Showing posts with label home-task. Show all posts
Showing posts with label home-task. Show all posts

Sunday, 16 August 2020

লেখাপড়া

 

কান থেকে পট করে ইয়ারফোন খুলে চলে গেল। তারপর ফোনটাও গেল বেহাত হয়ে। ‘হি হি হি’ করতে করতে একটা ‘মোটেই আর ছোট নয় কিন্তু আসলে এক্কেবারে ছোট্ট ছানা’ মেয়ে ঘর থেকে পালিয়ে গেল।

দুপুরে খেয়েদেয়ে উঠে, নিজের চেয়ারে বাবু হয়ে চড়ে বসে ল্যাপটপে টরেটক্কা করছিলুম। ছুটির দিনেও আপিশের কাজ করানোর জন্য মনে মনে বসকে কী কী সুভাষিতাবলী বর্ষণ করছিলুম সে আর নাহয় না-ই বললুম!

তাহলে কানে ইয়ে এল কোথথেকে? কিছুই না, ব্যাকগ্রাউন্ডে একটু সঙ্গীতচর্চা হচ্ছিল। মন ভালো রাখার চেষ্টা।

কথা হচ্ছে, এমনি করে চুক্কি দিয়ে পালাবে, আর আমি ছেড়ে দেব? ইয়ার্কি পায়া? অতএব ম্যাক্সি গাছকোমর করে (হ্যাঁ, হ্যাঁ, করা যায় কীভাবে যেন। মানে করতে পারি, কিন্তু বলে বোঝাতে পারব না) ধাঁই করে আম্মো দৌড়লুম পুঁচকেপানাটার পিছনে। প্রচুর কসরৎ সহযোগে, এ দরজা দিয়ে ঢুকে ও দরজা দিয়ে বেরিয়ে, এই ধরি এই ধরি এই ফসকে পালাল – এসবের পর ধরে ফেললুম খপ্‌ করে।

প্রচুর কিলবিলিনির পর রফা হল, আমি যদি কাজ ছেড়ে উঠে আসি, তাহলে আমার কাছে বসে এক রাউন্ড পড়া করতে হবে আগে, তারপর মঈশাসুরের গল্প পাওয়া যাবে।

সেইমত বইখাতা নিয়ে ঘটা করে বসা হল খাটে।

নামতার আমতা-আমতা পেরিয়ে, দাঁত খিঁচোনোর পালা শেষ করে (আজ্ঞে না। মোটেই বকাবকি করিনি। সায়েন্সে ‘দাঁত’ চ্যাপ্টার পড়ছিল, তাই বার বার আমায় হাঁ করিয়ে কোনটা মোলার, কোনটা প্রিমোলার এসবের প্র্যাকটিকাল ক্লাস করছিল।), হিন্দির বিপরীতার্থক শব্দে হাবুডুবু খেয়ে (গুগল না থাকলে কী যে করতুম আমার অনন্যসাধারণ হিন্দিজ্ঞান নিয়ে!) অবশেষে টেন্সড হওয়া গেল।

মানে ইংলিশ বই খুলে টেন্স পড়া শুরু হল আর কী!

সে এক ভয়ানক জগঝম্প ব্যাপার, যারা জানে না তাদের আগেই বলে রাখি। পাস্ট প্রেজেন্ট ফিউচার, আবার তাদের প্রত্যেকের কন্টিনিউয়াস আলাদা করে। বোঝাচ্ছি, উদাহরণ দিচ্ছি, পড়া ধরছি, তারপর গুলিয়ে ফেলেছে দেখে আবার শুরু থেকে শুরু করছি। লুপে চলল এই খানিকক্ষণ। আমার মাথায় এদিকে ‘সবই মায়া, কী বা সময়, কী বা আজ আর কী বা কাল, কাকে বলে অতীত আর কাকেই বা বলে ভবিষ্যৎ, কারণ, ওই, সবই মায়া...” ইত্যাদি বেজে চলেছে। ফলে এবার নিজেও মাঝে মধ্যে গুলিয়ে ফেলার উপক্রম করছি।

অগত্যা স্ট্র্যাটেজি পালটানো হল।

একটাই বাক্য ধরে তাকে একবার পাস্টে ফেলা হবে, একবার ফিউচারে, তারপর সেগুলোকে কন্টিনিউয়াস করে ফেলা হবে। ইট’স আ গেম, য়্যু নো!

গেমটা কিন্তু হেব্বি জমে গেছিল!

“আই ঈট পাস্তা।”

“আই এট পাস্তা।”

“আই শ্যাল ইট পাস্তা টুমরো এগেইন!”

“এই না মোটেই রোজ রোজ পাস্তা বানিয়ে দেব না আমি! এটা বল - দে গো টু স্কুল।”

“দে ওয়েন্ট টু স্কুল। কিন্তু সে তো বাজে কথা, মোটেই যায়নি, কাল তো স্কুল ছুটি ছিল!”

“আহা পাস্ট মানে গতকালই হতে হবে কে বলেছে! গত সপ্তাহে গেছিল, গত বছর গেছিল…”

এইভাবে দিব্য চলছিল। গোল করলুম একটু আরো মনোহর করতে ডাইনোসর এনে।

“বল দিকি - টেরোডাকটিলস কুড ফ্লাই।”

ব্যস, মেয়ে আর কিছুতেই তার প্রেজেন্ট বা ফিউচার করবে না! কারণ ডাইনোসর তো কবেই উল্কা পড়ে মরে গেছে, বললেই হল তাদের প্রেজেন্ট আর ফিউচার!

আমার তুম্বোমুখ দেখে তার কী মনে হল কে জানে, ফিক্‌ করে হেসে বলল, “অনেকক্ষণ আমি করেছি, এবার তুমি করো দেখি!”

দিবি? তা দে! আমি কি ডরাই সখি… ইত্যাদি প্রভৃতি…

“এমন একটা দেব না… সেটার পাস্ট, প্রেজেন্ট, প্রেজেন্ট কন্টিনিউয়াস, ফিউচার সব হয়। সঅঅঅব”

আচ্ছা! মানে সূর্যদিকে পুবদিকে ওঠে টাইপের কিছু একটা বলবে আর কী! তা বল!

মেয়ে দেখি ফিক ফিক করে ফিচেল হাসে খালি।

তারপর দিল এই মোক্ষম একখানা সেন্টেন্স।

“তিতির ঈটস মাম্মা’স হেড!”

বইপত্তর গুছিয়ে তুলে তৎক্ষণাৎ ছুটি দিয়ে দিলুম, মশাই!

 

Sunday, 12 July 2020

চিঠিচাপাটি

আচ্ছা, আপনারা চিঠি লেখেন? হাতে, পেন বা পেন্সিল দিয়ে, কাগজটাগজে?

না মনে হয়। আমরা কিন্তু লিখি। আমরা মানে আমি আর তিতির। কুট্টি কুট্টি কাগজে, বিলের উলটোবাগে, আমাজনের মোড়ক-ছেঁড়া পিজবোর্ডে, এরকম যাতে হোক অহর্নিশ আমাদের চিঠি লেখালেখি হয়।

উঁহু। পেরাইভেট ব্যাপার বাপু। অমন "দ্যাঁকাও দ্যাঁকাও! বলো বলো!" করে ঝুলে পড়লেই তো আর হল না! বরং চিঠি লেখার টেকনিকটা শেখো।

বার আগে জানতে হবে, উদ্দেশ্যটা কী। মানে এমনি এমনি, নাকি কিছু একটা বায়না সুপ্ত রয়েছে অক্ষরমালার পরপারে, নাকি আড়ির পালা চলছে তাই মানভঞ্জনপ্রক্রিয়া। 

আজ্ঞে। আমরা দুজন, তিতিরের ভাষায়, যাকে বলে পরস্পরের "বেস্ট ফ্রেন্ড"। বললে পেত্যয় যাবেন না তিনি ইদানীং আমায় "ব্রো" বলে সম্বোধন করছেন, কারণ বেস্ট ফ্রেন্ডদের নাকি সেরকম সম্বোধন করাই দস্তুর। ব্যাপারটা পি জে মাস্ক না ইউনিকর্ণ কাদের থেকে শেখা হয়েছে জানি না, কিন্তু তার ফলে আমায় লাগাতার কম"ব্রো"মাইজ করে যেতে হচ্ছে। 

তো, যা বলছিলুম। বেস্ট ফ্রেন্ডরা যেমন গলাগলি করে গল্প করে, চুপি চুপি সব সিক্রেট শেয়ার করে এবং নিয়মিত ব্যবধানে ঝগড়াঝাঁটি করে কথা বন্ধ করে দেয় - আমরাও করি। হ্যাঁ ভাই, জানি আমি বুড়োধাড়ি মাম্মা, তা বলে বুড়িয়ে যেতেই হবে এটা কে বলেছে! কাজেই আমাদের মাঝেমধ্যেই মিনিট দশ বারোর মুখ দেখাদেখি বন্ধ চলে। খানিক খ্যাঁচাখেঁচির পর সাধারণত তিনি দুম দুম করে বগলে পুতুল নিয়ে রাগের চোটে আমার চটি পরেই পাশের  ঘরে চলে যান, আর আমি সাড়ে চারবার ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে নাক টেনে নিজের কাজে মন দিই।  

তারপর হয়তো মন দিয়ে নাক বেয়ে ঝাঁপ দেওয়া চশমা সামলাতে সামলাতে কম্পিতে কাজ করছি, হঠাৎ একটা ভাঁজ করা কাগজ উড়ে এসে কীবোর্ডের উপর পড়ে। ভাঁজ খুলেই দেখা যায় ভাব করার শর্ত এসে গেছে। সাধারণত এক্স সংখ্যক আদর ও হামিতেই ব্যাপার মিটে যায়। তেমন তেমন কেস হলে ললিপপের বা আইসক্রিমের ছবি থাকে। 

আবার কখনো হয়তো এমনি এমনি চিঠি আসে। বি উলটোলে ডি হয়, কিংবা জানলায় একটা কাক বসেছে, এ ধরণের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খবরও পেয়েছি চিঠি মারফত। আমি নিজেও যে ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ খবর-টবর দিইনি তা নয়। এই চিঠি লেখা নিয়ে  বিভ্রাটও যে হয়নি এক আধবার তাও নয়। যেমন ধরুন, এটা বছরখানেক আগের কথা হবে, অসন্দিগ্ধ মা চিঠি খুলে "আই অ্যাম রেস্টিং ইন পিস" পড়ে বিষম টিষম খেয়ে ছুটে গিয়ে আবিষ্কার করেছিল ওটা পিছনে দুটো বালিশ দিয়ে আধশোয়া হয়ে ঠ্যাঙের উপর ঠ্যাঙ তুলে বসে পা নাচাতে নাচাতে "ক্যালভিন অ্যান্ড হবস" পড়ার অবিমিশ্র আনন্দদশার তৈত্তিরীয় ইঞ্জিরি। অথবা, অনেক পাঁয়তারা মেরে চিঠি ভাঁজ করে রকেট বানিয়ে, খাটে বসে থাকা কন্যাকে দরজার আড়াল থেকে ছুঁড়ে সারপ্রাইজ ডেলিভারি করতে গিয়ে সেটা জানলা গলে ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে যাবার পর মায়ের খেয়াল হয় যে ওই কাগজটার উল্টোপিঠে সদ্য আধ ঘন্টা আগেই রান্নাঘর তদারক করে তিনি মুদির ফর্দটি বানিয়েছিলেন।

কিন্তু কখনো কখনো এরকম পত্রালাপ ভারি বিমূঢ় করে দেয়, জানেন।

এই লকডাউন টাইন নেই যখন, তখনকার কথা এটা অবশ্য। নতুন বাসায় নতুনভাবে সব গুছিয়ে নিচ্ছি তখন। মেয়ের নতুন বড় সাইজের সাইকেল কিনে এনেছি গত সপ্তাহে, আবার গতকালই এসে গেছে তার নতুন পড়ার টেবিল চেয়ার - মায়ের সেটটার হুবহু কপি, খালি রং আলাদা। অফিসফেরত দেখি মেয়ে সেই সাইকেলে হু হু পাক খাচ্ছে বিকেলে, সেই চেয়ার টেবিলে বসে মন দিয়ে ছবি আঁকছে, হোমটাস্ক করছে - আর মনটা ফুরফুরে হয়ে যায়। তো সেদিন রাতে ঘরের আলো নিভে যাওয়ার পর, শুয়ে পড়ার পর, টের পেলুম ছোট্টটা খুব কসরৎ করে ঘুমন্ত আমার বালিশের নিচে কীসব যেন ঢোকাল। পোড় খাওয়া মা হলে যা হয়, টের পেলেও, টের পেতে দিইনি যে জেগে আছি।

পরদিন তিনি ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথম কথা, "মাম্মা, তোমার বালিশটা উলটে দ্যাখো।"

আমি অবাক হওয়ার ভান করে বালিশ তুলে দেখি একটা ট্যারাব্যাঁকা ছেঁড়া কাগজ, তাতে লেখা "love and kiss", আর কাল বাড়ি থেকে কাজ করার অনুরোধ, আর একটা ১০ টাকার কয়েন। 

বাকি দুটো তো বুঝলুম। কয়েনটা কেন?

জিজ্ঞাসা করে জানলুম, এই নতুন সাইকেল ও পড়ার টেবিল কিনে দিতে আমার প্রচুর টাকা খরচ হয়ে গেছে নিশ্চয়, তিনি তাই তাঁর পিগিব্যাঙ্ক থেকে বার করে এনে দিয়েছেন...লাগলে আরো দেবেন, আমি যেন একটুও চিন্তা না করি, "আরো আছে মা!"

হাসব না কাঁদব বুঝতে পারিনি জানেন। গলাটা খুব ব্যথা করেছিল খালি। বলা বাহুল্য, ও কয়েন আমার আলমারির লকারে ভেলভেটের বাক্সে তোলা আছে।

Saturday, 24 August 2019

দ্রিঘাংচু

 
যেই একটু নিজের কাজে বসব, অমনি অবধারিতভাবে ছোট মানুষটির আগমন ঘটবে। হুস করে ঢুকে হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে হুস্‌-তর গতিতে বেরিয়ে যেতে যেতে বলে গেল,
“মাঁ! গণেশটা কী সুন্দর এঁকেছি না? পরশুরামও আছে।“
সে তো দিব্যি নাচতে নাচতে পালাল, আমি এদিকে কাগজটার এপিঠ ওপিঠ আগাপাস্তলা খুঁজে ট্যান খেয়ে বসে রইলুম। ওপিঠে কিস্যু নেই, এপিঠে দিব্যি নধর গণুবাবা আছেন, তাঁর মাথায় মুকুট, হাতে কুঠার, সামনে লাড্ডুর থালা, পায়ের কাছে পুঁচকে ও মিচকে ইঁদুর সব আছে, কিন্তু সেই ক্রোধী মুনিটি কই? তাঁর জটার একগাছা চুলও তো দেখতে পাচ্ছি না!
ইতিমধ্যে লাট্টুর মত পাক খেতে খেতে তিতির পুনঃপ্রবেশ করেছে।
“অমন ঘুরপাক খাচ্ছিস কেন, পড়ে যাবি যে!”
“আমি এখন আথ্‌! আথ্‌ এমনি করে চলে।”
বড়ই ভাবনার বিষয়। খাটের পাশের অপ্রশস্ত জায়গায় আহ্নিক গতি হতে থাকলে আমি যাই কোথায়!
আমার চিন্তা টের পেয়েই হয়তো তিতির আশ্বস্ত করল,
“তোমায় একটা কথা বলতে এলুম খালি!”
ভনিতা করছে মানেই গড়বড়, কিছু উৎপটাং বায়না আসছে মনে হয়। তড়িঘড়ি কথা ঘোরাই,
“হ্যাঁ রে, তোর পরশুরাম কই?”
সলজ্জ হাসি সহযোগে উত্তর এল, “ওটাই তো বলতে এলুম! ভুল বলেছি, পরশুরাম নয়, পরশু। গণেশের হাতে আছে।"
বেচারি! প্রবাসে বড় হয়েও বাংলা শব্দভাণ্ডার তার এত বড়সড়, গুলিয়ে গেলে কী আর করা! বাংলা, ইংলিশ, হিন্দি এবং মারাঠী নিয়ে জাগলারি করতে হলে অমন একটু আধটু হতেই পারে। নাহয় এখনো ‘ফেব্রিক কালার’কে সমানে ‘ফাইব্রাস কালার’ বলে যাচ্ছে, এই কিছুকাল আগেই আমাদের সে খাবার ‘সার্ভাইভ’ করে দিতে চেয়েছিল – তাই বলে পরশুকে পরশুরাম বলে ফেলেছে বলে হাসব নাকি! শব্দটা জানে এই না কত!
এইসব বিবেচনা করে খুব গম্ভীর থাকার চেষ্টা করছিলুম, হাসিটাকে গালভরা পানের মত একবার এদিক একবার ওদিক করছি, হঠাৎ খেয়াল হল হোমটাস্ক বাকি আছে।
কম্পি টম্পি ফেলে হাঁক পাড়লুম, “ওরে ল্যাবেঞ্চুশ, বলি সারাক্ষণ ছবি আঁকলে আর নেত্য করে বেড়ালেই চলবে? শিগগির বইখাতা নিয়ে আয়!”
গতিজাড্য খুব খারাপ জিনিস বুঝলেন? ওতে গালে হামি পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু কচি মাথার গুঁতোয় চশমাও নাক থেকে খসে পড়ে যায়।
যাইহোক। পনেরো মিনিট পরের দৃশ্য।
খাটে বইখাতা ছড়ানো। মেয়ে ছোট টেবিল পেতে লিখছে। মা অতি বিপন্ন ভাবে নেট হাতড়াচ্ছে।
মায়ের হিন্দির যা অপূর্ব দক্ষতা, নেট না হাতড়ে উপায়ও নেই। দিম্মা থাকলে তিনিই করান এই সাবজেক্টটি, তিনি একদা স্কুলে হিন্দি পড়েছেন, কর্মসূত্রে বলেওছেন বহুবার, মায়ের চেয়ে অন্তত ভালো জানেন। দাদুমণির হিন্দি শোনার অযোগ্য ভয়াবহ, অতএব মায়ের আপাতত গুগলঠাকুর ভরসা।
ক, কা, কি... ইত্যাদি দিয়ে শব্দগঠন ছিল। দিব্যি চলছিল, ঠেকে গেল ‘ঃ’তে এসে।
তিতির যেই না নাকের ডগায় চশমা ঠেলে প্রবল সিরিয়াস মুখে বলেছে, “কঃ!” অমনি আমার ‘দ্রিঘাংচু' মনে পড়ে গেছে! তারপর না হেসে পারা যায়? হাসামাত্র ওদিক থেকে কৈফিয়ত তলব, “হাসছ কেন, হাসছ কেন?” তখন ছোট্টটাকে বলতেও হয় গল্পটার কথা, তারপর দুজনে মিলে জাপটাজাপটি করে হেসে কুটিপাটি হতেও হয়, তারপর রাত্রে আসল গল্পটা পড়ে শোনাব কথাও দিতে হয়,  তারপর দেখা যায় সর্বনাশ সমুৎপন্ন হইয়াছে।
কঃ দিয়ে আমি কোনো শব্দ জানি না। কোনোই না।
এদিকে তিতির ‘আমার মা সব জানে’ গোছের মুখ করে চেয়ে আছে।
কী আর করি, লেখার সময় শব্দ ভেবে না পেলে যা করি, তাই সাজেস্ট করলুম।
“চ, বার বার বলে দেখি, ঠিক মাথায় কিছু না কিছু এসে যাবে।“
আরো মিনিট দশ পরের দৃশ্য। মা আর মেয়ে মুখোমুখি বসে “কঃ?” “কঃ!” করে যাচ্ছে, করেই যাচ্ছে, দাদুমণি আর আন্টি উঁকি মেরে দেখে পালিয়েছে। এমন সময়ে ডাকাডাকিতে আকৃষ্ট হয়ে নাটকের পরবর্তী কুশীলব জানলায় এসে বসল, তারপর সেও আমাদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ‘ক্কঃ!’ ‘ক্যাঁঃ’ করতে লেগে গেল।
কে জানে সেটা কাক না দ্রিঘাংচু!

Saturday, 23 December 2017

অঙ্ক


"এই দ্যাখ, সীমগুলো বড় বড় তো, তাই প্রতিটা সীম পাঁচ টুকরো করলুম, বুঝলি! আমার কাছে ১১ টা সীম ছিল, তা সব পাঁচ পাঁচ করে কেটে দেখি দুটো টুকরো দাগ ধরা, ফেলে দিলুম। বল তো কটা রইলো?"

দিম্মার রান্নাঘরে সীম ছেঁচকি রান্না হচ্ছে। আমি ঘরে বিছানা তুলতে তুলতে উৎকর্ণ হই। জানি মহিলা প্রেসিডেন্সির স্ট্যাটিসটিক্স, তারপর আই এস আই এর এম টেক। এও জানি যাঁর সঙ্গে ঘর করেছেন জীবনভর, মানে আমার পিতৃদেবও তাই। তাই বলে, তাই বলে এইভাবে গুনেগেঁথে সীম ছেঁচকি রাঁধবেন? ইয়ের একটা সীমা পরিসীমা থাকে!

"ফাইব থী ফিফটি থী।"

রিনরিনে গলায় উত্তর আসে। টুক করে মুণ্ডু বাড়িয়ে দেখে নিই, মেয়ের হাতে খাতা পেন্সিল নেই বটে। , মানসাঙ্কের ক্লাস চলছে দিম্মার রান্নাঘরে।

"এইবার, খেতে বসে না তিতিরের মাম্মা বলেছে তার পঁচিশ টুকরো সীম চাই, চাই তো চাই, চ্চাঁই চ্চাঁই চ্চাঁই!"

হেব্বি রাগ হয়। আমি খেকো বলে এমন কথা আমার নামে? রাগের চোটে চেয়ারটাকেও ঝপাং ঝপাং করে ঝাঁটার বাড়ি দিয়ে দিই দু’ঘা।

"তো, মাকে পঁচিশটা দেবার পর যা রইল, সেটা তিতির আর দিম্মা হাফ হাফ খেল। বল তো দিম্মা টুকরো নিল?"

রাগটা কেমন গরম হাওয়ায় আইসক্রীমের মত গলে গলে যায়। মনে পড়ে জীবনে কোনদিন অঙ্কে ভয় যে কী বস্তু বুঝতে পারিনি। কোনদিন না। ইতিহাস পড়তে গিয়ে সাল তারিখ নিয়ে ক্লান্ত হয়েছি, কেমিস্ট্রি চিরকাল বোরিং ব্যাপার মনে হয়েছে, ভূগোল ক্লাসে কখনো কখনো হাই উঠেছে। কিন্তু এই "অঙ্ক! ওরে বাবা!" ব্যাপারটা কিছুতেই ধারণায় আনতে পারিনি।

আজকাল আস্তে আস্তে বুঝতে পারছি, কেন।

ওদিকে তিতির প্রবল ভ্রূ কুঁচকে কড় গুনছে। পড়ে ক্লাস ওয়ানে। আজকালকার সিলেবাস অনুযায়ী তারা এখনো দুটো সংখ্যা যোগ বিয়োগের ওপরে ওঠেনি। তবে সে তো স্কুলের খাতার পাতায়!

"ফোট্টিন!"

এবার আমারও যোগদান করার বাসনা হয়। ততক্ষণে বিছানা সেরে ঝাড়ন ধরেছি। টিভি স্ট্যাণ্ডের ধুলো মুছতে মুছতে বলি, "এই আমাকেও একটা অঙ্ক বানিয়ে দে।"

প্রচুর হি-হি-খিলখিল হচ্ছে শুনতে পাই। মাকে অঙ্ক বানিয়ে দিতে দিম্মা নির্ঘাৎ 'হেল্প' করছে।

"ওই ক্যালেন্ডারের দাদুটার না...২৩৭ টা দাড়ি আছে।"

দেওয়ালে গত বছর পিকনিকে সুকুমার রায় ক্লাবের দেওয়া ক্যালেন্ডার। তাতে সেই ---- এর 'উদো' ছবি, পা অবধি লুটোনো দাড়ি সহ। হাসব না ভেবে গম্ভীর থাকা খুব কঠিন। খুব।

"তার মধ্যে ১৭ টা দাড়িতে উকুন হয়েছে এঁ হেঁ হে হে হে হে..."

অঙ্ক টীচার নিজেই হেসে গড়াগড়ি তো আমিই বা বাদ যাই কেন!

"প্রতি দাড়িতে তিনটে করে উকুনের ডিম থাকলে বলো তো টোটাল কটা ডিম আছে? আর কটা দাড়ি ভালো আছে?"

যত্তসব ইয়ের দল! আমার বেলায় কেমন ছিরির অঙ্ক দেখুন। আমার তো আবার শোনামাত্র মানসচক্ষে দেখে ফেলা স্বভাব, চোখের সামনে উদোর টেকো মুণ্ড দেখতে পাই, খ্যাঁচ খ্যাঁচ করে দাড়ি চুলকোনো দেখতে পাই, এমনকী তারপর জুম করে উকুনদের ছুটোছুটি অবধি দেখতে পেয়ে যাই। 

তারপরই খটকা লাগে।

"এই, প্রতি দাড়ি মানে কী? উকুনরা কি শুধু সেই ১৭ টা দাড়ি, মানে যেখানে তারা বসবাস করে সেখানে ডিম পেড়েছে? নাকি সেগুলো বাদ দিয়ে বাকিগুলোয়? নাকি সবকটা দাড়িতেই?"

এত বেমক্কা জটিলতা তিতির ভাবেনি। ব্যাক টু প্যাভিলিয়ন হয়ে যায় কাঁচুমাচু মুখে। কিন্তু তা বললে তো হবে না, আমি বলে আই টির লোক, স্পেসিফিকেশন একদম কিলিয়ার না হলে তো কোডে হাত লাগাব না মশাই!

তিতির দিম্মার সঙ্গে কন্সাল্ট করে এসে বলে, না শুধু ওই ১৭ টাতেই ডিম পেড়েছে।

কিন্তু ততক্ষণে আমার জ্ঞানস্পৃহা চাগিয়ে উঠেছে। দাড়িতে কি আদৌ উকুন হয়? হওয়া সম্ভব? এটা আমার নিজের পক্ষে জানা অসম্ভব কারণ আমার তো কস্মিনকালেও দাড়ি ছিল না! এমনকী আমার পিতৃদেবেরও ছিল না। ইন ফ্যাক্ট চেনা পরিচিত একজনকেও মনে পড়ে না যার আছে। তাহলে কোন দাড়িয়ালকে ধরে জিগাই?

অবশ্য পরশুরামের গল্পে, দুর্বাসার দাড়িতে উকুন ছিল বটে। তাহলে পসিবল, হাইলি পসিবল।

এসব গবেষণা করতে করতে ঝাড়াঝুড়ি শেষ করছি, তিতির শুনি রিপোর্ট করছে, মা না অঙ্ক পারে না! দ্যাখো এখনো বলতে পারছে না!

রেগেমেগে গোঁ গোঁ করে উত্তর দিয়ে দিই। দিয়ে ঝাড়ন রেখে পাজামা ছেড়ে পাৎলুন গলাই, ভারী গলায় বলি, “দাও দাও থলি দাও দিকিমাছ ফুরিয়ে যাবার আগে বাজারটা সেরে আসি!”

কি করে টের পায় বলুন তো গোঁসা করেছি? অমনি ছুট্টে এসে হাঁচড় পাঁচড় করে কোল বেয়ে উঠে গালে কপালে হামি দেয় আর বলে এই দুটো হামি দিলুম ( বলে তিনটে দেয় ), এই আরো তিনটে হামি দিলুম ( বলে পাঁচটা দেয় ), বলো তো তিতির মাম্মাকে টোটাল কটা হামি দিল?

আর আমি হামি মাখামাখি মুখে বেভুল হাসি হাসতেই থাকি, কিচ্ছু উত্তর মাথায় আসে না…

নাঃ, ঠিকই বলেছে মেয়েটা, মা একদম অঙ্ক পারে না!