানো চীৎকার, “হ্যালো লোকস্‌!”
সব্বোনাশ করেছে। নাঃ, আর বিশ্রামের আশা করে লাভ নেই, রোদটাও আর রাস্তায় নেই, যাই সাইকেলের পিছনে দৌড়ই গে’!


Tuesday, 6 December 2016

ভারতমাতা


ফ্যান্সি ড্রেস নিয়ে প্রতি বছর কি যে ফ্যাসাদে পড়ি সে আর কহতব্য নয়। আরে ঐ যে বচ্ছর বচ্ছর ইশকুলে হয় গো? যাতে সারি সারি গলায় স্টেথো মিনি-ডাক্তার, টপ হ্যাট ম্যাজিশিয়ান থেকে শুরু করে গাউন নিয়ে লটপট করা ব্যক্তিত্বময় বিবেকানন্দ, ক্ষীণতনু চার্লি চ্যাপলিন থেকে আরম্ভ করে নাদুশনুদুশ কেষ্টঠাকুর, আর মেয়েমহলে পিঠে ডানা হাতে জাদুদন্ড পরী, নাকে নথ বালিকা বধূ থেকে আদি নীল-সাদা শাড়ির হকদার মাদার টেরিজা অবধি ঘুরে বেড়ায়, স্টেজে উঠে ভাষণ দেয় তবে সুখের কথা তিতির কিনা এখনো বাচ্চা, ওদের শুধু স্টেজে উঠে একটা পোজ দিয়ে দাঁড়ালেই চলে, কিছু বক্তব্য পেশ করতে হয় না।
    কিন্তু পোজ দিতে হলেও তো কিছু একটা সাজতে হবে? ধরে নাও আমি একটা জিবেগজা, কি ইলেকট্রন, কি মিসিং লিংক – বলে দাঁড়িয়ে পড়লেই যদি ল্যাঠা চুকে যেত! আচ্ছা কেন যায় না বলুন তো, আমি তো দিব্যি ‘এই মনে কর আমি একটা গাছ’ বলে হাত টাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়ি, আর তিতিরও দিব্যি ‘আর আমি একটা কুইরেল’ বলে তর তর করে ভুঁড়ি বেয়ে কোলে উঠে পড়ে। কিংবা তিতির বলে ‘মনে কর আমি একটা চিতাবাঘ’, আমিও অমনি দেখতে পাই গায় চাকা চাকা দাগওলা এক অতি বিচ্ছু ছানা-চিতা, রাজকীয় চালে যেতে যেতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়েছে, ল্যাজের ডগাটা একটু একটু নড়ছে, এমনকি বেঘো গন্ধটাও নাকে পেয়ে যাই। কিন্তু তিতিরের ক্লাসের ছানাপোনাগুলো যদি বা এসব দেখতে পারে, তাদের বাবা মা বা টীচাররা দেখতে পাবেন আশা করা বাতুলতা।
অগত্যা মেয়েকে বেশ একটা খোলতাই দ্রষ্টব্য কিছু রূপ ধারণ করাতে হবে – মানে ভেবেচিন্তে চরিত্র চিত্রায়ন থেকে নাট্যরূপ প্রদান, মায় ফার্স্ট (ও একমাত্র)এডিশন পাবলিশ করা অবধি সব আমার আর তিতিরের দিম্মার হোমটাস্ক! দু সপ্তাহ ধরে দুজনে প্রাণ ভরে মস্তক ঘর্মাক্ত করতে লাগলুম, আর তিতির প্রতিদিন নতুন নতুন দাবি করতে লাগল। তার অনেকগুলোই খারাপ না, কিন্তু ঐ যে আমার মাথায় ক্যারাপোকা এবং বাজারে কিঞ্চিৎ ক্রিয়েটিভ বদনাম আছে, যেটা সম্বন্ধে আবার কোন পাপের ফলে কে জানে তিতিরের টীচার মহলও ওয়াকিবহাল, ফলে চেনাজানা ‘প্রজাপতি’ (খুব সহজ বানানো, রেডিমেড ডানা, অ্যান্টেনা সব আছে), ‘ফেয়ারি প্রিন্সেস’ (ওই ডানা দিয়েই চলবে, আর জুহু থেকে কেনা পেন্সিলের মাথায় স্টার, আর কাগজ কেটে মুকুট) বা ‘রাধা’ কি ‘মীরাবাই’ (সেম ঘাগরা মেকাপ আর কান্নিক মেরে চুল বাঁধা, খালি একটু গয়নাগাটির রকমফের ব্যাস!) করতে তো মন চাইছে না!
ফলে কিছুদিন এই চলল -
“ক্যাটারপিলার! মা আমি ক্যাটারপিলার হব!”
সবুজ চার্টপেপার কিনতে হবে তাহলে, গোল গোল কেটে বডি, কালোও লাগবে, পা আর শিং বানাতে হবে, কিন্তু পিছনে বোর্ড না দিলে কি শক্তপোক্ত হবে? আর ক্যাটারপিলার স্টেজে কি পোজ দেবে? চাট্টী ফুলকপির পাতা ধরিয়ে দেব নাকি হাতে?
ভাগ্যিস কিনে ফেলিনি। পরদিনই মেয়ের মন পালটে গেল।
“আমি ডাক হব মা! ইয়েলো ডাক! প্যাঁক প্যাঁক করে ডাকব স্টেজে উঠে।”
মানে হলুদ চার্টপেপার। চলবে। অরেঞ্জ লেগিংস পরা পা। কমলা ঠোঁট – কেলেংকারি করেছে! ওরকম থ্যাবড়াপানা হংসচঞ্চু বানাইব ক্যাম্নে? ঘোর দুশ্চিন্তায় জল খেতে গিয়ে ভুল করে কাফ সিরাপ খেয়ে ফেলি।
“আর ল্যাজ করে দেবে, ল্যাজ নাড়ব বেশ স্টেজে উঠে!”
এবার থপাস করে এমন জোরে বসে পড়ি যে নিজের ল্যাজে, আহ নেই, মানে থাকলে যেখানটায় থাকত সেখানে ব্যথা লেগে যায়।
নাড়ানোর যোগ্য ল্যাজ বানাতে হবে? হাঁস সাজতে গিয়ে আমায় হাঁসফাঁস করিয়ে দিচ্ছিস তো!
পরদিন সেটাও পালটে যায় আবার। তিনি স্বপ্নে জিরাফ দেখেছেন। অতএব এবার জিরাফত্বের দাবি।
এককথায় নাকচ করে দিই। অত লম্বা গলা খালি চার্ট পেপারের কম্মো নয়। আর অফিসের পর ঘুরে ঘুরে অত বড় থার্মোকল জোগাড় করে এনে তাতে জিরাফ কাটা, পড়তায় পোষাবে না। আর সেই এক সমস্যা, স্টেজে উঠে কি বা পোজ দেবে? তার চেয়ে হাতি হ!
“এলি! এলি দ্য এলিফ্যান্ট!”
ছাই রঙের চার্ট পেপার কি হয়? না হলে সাদা এনে রং করতে হবে। দুটো ধ্যাবড়া কান, শুন্ড, ও হো সাদা তো লাগবেই দাঁত করতে হবে, ওরকম ছাই ছাই রঙের লেগিংস আছে মনে হচ্ছে, ব্ল্যাক শু। একটা পুঁচকে কলাগাছ পাওয়া যায় কিনা খুঁজব চেম্বুরের বাজারে?
পরদিন আবার মন খুঁতখুঁত করে। ঠিক তেমনটা হচ্ছে না।
আচ্ছা, তোর ইশকুল কি চিড়িয়াখানা নাকি? খালি জীবজন্তু সাজতে চাইছিস কেন?
তিতির আর কিছু ভেবে না পেয়ে বোধহয় গাছ হতে চাইল এবার।
এটা কিন্তু আমাদেরও মনে ধরল। বেশ দুহাত ছড়িয়ে দাঁড়াবে, সারা গায় ব্রাউন পেপার জড়িয়ে দেব। সবুজ চার্ট পেপার কেটে পাতা করে ডালে আটকে দেব, ফুল-ফলও লাগিয়ে দেব কিছু, আর ছোট পুতুল মাংকিটা ঝুলিয়ে দেব এক হাতে। মাথায় একটা ঝাঁকড়া পাতা-ফাতাওলা হেডব্যান্ড, তার মধ্যে একটা পাখির বাসা বসিয়ে দেব নাহয়, ঐ ম্যাকাও পুতুলটা আর গোটা দুই ছোট বলকে ডিম করে...
“সত্যিকারের ডিম দেবে! আন্ডা!”
“আরে! পড়ে গেলে ফেটে যাবে, সব চটচট হবে!”
“না সত্যিকারের ডিম দিতে হবে। ম্যাকাওটা বেশ তা দেবে!”
কদিন এটা নিয়ে জল্পনা কল্পনা চলল। তারপর এক ঘনঘোর সন্ধ্যায় তিতিরের দিম্মার ব্রেনওয়েভ।
সরস্বতী পুজোয় পরবে বলে কেনা লাল-পাড় উজ্জ্বল হলুদ শাড়ি আছে।
তিতিরের মাথায় লম্বা চুল আছে।
এক কাঁড়ি হার-বালা-টিপ ইত্যাদি আছে।
ছ মাস আগে নতুন ওয়াশিং মেশিন কেনার দরুণ একটা জম্পেশ চৌকো শেপের থার্মোকল আছে।
শাড়িটি পেঁচিয়ে, চুড়োখোঁপা বেঁধে, মালা টালা পরিয়ে, আর ঐ থার্মোকলে ভারতের ম্যাপ সেঁটে দড়ি দিয়ে পিঠে বেঁধে দিলেই
“ভারতমাতা”!
যুগোপযোগী রূপ? আরে দূর, আমাদের বঙ্কিম অরবিন্দ রবীন্দ্রনাথ অবনীন্দ্রনাথের ভারতমাতা, আদি, আবহমান, চিরন্তন
সবাই মিলে এটা ফাইনাল হয়ে গেল। কাজেই আর না ভেবে কাজে লেগে গেলুম। পরদিনই ফিরতি পথে নীল, কমলা, গাঢ় সবুজ, কলাপাতা সবুজ, আর হলুদ সব রকম চার্ট পেপার নিয়ে এলুম। অত বড় ম্যাপ কোন একটা পেপারে হবে না, আর জোড়াই যখন দেব তখন একটু রং নিয়ে নিই! টুলে চড়ে, কোন অঘটন না ঘটিয়ে থার্মোকলটিও প্রত্যন্ত মাচা থেকে আহরণ করে ফেললুম।
পরের দিনটা গেল তাতে মাপসই চারটে ফুটো করতে যাতে তিতিরের পিঠে ওটা বাঁধা যায়। বেঁধে দেখে নিতে হল আন্দাজ করার জন্য, আর তার ফলে আরেকটু হলেই সব প্ল্যান ভোগে যাচ্ছিল, কারণ তিতির ওটা পিঠে বাঁধা অবস্থাতেই খেলার ঘরে যেতে গিয়ে দরজায় আটকে গেছিল। আমি পৌঁছনোর আগে আরেকটু টানাটানি করলেই দুর্বল থার্মোকল দেহরক্ষা করত। উদ্ধারপর্ব সেরে, তাতে আগাপাশতলা আকাশ নীল পেপার সেঁটেও ফেললুম। একদিনের পক্ষে যথেষ্ট!
তিতির কাউকে বলবি না কিন্তু কি সাজছিস! সারপ্রাইজ, হ্যাঁ?
অতএব, পরদিনই তিতিরের সারা ক্লাস, এবং বাড়ির সব বন্ধু জেনে গেল ‘ভারতমাতা’ কারে কয়! সবাইকেই গুছিয়ে বারণ করে হয়েছে অবশ্য কাউকে যেন না বলে, কারণ এটা ‘সারপ্রাইজ’!
---
শনিবার ফ্যান্সি ড্রেস কম্পিটিশন। বিষ্যুদবার রাত অবধি কাজ আর বিশেষ এগোল না। শুক্রবার আধবেলা ছুটি নিলুম শেষে। একটু ফাঁকিবাজির চেষ্টা করলুম, দোকান থেকে বড় সাইজের ভারতের ম্যাপ কিনে আনতে গেলুম। কিন্তু পেলুম না, নেই। যাকগে যাক, বয়েসকালে রাখীদির তত্ত্বাবধানে কয়েকশোবার ভারতের ম্যাপ এঁকেছি, এটাও এঁকে দেব। বাইরের ঘরে ঠ্যাং ছড়িয়ে বসা গেল, চার্ট পেপার, ফেভিকল, কাঁচি, পেন্সিল রবার সব নিয়ে, রেফারেন্স হিসেবে ট্যাবে ভারতের ম্যাপ খুলে। কমলায় উত্তর ভারত, হলুদে পশ্চিম, কলাপাতা সবুজে পূর্ব আর গাঢ় সবুজে দক্ষিণ ভারত। উত্তরটা অনেক কসরত করে এঁকে মুখ তুলে দেখি তিতির ট্যাব নিয়ে পগারপার।
তাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে এনে পাশে বসিয়ে, ম্যাপ খুলে আবার আঁকতে বসলুম। ওরে চা দিচ্ছিস না কেন? পিঠে ব্যথা হয়ে গেল যে!
আমাদের কচিবেলায় প্যাকম্যান বলে একটা গেম ছিল মনে আছে? আজকের ভিডিও গেমস এর পূর্বজ? সেই একটা আধখানা মুখ কপ কপ করে গুল্লি খেতে খেতে যেত? গুজরাট আঁকতে গেলেই আমার সেটার কথা মনে পড়ে যায় – কেমন একটা হাঁ মুখের মত না? খুব যত্ন করে সেই হাঁয়ের খাঁজগুলো আঁকছি, মাতৃদেবীর মন্তব্য, খুব তো কারুকার্য করছ, ঐ সঘন কম্পমান রেখা বরাবর যে কাটতে হবে সে খেয়াল কি আছে?   
শুনেই তো আমি নেই! অ্যাঁ, আবার কাটতেও হবে?
সে তো হবেই! নইলে অত কষ্ট করে নীল কাগজ মারলি কেন ঢ্যাঁড়শ? সমুদ্দুর বোঝাবি বলে না?
তাই তো! তেমনই তো ভেবেছিলুম বটে। নাগাড়ে এতক্ষণ উপুড় হয়ে ম্যাপ আঁকতে গিয়ে সে তো ভুলেই মেরে দিয়েছি। আচ্ছা দেখা যাক কদ্দূর কি পারি। আগে দেখ তো চারটে অংশ সমঞ্জস হল কিনা।
তিতির দেখে বলল “কি সুন্দরী হয়েছে মাম্মা!”
মা দেখে বলল ডানদিক উঠে আর বাঁদিক নেমে গেছে।
সে তো আমার মাগো, এঁকে এঁকে ডান কাঁধ টনটন আর ভর দিয়ে বসে থেকে থেকে বাঁ কাঁধ অসাড় হয়ে গেছে!
কিন্তু ম্যাডামজী ঠিকই বলেছেন, উঠে দাঁড়িয়ে দেখি ত্যাড়াব্যাঁকা হয়ে গেছে ব্যাপারটা। এত বড় স্কেলে আগে তো আঁকিনি। আবার রবার পেন্সিল নিয়ে লেগে পড়ি।
উফফ কি খাটনি! হ্যাঁ রে, আইডিয়া! তুই ‘স্কুলগার্ল’ সেজে যা না?
দিম্মা আর নান্নির যৌথ দৃষ্টিক্ষেপে প্রায় ভস্ম হয়ে গেলুম। কিন্তু আরেক কাপ চা না দিলে মাইরি পারছি না যে! আর তোমরা বাপু নিচে খেলতে যাও, তিতির এরকম চারদিকে ধেই ধেই করে নেচে বেড়ালে আর মিনিটে মিনিটে কানের কাছে ফোঁস ফোঁস নিঃশ্বাস ফেললে মন দিতে পারছি না তো!
---
রাত নটা। তিতির খেতে বসেছে। ম্যাপ আঁকা শেষ, চার টুকরো জুড়ে আটকানো হয়ে গেছে, থার্মোকলের ফুটো দিয়ে জরির ফিতে পরিয়ে রাখা আছে, স্টেজে ওঠার আগে বেঁধে দিলেই হবে। দিম্মা বিকেলে বেরিয়ে ঘুড়ির কাগজের মত পাতলা ফিনফিনে কাগজ কিনে এনেছেন, এখন সেগুলো কায়দা করে কুঁচি বানিয়ে তাই দিয়ে হাতের গলার খোঁপার মালা গাঁথছেন। আমি এখনো ভূমিতলে, এবার ভারতমাতার হাতের ঝান্ডা বানাচ্ছি। সাইজমত লাঠি খুঁজে পাইনি, একবার ভাবছি আলমারির সাইডের একটা রড খোলা যায় কিনা, একবার ভাবছি মপার এর ডান্ডাটা খুলে নিলে কি মা চেঁচাবে, একবার ভাবছি তিতিরের ভাঙ্গা ছাতার ডাঁটিটা কি চলবে, করতে করতে মনে পড়ল একগাদা ইলেকট্রিক লাইনের কভারের টুকরো পড়ে আছে, তার একটা মাপমত এনে কাগজ পেঁচিয়ে দিলেই হবে। আরো একটা টাস্ক লিস্টে জুড়ল তার মানে।
রাত সাড়ে দশটা। ম্যাপ – চেক। ফ্ল্যাগ – চেক। বেশ পাকাপোক্ত পতাকা হয়েছে – ঐ যাঃ, অশোকচক্র আঁকতে ভুলে গেছি যে! থাক, কাল সকালে হবে, এখন আঁকলে সে চক্র বড়ই বক্র হবে। কাগজের মালাসমূহ – চেক। এক্সট্রা ব্যাকাপ গয়নাগাঁটি - চেক (যা শান্ত মেয়ে, যদি কাগজ ছিঁড়ে ফ্যালে স্টেজে ওঠার আগেই?)শাড়ি – চেক। আর যা যা লাগতে পারে – চেক। চ চ শুতে চ এবার।
----
পরদিন ব্রাশ করেই আগে অশোকচক্র প্রদান করি, মানে পতাকাকে আর কি। তারপর ভারতমাতা নির্মাণ পর্ব। শাড়ি পরা সাজুগুজু সব কিন্তু সুন্দর চটপট হয়ে গেল, খালি মাঝে একবার ভারতমাতা আত্মবিস্মৃত হয়ে খাটে উঠে ধেই ধেই করে লাফাচ্ছিলেন আর শাড়ি গোঁজার সময় তাঁর খুব কাতুকুতু লাগছিল বলে তিনি গোঁসা হয়েছিলেন দু মিনিটের জন্য।
    তারপর আমরা শোভাযাত্রা করে রওনা দিই। সবার আগে ‘ভারতমাতার অঙ্গসজ্জায়’ দিম্মা, তার কাঁধের ব্যাগে ব্যাকাপ গয়নাগাঁটি আর হাতে একটা প্লাস্টিকে খুব সন্তর্পণে নেওয়া কাগজের মালাগুলো। তার পিছনে একহাতে পতাকাটি উঁচু করে ধরে আর অন্য হাতে খাবার জলের বোতল নিয়ে ‘ফ্ল্যাগ-গার্ল’ বন্দনা। তার পিছনে স্বয়ং ভারতমাতা, সুহাসিনী, সুভাষিনী – মানে খিল খিল করে হাসছে আর অনর্গল বকবক করছে। আর সবার শেষে ‘দেশের ধারক ও বাহক’ আমি, হাতে ঐ গোবদা ম্যাপ রাস্তা দিয়ে যেই যাচ্ছে চেনা হোক বা অচেনা, বেশ একগাল হেসে দিচ্ছে। দেখে মনে পড়ল, গত বছরও এই ফ্যান্সি ড্রেস হয়েছিল। তিতির সেবার সেজেছিল পাকানো গোঁফ ওলা, মাথায় পাগড়ি, পিঠে তীর ধনুক, হাতে তরোয়াল “বীরপুরুষ”। হ্যাঁ মশাই, ওর প্রিয় কবিতা যে! তো সেবার এত মালপত্তর ছিল না, আমি একাই ওর হাত ধরে যাচ্ছিলুম। পথে এক বয়স্কা মহিলা, স্থানীয় ঢঙ্গে কাপড় পরা, ওকে দেখে হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তারপর ‘জয় রামজী’ বলে এক বিশাল নমস্কার!
    এবারে অবশ্য সেরকম কিছু হল না। স্কুলে গিয়ে বেশ খানিকক্ষণ দাঁড়াতে হল, বন্দনার সাথে ম্যাপ আর ফ্ল্যাগ পালটাপালটি করলুম – গোটা ভারতবর্ষের ভার আর কতক্ষণ একা বওয়া যায়, বলুন? আরো সব ছেলেমেয়েরা আসছে – ভুল বললুম। আজ ছেলেমেয়ে না। আজ আসছে মৌমাছি, প্রজাপতি, লুডোর ছক্কা, ম্যাজিশিয়ান, প্রজাপতি, রামচন্দরজী, সেলফোন, কৃষ্ণ, রকেট, আবার প্রজাপতি, আবার কৃষ্ণ, মাদার টেরিজা (কি বলেছিলুম? থাকবেই), পুলিশ, আবার আবার প্রজাপতি, নিনজা, আবার আরেকটা রকেট, এটা কি – খনিশ্রমিক বোধ হয় – ও না, কৃষক, বার্বি ডল, ঝাঁসীর রানি, জলদস্যু – বা বেশ তো, স্পঞ্জবব, গাজর, কাশ্মিরী কন্যা, বোঝো! নরেন্দ্র মোদী! প্রিন্সেস, পোস্ট বক্স, এ আবার কে? কিউপিড – অ্যাঁ, পাঁচ বছরের ছানা কিউপিড মানে বোঝে? ডাক্তার, মারাঠী ভাউ। যাহ! এ বছর একটাও হনুমান নেই? গত বছর গোটা দুই ছিল, সেই সাথে এক নগ্নদেহ পল্লবমেখলা-আবৃত আফ্রিকান ট্রাইব-বালক।
    যাই হোক এরা ভিতর যায়। আমরা সারি বেঁধে হলে গিয়ে বসি। তারপর এরা আবার লাইন করে এসে এক পাশে দাঁড়ায়। অমনি আমরা সবাই হুড়োহুড়ি করে উঠে গিয়ে যার যার ছানাটাকে ফিনিশিং টাচ দিয়ে দিই। দিম্মা মালাগুলো ঠিকঠাক করে দেয়, আমি আর বন্দনা মিলে ভারতবর্ষকে যথাস্থানে বেঁধে ফেলি। তিতির অতিরিক্ত সতর্ক হয়ে যায় তারপর, ম্যাপে কেউ যেন ‘টাচ না করে!’ হবি তো হ তার পিছনে দাঁড়িয়েছে কৃষক বালক - সে সমানে ‘চল কোদাল চালাই’ করছে। তিতিরের নির্বন্ধাতিশয্যে তাকে আবার একটু বাবা-বাছা করে বলে দিই সে যেন এই ভারতবর্ষের মাটিতে চাষ করতে না লেগে যায়।
    বসে বসে দেখতে কিন্তু ভারি ভাল লাগে যাই বলুন। কৃষ্ণ লাল-কালো কাবলি চপ্পল পরত, জানতেন? নরেন্দ্র মোদীর দাড়িটা বোধহয় টুথপেস্ট দিয়ে বানিয়েছে, গরমে ঘামে গলে গলে গেছে। ঝাঁসির রানি বেশ স্মার্ট তো, কি সুন্দর পিঠে পুতুল বেঁধে, তরোয়াল বাগিয়ে বেঁকে দাঁড়াল! এই যাহ, রকেটের তিনকোণা টুপি খুলে পড়ে গেছে, টিচার পরিয়ে দিতে আবারো খুলে পড়ে গেল – থাক থাক, এ রকেট ওয়ার্ক ইন প্রোগ্রেস। রুবিক কিউব নিজেই চারপাক ঘুরে গেল স্টেজে। সব মিলিয়ে হাসির ফোয়ারা। ভারতমাতা হাসিমুখে ফ্ল্যাগ ধরে দাঁড়িয়েছেন, ভাল হাততালিও পেয়েছেন।
    শেষ হবার পর আরেকটু ইনফর্মাল ছবি তোলা টোলা হয়। তিতিরের পিঠ থেকে ম্যাপটা খুলে নিয়েছি, সে রামচন্দ্র আর নিনজার সাথে দৌড়াদৌড়ি করে খেলছে। ঝাঁসির রানী আর মীরাবাই পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে দেখে শখ হল তিনকন্যার একটা ছবি তুলি। তা তাদের তখন খেলার মুড – তুললাম তো ছবি, তাতে দেখি ভারতমাতা আর মীরাবাই খামচাখামচি করছে আর ঝাঁসির রানী তরোয়াল বাগিয়ে কোনটাকে আগে পেটাবে তাই ভাবছে। কি অপূর্ব ছবি, ভাবছি ‘অগ্নিকন্যা’ ক্যাপশন দেব কিনা, চোখে পড়ে কে যেন এসে ম্যাপ-টা তুলে নিয়ে যাচ্ছে। হাঁ হাঁ করে উঠতে গিয়ে দেখি তিতিরের ক্লাস টিচার – মাতৃদেবী সলজ্জ মুখে জানান টিচাররা নাকি বলেছেন ঐ ম্যাপ এখন থেকে স্কুলে সাজিয়ে রাখা হবে। ভ্যাবলাপানা হাসিমুখে দেখি আমার এই এত ঘন্টার পরিশ্রমের ফসল ম্যাপ, মায় ফ্ল্যাগটা অবধি দুই টিচারের হাতে অন্তর্হিত হল। কি ভাগ্যিস আলমারির কি মপারের রড খুলে ফ্ল্যাগের ডান্ডা বানাইনি!
    ---
এক বিশাল পর্ব নির্বিঘ্নে সমাপন করায় মন বেশ প্রফুল্ল ছিল। রাত্রে ‘যেদিন সুনীল জলধি হইতে উঠিলে জননী ভারতবর্ষ’ গাইতে গাইতে ঘুমোতে যাচ্ছিলুম, কন্যার প্রশ্ন,
“জননী মানে মা তো?”
“হ্যাঁ মাভারতবর্ষ আমাদের দেশ তো, দেশকে ভালবেসে মা বলা হচ্ছে।”
“ভারতবর্ষ আমাদের মা?”
“হ্যাঁ, তাই তো বলছে।”
“আর ভারতবর্ষ আছে পৃথিবীর মধ্যে, তাই তো?”
“ঠিক।”
“তাহলে পৃথিবী হল ভারতবর্ষের মা, মানে পৃথিবী আমাদের দিম্মা
নিজের মা আর দিম্মাকে যুগপৎ হতভম্ব করিয়ে দিয়ে ছোট্ট মেয়ে শুতে চলে গেল।