Showing posts with label Ganesh. Show all posts
Showing posts with label Ganesh. Show all posts

Saturday, 24 August 2019

দ্রিঘাংচু

 
যেই একটু নিজের কাজে বসব, অমনি অবধারিতভাবে ছোট মানুষটির আগমন ঘটবে। হুস করে ঢুকে হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে হুস্‌-তর গতিতে বেরিয়ে যেতে যেতে বলে গেল,
“মাঁ! গণেশটা কী সুন্দর এঁকেছি না? পরশুরামও আছে।“
সে তো দিব্যি নাচতে নাচতে পালাল, আমি এদিকে কাগজটার এপিঠ ওপিঠ আগাপাস্তলা খুঁজে ট্যান খেয়ে বসে রইলুম। ওপিঠে কিস্যু নেই, এপিঠে দিব্যি নধর গণুবাবা আছেন, তাঁর মাথায় মুকুট, হাতে কুঠার, সামনে লাড্ডুর থালা, পায়ের কাছে পুঁচকে ও মিচকে ইঁদুর সব আছে, কিন্তু সেই ক্রোধী মুনিটি কই? তাঁর জটার একগাছা চুলও তো দেখতে পাচ্ছি না!
ইতিমধ্যে লাট্টুর মত পাক খেতে খেতে তিতির পুনঃপ্রবেশ করেছে।
“অমন ঘুরপাক খাচ্ছিস কেন, পড়ে যাবি যে!”
“আমি এখন আথ্‌! আথ্‌ এমনি করে চলে।”
বড়ই ভাবনার বিষয়। খাটের পাশের অপ্রশস্ত জায়গায় আহ্নিক গতি হতে থাকলে আমি যাই কোথায়!
আমার চিন্তা টের পেয়েই হয়তো তিতির আশ্বস্ত করল,
“তোমায় একটা কথা বলতে এলুম খালি!”
ভনিতা করছে মানেই গড়বড়, কিছু উৎপটাং বায়না আসছে মনে হয়। তড়িঘড়ি কথা ঘোরাই,
“হ্যাঁ রে, তোর পরশুরাম কই?”
সলজ্জ হাসি সহযোগে উত্তর এল, “ওটাই তো বলতে এলুম! ভুল বলেছি, পরশুরাম নয়, পরশু। গণেশের হাতে আছে।"
বেচারি! প্রবাসে বড় হয়েও বাংলা শব্দভাণ্ডার তার এত বড়সড়, গুলিয়ে গেলে কী আর করা! বাংলা, ইংলিশ, হিন্দি এবং মারাঠী নিয়ে জাগলারি করতে হলে অমন একটু আধটু হতেই পারে। নাহয় এখনো ‘ফেব্রিক কালার’কে সমানে ‘ফাইব্রাস কালার’ বলে যাচ্ছে, এই কিছুকাল আগেই আমাদের সে খাবার ‘সার্ভাইভ’ করে দিতে চেয়েছিল – তাই বলে পরশুকে পরশুরাম বলে ফেলেছে বলে হাসব নাকি! শব্দটা জানে এই না কত!
এইসব বিবেচনা করে খুব গম্ভীর থাকার চেষ্টা করছিলুম, হাসিটাকে গালভরা পানের মত একবার এদিক একবার ওদিক করছি, হঠাৎ খেয়াল হল হোমটাস্ক বাকি আছে।
কম্পি টম্পি ফেলে হাঁক পাড়লুম, “ওরে ল্যাবেঞ্চুশ, বলি সারাক্ষণ ছবি আঁকলে আর নেত্য করে বেড়ালেই চলবে? শিগগির বইখাতা নিয়ে আয়!”
গতিজাড্য খুব খারাপ জিনিস বুঝলেন? ওতে গালে হামি পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু কচি মাথার গুঁতোয় চশমাও নাক থেকে খসে পড়ে যায়।
যাইহোক। পনেরো মিনিট পরের দৃশ্য।
খাটে বইখাতা ছড়ানো। মেয়ে ছোট টেবিল পেতে লিখছে। মা অতি বিপন্ন ভাবে নেট হাতড়াচ্ছে।
মায়ের হিন্দির যা অপূর্ব দক্ষতা, নেট না হাতড়ে উপায়ও নেই। দিম্মা থাকলে তিনিই করান এই সাবজেক্টটি, তিনি একদা স্কুলে হিন্দি পড়েছেন, কর্মসূত্রে বলেওছেন বহুবার, মায়ের চেয়ে অন্তত ভালো জানেন। দাদুমণির হিন্দি শোনার অযোগ্য ভয়াবহ, অতএব মায়ের আপাতত গুগলঠাকুর ভরসা।
ক, কা, কি... ইত্যাদি দিয়ে শব্দগঠন ছিল। দিব্যি চলছিল, ঠেকে গেল ‘ঃ’তে এসে।
তিতির যেই না নাকের ডগায় চশমা ঠেলে প্রবল সিরিয়াস মুখে বলেছে, “কঃ!” অমনি আমার ‘দ্রিঘাংচু' মনে পড়ে গেছে! তারপর না হেসে পারা যায়? হাসামাত্র ওদিক থেকে কৈফিয়ত তলব, “হাসছ কেন, হাসছ কেন?” তখন ছোট্টটাকে বলতেও হয় গল্পটার কথা, তারপর দুজনে মিলে জাপটাজাপটি করে হেসে কুটিপাটি হতেও হয়, তারপর রাত্রে আসল গল্পটা পড়ে শোনাব কথাও দিতে হয়,  তারপর দেখা যায় সর্বনাশ সমুৎপন্ন হইয়াছে।
কঃ দিয়ে আমি কোনো শব্দ জানি না। কোনোই না।
এদিকে তিতির ‘আমার মা সব জানে’ গোছের মুখ করে চেয়ে আছে।
কী আর করি, লেখার সময় শব্দ ভেবে না পেলে যা করি, তাই সাজেস্ট করলুম।
“চ, বার বার বলে দেখি, ঠিক মাথায় কিছু না কিছু এসে যাবে।“
আরো মিনিট দশ পরের দৃশ্য। মা আর মেয়ে মুখোমুখি বসে “কঃ?” “কঃ!” করে যাচ্ছে, করেই যাচ্ছে, দাদুমণি আর আন্টি উঁকি মেরে দেখে পালিয়েছে। এমন সময়ে ডাকাডাকিতে আকৃষ্ট হয়ে নাটকের পরবর্তী কুশীলব জানলায় এসে বসল, তারপর সেও আমাদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ‘ক্কঃ!’ ‘ক্যাঁঃ’ করতে লেগে গেল।
কে জানে সেটা কাক না দ্রিঘাংচু!

Thursday, 9 August 2018

মঈশাসুর-২

শোয়ামাত্র উঠে পড়তে হয়, সেই হাওয়া ভরা নাকে ঘুঁষি মারা পুতুলগুলোর মত। একটি সৌম্যদর্শন হলুদ খরগোশ হাতে গাজর নিয়ে শুয়ে আছেন আমার বালিশে। খরগোশ সরিয়ে, বালিশ সরিয়ে, মেয়ের হাত সরিয়ে, শুতেই কানের কাছে বায়না।

"মঈশাসুর বলো!"

রোজ রাত্তিরে নতুন নতুন মইশাসুরের গল্প পাই কই বলুন দিকি। না বললে, ঘুমোতেও দেবে না। অগত্যা, যা আসে মাথায়...

“মঈশাসুরের না, কদিন ধরে দাঁতে ব্যথা। এঁ এঁ করে কান্নাকাটি করছে। দুগগামা তখন ঠিক করল দাঁতের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে।   

কোথায় যাবে? না সুশ্রুত ডাক্তারের চেম্বারে যাবে।“

"অ্যাঁ মা? কী বলছ? 'সুড়সুড়ি-তো' মানে?"

“না রে, সুশ্রুত। ওটা তোর মানিকমামার ভালো নাম।“

“সুশ-শুরু-তো? ইশ কী ভালো ভালোনাম। তুমি কেন এটা আমার নাম রাখোনি?

এই খেয়েছে।
“তা কেনশরণ্যাও তো কত সুন্দর...”

“না, আমি আজ থেকে সুশ্রুত হব। তুমি আমার নাম পালটে দাও।“    

সব্বোনাশ করেছে।
“ওরে ওটা ছেলেদের নাম হয়।  বয়। তুই তো গার্ল।“

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মেনে নিল। গদাম করে পেটে পা তুলে দিয়ে বলল, তাপ্পর বলো।

“হ্যাঁ তো মানিকমামার কাছে যাওয়া যখন হবেই (ভয়ে আর ভাল নাম উচ্চারণ করি না), দুগগামা সবাইকেই নিয়ে চলল।“

“লক্ষী সয়োস্বোতী কাত্তিক গণেশ?

“হ্যাঁ রে সব্বাইকে সবার দাঁত দেখিয়ে আসবে চাই কি নিজেরটাও, আচ্ছা না থাকতো গেছে বুঝলি মানিকমামার চেম্বার হয়ে গেছে তখন ইয়া বড় সাদা কোট পরে ভারভারিক্কি মানিকমামা রুগী দেখছে এরা তো ঢুকে বসেছে আর মঈশাসুর দাঁতের ব্যথায় দুগগামার আঁচল এক হাতে চেপে ধরে মাটিতে গড়াগড়ি পুরো
তখন মানিকমামা বলছে, ওকেই আগে নিয়ে এসো দেখি

দুগগামা তো মঈশাসুরের কান ধরে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে রুগীর চেয়ারে বসিয়ে দিয়েছে মঈশাসুর জল কুলকুচি করেছে মানিকমামার কথামত হাঁ -ও করেছে

এ বাবা!! এর তো আদ্ধেক দাঁত পচে গেছে রে! নিশ্চয় খালি চটচটে চকলেট বুড়ির চুল চিনি এসব খায়!! নাহ, এর তো দাঁত তুলতে হবে, গর্ত ফিলিং করতে হবে অনেক কাজ!’

এই না বলে মানিকমামা যেই না ইঞ্জেকশন দিতে গেছে...”

“ইঞ্জেকশন!!!”

“ওমা নইলে দাঁত তুললে লাগবে না? আগে তো ইঞ্জেকশন  দিয়ে অসাড় করে নিতে হয় যাতে ব্যথা না লাগে

“বেশ হয়েছে! তাপ্পর মাম্মা?   

“তাপ্পর আর বলিস না, যেই না মানিকমামা ইঞ্জেকশন বাগিয়ে এসেছে, মঈশাসুর গাঁক করে চেঁচিয়ে হাত পা ছুঁড়ে লাফিয়ে সোজা পাশের আলমারির মাথায় চড়ে বসেছে! আর সে আলমারি এত উঁচু, কারো হাত যাচ্ছে না

দুগগা মা, মানিকমামা অনেক সেধেছে , খেলনা দেব বলেছে, বই দেব বলেছে, বকেছে, ভয় দেখিয়েছে, কিন্তু সে আর নীচে নামেই না!

তখন মানিক মামা বলল, আচ্ছা থাকুক ও বসে আমি বাকিদের ততক্ষণ দেখে নিই ব্যথা যেই বাড়বে ঠিক নেমে আসবে

লক্ষ্মী তো খুবই লক্ষ্মী, দুবেলা দাঁত মাজে ওর দাঁত দেখে মানিকমামা বলল, ফাস্টো কেলাস সরস্বতীরও দাঁতও খাসা, কিচ্ছুটি নেই এমনকি কাত্তিকেরও দাঁতে গত্ত নেই, খালি একটু প্লেক হয়েছিল সে ঘষে সাফ করে দিতেই হয়ে গেল আর গণশার...” 

“গণশার তো হাতির দাঁত!”
 “হ্যাঁ হ্যাঁ, মানিকমামা বলল একে তো আমি দেখতে পারব না, আমার বন্ধু হাতির ডাক্তার, তার ফোন নাম্বার দিয়ে দিচ্ছি তার চেম্বারে নিয়ে যাবেন একে

তারপরও মঈশাসুর নামে আর না! তখন দুগগা মা খুব খেপে গিয়ে, ত্রিশূলটা নিয়ে দিয়েছে তার পিঠে এক খোঁচা, আর মঈশাসুর যেই আঁতকে উঠে লাফিয়ে পড়েছে অমনি মানিকমামা টপ করে তাকে লুফে নিয়ে চেয়ারে বসিয়ে দিয়েছে আর দুগগামা দশ হাতে তার হাত পা সব চেপে ধরেছে, আর মানিকমামা দিয়েছে পটাং করে ইঞ্জেকশন দিয়ে

মঈশাসুর তখন যা চেঁচান চেঁচালো না! মানিকমামার তো কানে তালা লেগে গেল, আবার বাইরে গিয়ে চাবিওলার থেকে চাবি নিয়ে তালা খুলল তারপর এসে দুটো দাঁত তুলে দিল আর বাকি গত্ত বুঁজিয়ে দিল মঈশাসুরের তো তাপ্পর মুখ ফুলে ঢোল আর কথা বেরোচ্ছে না মুখ দিয়ে বাড়ি এসে দুধে ভিজিয়ে পাউরুটি খেলো আর ঘুমিয়ে কাদা হয়ে গেলো

এরপর আমারও কানে তালা লেগে গেছিল কিন্তু কে চেঁচিয়েছিল সেটা আমায় বলতে বারণ করা হয়েছে তবে চুপি চুপি নাম না করে বলছি, সেও পরদিন ব্রেকফাশে দুধে ডুবিয়ে পাউরুটি খাবে বলেছিল, আর তার একটু পরেই ঘুমিয়ে কাদা হয়ে গেছিল