Saturday, 8 July 2017

আদালত


 চুপ! আদালতের অধিবেশন চলিতেছে।

সাধারণতঃ, গৃহে উচ্চ আদালতের অধিবেশন চলে। তাহার রাশভারী বিচারকটি অঞ্চল কটিদেশে নিবদ্ধ করিয়া, পদ-আন্দোলন করিতে করিতে সওয়াল জবাব শোনেন এবং জলদগম্ভীর কণ্ঠে রায় প্রদান করেন। উচ্চ আদালত হইলেও ইহাতে উকিল প্রজাতির প্রবেশ নিষেধ। ফরিয়াদী আসামী স্ব স্ব মহিমায় শৃঙ্গ আস্ফালন করিয়া থাকে। গৃহের অবশিষ্ট সদস্যটি অতএব একাধারে ব্যজনকারিণী, তাম্বুল-করঙ্কবাহিনী, ভাষ্যে নীরাবলেপনকারিণী...অর্থাৎ মস্তকোপরি পাখাটি চালাইয়া দেওয়া, বিচারকের নিমিত্ত চা প্রস্তুত করিয়া আনা, কাহিনীতে কিঞ্চিৎ জল মিশাইয়া লঘুতর করিবার প্রয়াস করা, এইসব করিয়া থাকেন।

আসামীর পরিচয় আশা করি বলিতে হইবে না। 'ন্যাড়া'তুল্য এই চিরন্তন সরলহৃদয়াটিকে আসামী সাজাইয়া উপস্থিত করিবার নিয়ত ষড়যন্ত্র হইয়া থাকে। অসংখ্য বার তাহার সাতদিনের জেল তিনদিনের ফাঁসিও ধার্য হইয়াছে, কারণ ফরিয়াদীটি ক্ষুদ্র, চীৎকারপটু   গ্লিসারিন ব্যতীতই মুহূর্তমধ্যে অশ্রুপ্লাবিত হইতে সক্ষম।

কিন্তু আজ পরিস্থিতি ভিন্নতর।

আজ স্বয়ং সেই উচ্চ আদালতের বিচারক মহাশয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ আসিয়াছে।

অতএব আদালতে ছন্দপতন, আসামী সাজিতে অভ্যস্ত বীরাঙ্গনা আজ বিচারকের উচ্চাসনে। তিনি পূর্বাপর কিছুই জ্ঞাত নহেন, নিরিবিলি গৃহকোণে বসিয়া অতীব মনোযোগ সহকারে একটি ভৌতিক কাহিনী রচনা করিতেছিলেন, সহসা গুরু দায়িত্ব অর্পিত হইবার ফলে নিতান্ত বিচলিত বোধ করিতেছেন।

তাহার সম্মুখে ফরিয়াদী, আজ্ঞে হ্যাঁ, তিনি যথাপূর্বং তথা পরং, এক পদ সোফাপৃষ্ঠে অপর পদ সোফাসীনা বিচারকের উদরপার্শ্বে রক্ষিত করিয়া প্রবল উত্তেজনা প্রবলতর হস্তক্ষেপণ সহযোগে বক্তব্য পেশ করিতেছেন। অতিরিক্ত উত্তেজনাহেতু শব্দগুলি অতিদ্রুত উচ্চারিত হওয়ায় প্রতিটি বাক্যে শব্দ হইতে "ইঁ ইঁ ইঁ" ধরণের নাসিকানির্ঘোষের যৎপরোনাস্তি আধিক্য ঘটিবার ফলে বিচারকের কিছুমাত্র বোধগম্য হইতেছে না।

প্রাক্তন উচ্চ বিচারাধিপতি, অকস্মাৎ আসামীত্ব লাভ করিয়া ইহাদের সম্মুখে বিব্রত আননে কর্ণ কন্ডূয়ন করিতে করিতে দন্ডায়মান। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করিয়া চতুর্থ জন পাকশালে আত্মগোপন করিয়াছে, না ডাকিলে তাঁহার শিখা-স্থানাধিকারী বর্তুলাকার কবরীভারের দর্শনও পাওয়া যাইবে না।

বিচারক দুই চঞ্চল পদযুগলের নৈকট্যহেতু স্বীয় দৃষ্টিসহায়ক, নাসিকা সংবেদনশীল উদরপ্রদেশ বাঁচাইতে বাঁচাইতে বারংবার প্রচেষ্টায় কন্যার ক্রোধ কিয়ৎ পরিমাণ প্রশমিত করিতে সক্ষম হইলেন। ইহার পর কথোপকথন নিম্নরূপ -

আসামী : তিতির, হোমটাস্ক শেষ করে নিই চলো।

ফরিয়াদী: ইঁ ইঁ ইঁ...দ্যাঁকো না মাম্মা...ইঁইই!

বিচারক : কি হচ্ছে কেউ একটু আমায় বুঝিয়ে বলবে!

ফরিয়াদী : দ্যাঁকো না দিম্মাঁ কি করেছে!

বিচারক : আহা কি করেছে সেটাই তো জানতে চাইছি!

আসামী : আরে সেটা তো আমিও জানতে চাইছি! কি যে হোলো হঠাৎ করে!

ফরিয়াদী : (সপ্তম সুরে) দিম্মা বলেছে! জানো! একটা ছোট মেয়ে আমি, তাকে দিম্মা বলেছে!

আসামী : কি বলেছি আবার! পড়তে বসে রবার ছুঁড়ে ছুঁড়ে খেলছিলি, তাতে 'ছেলেখেলা করছিস কেন' বলে বকেছি, তাই?

( নেপথ্যে অন্তরালবর্তিনীর হাস্যদমনের প্রয়াস শ্রুত হয়।)

বিচারক : বকেছে বলে নালিশ করছিস, তিতির? তা হোমটাস্ক ফেলে অমন করলে তো বকতেই হবে।

ফরিয়াদী : (ঢক ঢক করে মাথা নেড়ে) না!! তার জন্য নয়! বল্লুম না দিম্মা এমনি বলেছে!

আসামী : (প্রবল বিস্ময়ে) আর তো কিছু বলিনি!

বিচারক : ( ততোধিক বিস্ময়ে) আরে কি বলেছে সেটাই তো বলছিস না! কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।

ফরিয়াদী : বল্লুম তো! ছোট মেয়ে একটা, তাকে কিনা এমন বলেছে! ইঁ ইঁ ইঁ!

বিচারক  : (যানে ভি দো ইয়ারোর ধৃতরাষ্ট্রের মত) এসব কি হচ্ছেটা কি! কিচ্ছু বুঝছি না!

পুনর্বার ফরিয়াদীর বাক্যে শব্দাপেক্ষা অনুনাসিক অব্যয়ের আধিক্য। পুনর্বার বিচারক আসামী কর্তৃক তাহাকে সান্ত্বনা প্রদান, ক্ষোভের নিমিত্ত অনুসন্ধান পুনর্বার অপারগ হইয়া পূর্বাপেক্ষা অধিকতর হতভম্বত্ব লাভ।

এইরূপ চক্রাকারে অভিনয় যখন তৃতীয়বার হইতেছে, তখন বিচারকের মস্তিষ্কে বিদ্যুৎ-আলোকের ন্যায় সত্য উন্মোচিত হইল। তিনি আসামীকে দ্রুত-হ্রস্ব কণ্ঠে তাঁহার কর্তব্য বুঝাইয়া দিলেন।
অতঃপর, আসামী তাঁহার ভ্রম সংশোধন করিয়া যথানির্দেশিত ভর্ৎসনা-বাক্য প্রয়োগ করিলেন। পরম পরিতুষ্ট হইয়া, ক্রীড়া স্থগিত রাখিয়া তিতিরপক্ষী অঙ্কে মনোনিবেশ করিল।

-------

সত্যি তো, এইটুকু একটা ছোট মেয়ে খেলছে, তাকে কিনা 'ছেলেখেলা' বলা - একটা আক্কেল নেই! তিতির কি বয়? 'মেয়েখেলা' বলতে হয়, জানো না?


Sunday, 2 July 2017

কাক

ঘরের আলো নিভিয়ে  বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে মনোযোগ দিয়ে ফোনের নোটে গ্রসারির হিসেব কষছিলুম। একাগ্রতার ভুষ্টিনাশ করে দিয়ে তিতিরপাখির প্রবেশ।

"মা আ আ আ আ! জানো আণ্টির কি হয়েছে?"

গ্রাসাচ্ছদনের জন্য গ্রসারির হিসেব জরুরি। কিন্তু এরকম প্রশ্নে গ্রসারির গ্রাস থেকে বেরোতেই হয়। তিতিরের এখনকার আন্টি বড়ই মিতভাষিণী। তাঁর কিছু হয়ে থাকলে আমি টের পাব না এটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। তিতির যে পরিমাণ উত্তেজিত, তাতে নেহাতই এলেবেলে কিছু হয়েছে বলে তো মনে হয়না।

"কী হয়েছে রে?"

"আন্টি না, কাল রাত্তিরে ঘুমোচ্ছিল। ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোচ্ছিল।"

সেটা আশ্চর্য কিছু না। ঘুমিয়েই থাকে। রাত্তিরে তো বটেই, দিনেও।

"আর একটা কাকও ঘুমোচ্ছিল।"

হিসেবের নিকেশ হয়ে গেল। আরেকটা গল্প আসছে মনে হচ্ছে।

"সব কাকই তো রাত্তিরে ঘুমোয় মা।"

"এই কাকটা আণ্টির ঘরের জানলায় ঘুমোচ্ছিল। খুব ঘুমোচ্ছিল।"

"আর নাক ডাকাচ্ছিল কি?"
গল্প বানানোয় আমার সাহায্য প্রদান।

"আরে না দ্যুৎ! কাক নাক ডাকায় নাকি!"
তিতির হেসে কুটিপাটি হয়ে যায়।

"আচ্ছা আচ্ছা, তারপর কী হল?"

"তারপর না, কাকটা ঘুমোতে ঘুমোতে ঘরের মধ্যে দ্দুম করে পড়ে গেল।"

"অ্যাঁ!!!"

"হ্যাঁ গো, জানলার রডে বসে ঘুমোচ্ছিল তো, পা পিছলে গেছে মনে হয় আর ঘরের মধ্যে এসে পড়ে গেছে।"

জন্মে এমন ন্যালাক্যাবলা কাকের কথা শুনিনি যে পা পিছলে পড়ে যায়। কিন্তু কটা কাকই বা আর এসে আমায় তার জীবনচরিত শুনিয়েছে! হয়তো তিতির সত্যি কথাই বলছে, হয়তো পদস্খলন ওদের জীবনেরও অঙ্গ।

"তারপর?"

"তারপর অমন আওয়াজ, আর কাকটা ঝটপট করছে, আণ্টি তো ভয়ে ধড়মড় করে উঠে বসেছে। আর আলো জ্বেলে দেখে ঘরে কাক পড়েছে।"

ডাকাত পড়ার সমান না হোক, ঘরে কাক পড়াটাও বেশ ভয়ানক ব্যাপার, সন্দেহ নেই। বিশেষ করে রাতের ঘুম ভেঙে।

"তারপর? বলবি তো পুরোটা!"

"তারপর কাকটা জানলা দিয়ে বেরিয়ে গেল আর আন্টি যেই না দরজা খুলে বেরোবে অমনি মুখের ওপর এসে পড়েছে।"

"অ্যাঁঃ! আবার কাক?"
ভীষণ উত্তেজিত হয়ে যাই। নবনীতা দেবসেন বারংবার চামচিকে কুড়িয়ে পেতেন জানি, তাঁর চলাচলের পথে তারা এসে ল্যান্ড করত। তাই বলে তিতিরের আন্টির ঘরে যত্রতত্র কাক পড়বে!

'আরে না, আমার মাছ-বেলুনটা। উড়ে এসে আন্টির মুখের ওপর, আর আন্টি না ভয় পেয়ে আঁই আঁই আঁই করে...হি হি হি"

অ। মাছ শেপের একটা বড় বেলুন কিনে দিয়েছি  কন্যাকে, সেটা যখন তখন পাখার হাওয়ায় উড়ে আলমারির মাথা থেকে পড়ে যাচ্ছে বটে।

"আরো কী হয়েছে জানো?"

আবার কি! এবার কি বাথরুমে মহিলার মাথায় টিকটিকি পড়ল?

"আরে আন্টি ফিরে এসে ঘরে ঢুকে আলো নিভিয়েছে, আর আবার বেলুনটা উড়ে এসে মুখের ওপর আর আন্টি আবার আঁই আঁই আঁই আঁই...."

এবার বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। মেয়ের মুখে যা হাসিটা দেখছি, এবার চুপ না করালে সারারাত ধরে আন্টির ঘরে কিছু না কিছু এনে ফেলতে থাকবে। কি ভাগ্যিস টিকটিকির কথাটা মুখ ফুটে বলিনি।

"তাই তো কি কাণ্ড! তোর আন্টি তো তাহলে কাল রাতে ঘুমোতেই পারেনি। তবে আন্টি একটু ভীতু বুঝলি, বেলুনে এত ভয় পাওয়ার কিছু তো নেই।"

বুঝিয়ে বাঝিয়ে, খিলখিলিনি এবং কিলবিলিনি  থামিয়ে মেয়েকে ঘুম পাড়াই। কাল ইস্কুল। তারপর হিসেবে প্রত্যাবর্তন করতে গিয়ে দেখি ফোনের ব্যাটারি কম, চার্জ লাগবে।

খাট থেকে পা-টা নামাতেই একটা সলিড জীবন্ত কিছু পায়ের পাতার ওপর এসে পড়ল। জোরে চেঁচিয়ে উঠছিলুম আরেকটু হলে। স্যাট্ করে পা উপরে তুলে নিয়ে ফোনের আলো ফেলে দেখলুম,

কুমীরের ল্যাজে পা দিয়েছিলুম বই তো নয়!

ইয়ে, মানে, তিতিরের খেলনা কুমীর। কাপড়ের।  সেটা কেন যে জীবন্ত মনে হল জানিনা।

ইয়ে, মানে, জানি, কিন্তু বলব না।

Sunday, 4 June 2017

দাঁত



  
   


সক্কাল বেলা, ভাল করে মুখ ধুইনি পর্যন্ত, “মাম্মা! মাম্মা!!” করে সে কী অনৈসর্গিক আর্তনাদ!

মাম্মাত্ব লাভ করে পাঁচ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এখন যাকে বলে স্থিতপ্রজ্ঞ হয়ে গেছি, কথায় কথায় ভির্মি খাই না আগের মত। কিন্তু এই আর্তনাদে আমার পেটের পিলে গাঁক করে লাফিয়ে পড়ে ডায়াফ্রামে ঠুকে গেল, মাথার উস্কোখুস্কো চুলগুলো আলপিনের মত খাড়া-খাড়া হতে গিয়ে বিনুনিতে বাধা পেয়ে কেমন যেন ছেতরে গেল, আর ফেনামাখা টুথব্রাশটা পটাং করে হাত থেকে বালতির মধ্যে পড়ে গিয়ে আধ বালতি জল নষ্ট হল।

কোনরকমে মুখ ধুয়ে দৌড়ে গেলুম শোবার ঘরে। মেয়ে তখনো শয্যাত্যাগ করেনি, সারারাত ঘুমোনোর পরিশ্রম লাঘব করতে গড়াগড়ি খাচ্ছে মাত্র। এর মধ্যে এমন কী বা হতে পারে যে এভাবে হুঁকোমুখোর মত চেঁচাবে! জেগে জেগে তো আর পঙ্গপালের স্বপ্ন দেখে ভয় পেতে পারে না, আর এত বড় ধেড়ে মেয়ে খাট থেকে পড়ে যেতেও পারে না! এইখানে ভাবনায় লাগাম দিতে হল, কারণ মনে পড়ে গেল ধেড়েতর হয়েও এই কিছুকাল আগেই আমি মেয়ের সাথে পাইরেট শীপ খেলার হুড়োহুড়ি করতে করতে ‘পপাত চ’ হয়েছি!

ততক্ষণে মেয়ের গলা শুনে রান্নাঘর থেকে আন্টি আর বসার ঘর থেকে দাদু সবাই চোখ গোল করে এসে হাজির।

মেয়ে ফিকফিক করে হেসে বলল, “দাঁত নড়ছে!”

হুম্‌! এই কথা! গতকাল বাড়ি ফিরেই এই ঘোষণাটা শুনেছি বটে! তেনার প্রথম দাঁতটি নড়িতেছে।কাল খুব উল্লাস সহকারে আমায় নাড়িয়ে নাড়িয়ে দেখিয়েওছে। সামান্য কম্পমান, সবে শুরু হয়েছে। তা সে তো আজ-ও নড়বে বটেই, এ আর নতুন কথা কি!

নাহ্‌! জীবনে প্রথম দন্তকম্প দেখা কন্যার কাছে এ এক পরম আশ্চর্য! দাঁত কাল নড়ছিল, আবার আজ-ও নড়ছে! সেই আহ্লাদেই অত হাঁকডাক।

তারপর আমি তো রকেটের গতিতে রেডি হয়ে আপিশ চলে গেলুম। আপিশ থেকে ফিরে দেখলুম তিনি পুরো ব্যাপারটা বেশ হৃদয়ঙ্গম করে ফেলেছেন ততক্ষণে। দাদুমণি বুঝিয়ে বলেছে, তারপর দিম্মাকে “কাইপ্‌” করে দেখিয়েছে, তখন দিম্মা আরো বুঝিয়েছে, অবশেষে আন্টিও তার দাঁত পড়ার গল্প শুনিয়েছে। কাজেই তিনি এখন দাঁত নড়া, দাঁত পড়া, নতুন দাঁত গজানো, বুড়ো বয়েসে আবার দাঁত পড়া, দাঁত বাঁধানো, ইঁদুরের গর্ত – সব ব্যাপারে ওয়াকিবহাল হয়ে গেছেন।

ইঁদুরের গর্ত শুনেই তো ফ্যাক করে হেসে ফেললুম। শহরে আবার ইঁদুরের গর্ত! এ বাবদ আমাদের দুই জেনারেশনের আবার কীর্তিস্থাপন করা আছে। আমার পিতৃদেব এক পোক্ত পালিশ কাঠের আলমারির নিচে একটা গর্ত আবিষ্কার করে ধরে নিয়েছিলেন সেটা ইঁদুরের গর্ত, এবং তাঁর প্রথম দাঁতখানি সেই গর্তে সুন্দর করে গলিয়ে দিয়েছিলেন। পরদিন ঠাকুরদাদা আলমারি খুলে জিনিস বার করতে গিয়ে দেখেন নিচের তাকের মাঝমধ্যিখানে এক মরালশুভ্র দন্তরত্ন শোভা পাচ্ছে।

আর আমি? আমাদের কলকাতার বাড়ির শোবার ঘরে একটা জল যাবার ঝাঁঝরি আছে। পুরোনো বাড়ি তো, জল দিয়ে ঘরে ধোয়া হলে জল বেরোবে বলে রাখা থাকত তখন। ঠিক যেমন দেওয়ালে ঘুলঘুলি আছে, জানলায় খড়খড়ি আছে। তা সে যাক, আমি সারা বাড়ি পরিদর্শন করে কেন জানি না সেই দোতলার ঘরের ঝাঁঝরিটাকেই ইঁদুরের গর্ত সাব্যস্ত করেছিলুম। এর থেকে বোঝা যায় ঐ বয়েসে আয়তন নিয়ে কোন আন্দাজ থাকে না, কারণ যেখানে আমি নধর ইঁদুর ন্যাজ খেলিয়ে ঢুকবে বেরোবে ভেবে নিয়েছিলুম সেখানে অনেক কসরৎ করেও কচি দাঁতটা ঢোকাতে পারলুম না, এতই সরু ফাঁক। মাঝখান থেকে আবার দিদা দেখে ফেলে বাড়িশুদ্ধু সবার কি হাসাহাসি!

তো বংশগতি অনুসরণ করে তিতিরও ইঁদুরের গর্ত খুঁজে রেখেছে দেখলুম। কিছুকাল আগে বাড়িতে ইঁদুরের উপদ্রব হয়েছিল, তখন রান্নাঘরের দরজার কাঠ খানিক চিবিয়ে একটা গর্ত করে দিয়েছিল ইঁদুরে। মেয়ে সেখানেই নাকি দাঁতটা ফেলবে।

পট্‌ করে মাথায় ফিচেল বুদ্ধি এল।

“ও তিতির! ফেলে দিবি কেন? এক কাজ কর, তোকে একটা বাহারি দাঁতের কৌটো কিনে দিই, তাতে তুলোর বিছানা করে দেব গয়নার বাক্সে যেমন থাকে। সব দাঁত জমিয়ে রাখিস।”

“তাপ্পর?”

বয়েস বেড়েছে বলেই কি আর বুড়োটে হতে ইচ্ছে করে, বলুন?

“তারপরই তো মজা! বুড়ো হয়ে যখন দাঁত পড়ে যাবে, তখন নিজের দাঁতগুলোই আবার লাগিয়ে নিবি।”

হো হো হি হি খিলখিল খিলখিল। ঘরের সবাই হেসে গড়িয়ে পড়ল।

কিন্তু পরদিনই আর হাসি রইল না তাদের। আমার? আমার আবার কি হবে, আমি এসবের ঊর্ধ্বে। তাছাড়া খাল কেটে কুমিরটা তো আমিই এনেছি!

না, হয়নি বিশেষ কিছুই। পরদিন তিতিরকে নিয়ে চেম্বুর গেছিলুম কেনাকাটা করতে। লিস্টে “দাঁতের কৌটো”ও ছিল গুরুত্বপূর্ণ আইটেম। তা অনেক দেখে দেখে, বেছেবুছে, একটা সুন্দর স্বপ্নিল গোলাপী রঙের কৌটো কিনে এনেছে মেয়ে। বাড়ি এসে তাতে তুলোর আস্তরণও বানিয়ে দিয়েছি।

এইবার, এইমাত্র তিনি ঘোষণা করেছেন যে যেমন কয়েন ফেলে ফেলে কয়েন-ব্যাঙ্ক “ভত্তি” করছেন, তেমনি এই কৌটোটাও দাঁতে “অ্যাক্‌দম ভত্তি” করে দেবেন – এই তাঁর মনোগত বাসনা।

এদিকে কৌটোর যা সাইজ, তাতে শুধু তিতির কেন, তিতিরের মা দিম্মা দাদুমণি বদ্দিদা ছোদ্দিদা মাসিমণি মামাবাবু দাদামশাই সবার বত্রিশ পাটি ভরলেও “ভত্তি” হবে কিনা সন্দেহ! বলি এত দাঁত পাব কোথথেকে শুনি? এরপর যদি কয়েন-ব্যাঙ্ক ভর্তি করার লোভে যেমন বায়না করে করে কয়েন আদায় করছে, সেরকম আমাদের দাঁত ধরেও টানাটানি করে?