Showing posts with label sleep. Show all posts
Showing posts with label sleep. Show all posts

Sunday, 17 November 2019

এক নিরীহ রোব্বারের বিকেল


 

কাউকে কিচ্ছু করিনি মশাই! মনের আনন্দে একটা নিরীহ নিরুপদ্রব রোব্বারের বিকেল কাটাচ্ছিলুম।  ভাতঘুম দিয়ে উঠে, রান্নাঘর হাঁটকে দুরকম আচার দু বাটিতে খাবলা করে এনে, কোলে তাকিয়ে নিয়ে বসে পালা করে সে দেবভোগ্য জিনিস চাখছিলুম আর একটা হেব্বি ভয়াল ভয়ংকর বই পড়ছিলুম। পাশের বেডরুম থেকে ফায়ার অ্যালার্মের চেয়েও বিকট জোরে হাঁক এলো।

"মাআয়ায়ায়ায়ায়ায়া! পাঁঁখাটা খুঁলে গেল!!!"

বিষম খেয়ে, আচারের চামচ ছুঁড়ে ফেলে, বালিশ উলটে দে দৌড়। মনে অবশ্য কূট প্রশ্ন জেগেছিল, যে এরকম নিঃশব্দে পাখা কী করে পড়ে যায়, তবে কি পাখার সত্যিকারের পাখা গজিয়ে উড়ে গেল?

হেসে লাভ নেই। এবাড়ির যা বীর বাতাস, প্যাকেট ভর্তি ওষুধ বা রান্নাঘরের কৌটো অতীতে বাতায়নপথে হাওয়ায় উড়ে গেছে। পাখার পক্ষী হওয়াই বা অসম্ভব কিসের!

তা, গিয়ে দেখি, সত্যিই খুলে পড়ে গেছে বটে। পড়ে গিয়ে শুধু যে তার একটা ব্লেড তেড়েবেঁকে গেছে তাই নয়, তার নিচে থাকা সাধের তিনকোনা টেবিলটাও দু টুকরো হয়ে গেছে!

বহু কষ্টে, বহু মাথা খাটিয়ে সেসব সারিয়ে সুরিয়ে সবে আচারের কাছে ফিরতে যাব, পচ্ করে জলে পা পড়ল।

কাঁহাসে জল আয়া রে বাবুয়া?

তদন্ত সমাপনান্তে বোঝা গেল বাথটব লিক করছে। সবে এই সকালেই ফিক্স করা হয়েছে, এর মধ্যেই তার দেহ রাখার দশা দেখে মেজাজ গেল চড়াং করে গরম হয়ে। যন্তরপাতি নিয়ে আবারও লেগে পড়লুম। এ ব্যাপারে আমার কন্যা আমার যোগ্য সহযোগী, তাকে টেপ চাইলে পেনসিল দেয়, দড়ি চাইলে আঠার শিশি। ঘাড় ব্যথা করে, সেসব পুলটিস মেরে, লীকপ্রুফ করে তবে উঠেছি, তিনি গলায় সওয়া চামচ মধু ঢেলে বললেন, "কমোডটাও হেলে গেছে মনে হচ্ছে, মাঁায়ায়া!"

এইবার ভারি রাগ হল। এটা বাড়ি, না দক্ষযজ্ঞ নৃত্যাভ্যাসের পাঠশালা? অ্যাঁ? এটা মেয়ে, না আখখুটে আবদাল্লা? বলি, সব ঘরদোর পরিপাটি  করে রেখে, ভালো করে দেখে তবে ঘুমোতে গেছি, আর এর মধ্যেই কিনা এত কিছু বিগড়ে রেখেছে!

কপাল! কপাল! মনে মনে চোখ বন্ধ করে "দীনবন্ধু কৃপাসিন্ধু কৃপাবিন্দু বিতরো" গাইতে গাইতে কমোডবাবাজীকে সিধে করলুম, তারপর চোখে পড়ল দেওয়াল ঘড়িটা চলছে না, তার কাঁটা ঘুরিয়ে দিলুম, গ্যাস সিলিন্ডার লাগালুম, সিঁড়ির ধাপে গাছ বসালুম। তারপর মনে হল, তখন থেকে মনে হচ্ছে আলমারিটা ওই দেওয়ালে মানাচ্ছে না, এতই যখন করলুম ওটাই বা আর বাদ যায় কেন!

এত কাজ মানুষে করে, বলুন তো? তাও রোব্বার বিকেলে?

আবার মিনমিন করছেন কেন?

আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেছে? আমার কর্মকুশলতায় তো?

অ্যাঁ, না?  ওই পাখা পড়া...বিপজ্জনক?

দূর মশাই! ওটা কোনো বিপদ হল! ওর চেয়ে ঢের ঢের বেশি বিপদ হতে যাচ্ছিল আজ, তা জানেন?

"ম্যাঁ, এইখান থেকে নিয়ে নিচ্ছি বুঝলে, কিছু টের পাওয়া যাবে না।"

এই মোক্ষম সময়ে মা যদি তার লেখার অতল থেকে কান বাড়িয়ে কথাটা শুনে না ফেলত, যদি তার মগ্নচৈতন্যে প্লটের পিন্ডি চটকে এর অর্থ মরমে না পশিত, যদি সে হাঁ হাঁ করে ঝাঁপিয়ে পড়ে কন্যার হাতের উদ্যত কাঁচি কেড়ে না নিত - তো ঘরের বাহারি ফুলেল পর্দার কোমরের কাছে জন্মের শোধ দু ইঞ্চি বাই দু ইঞ্চি সাইজের দুটো গর্ত হয়ে যেত। হুঁঃ!

অবশ্য, তাতে ডলহাউসের জানলার পর্দা ঘরের পর্দার সঙ্গে ম্যাচিং ম্যাচিং হত।

নিন, দেখুন দিকি, কেমন দাঁড়াল মা মেয়ের হাতের কাজটা?


Sunday, 24 March 2019

রাজা ও বাঁদরছানা


“ও তিতির।  আর কতক্ষণ ধরে খাবি? মুখ চালা রে!”
“আমি তো যথাসম্ভব দ্রুত খাচ্ছি মা!”
আজ্ঞে। ওই হতভম্ব সরলহৃদয়া স্নেহশীলা (উভয়ার্থে ) মহিলাটি আমিই। হাঁ করে যার দিকে চমৎকৃত চক্ষে চেয়ে আছি, সেও আমারই একমাত্তর নাড়ি ছেঁড়া ধন। 
নাহয় শীর্ষেন্দু পড়াই, নাহয় ত্রৈলোক্যনাথ পড়াচ্ছি। তাই বলে একটা আজন্ম বোম্বেতে বড় হওয়া  স্কুলে ইংলিশ হিন্দি মারাঠি শেখা ছানা এমন শুদ্ধ বাংলায় জবাব দেবে! এটা বাক্যালাপ, না শরদিন্দুর ঐতিহাসিক উপন্যাস হে!
মনের মধ্যে গুনগুন করে জবাব আসে, আর তুমি নিজে যে সুযোগ পেলেই স্কুলের খাতায় বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষায় রচনা লিখে আসতে, তার বেলা?
যাকগে যাক। কিন্তু এদিকে সত্যিই যে মুখ বড়ই ধীরে চলছে। সমস্ত মনোযোগ কালি ফুরোনো ডটপেন আর বাতিল টুথব্রাশ দিয়ে ডাইনোসরের ডেন্টাল ক্লিনিং এ। এবার মাকে আসরে নামতেই হয় দেখছি।
"এই শোন না। একটা খাসা গল্প পেয়েছি। মৈ মাসি দিয়েছে৷ শোন না, শুনবি?"
যেই না গল্পের লোভে স্থির হয়ে বসেছে, টপ করে মাছভাতের গোল্লা যথাস্থানে চালান করি। 
"হুঁ শোন। একটা না রাজা ছিল। রাজার না একদিন শখ হয়েছে শিকার করতে যাবে।"
"মী-গয়া।"
"ঠিক ঠিক৷ মৃগয়া করতে যাবে।  (এটা ছবিতে রামায়ণের ফল) তো রাজা তো রেডি হল সেই মত - খাকি জামা আর হাফপ্যান্ট পরেছে, চোখে সানগ্লাস, মাথায় টুপি, আর পায়ে বুটজুতো।"
রাজার হাফপ্যান্ট বা টুপি যদি বা সহ্য করে নিয়েছিল, বুটজুতো আর সইল না।
"নায়ায়ায়ায়ায়ায়া! রাজা পায়ে নাগরা পরে।"
 আমিও ছাড়তে রাজি নই। 
"এহ, যাচ্ছে জঙ্গলে, কত কাঁটা খোঁচা পোকা মাকড় জোঁক আছে তার ঠিক নেই - নাগরা ফাগরা চলবে না।"
খানিক টালবাহানার পর ঠিক হল সে রাজকীয় বুট পরবে, তার ডগাটা নাগরার মত শুঁড়তোলা।
“চলল রাজা তরোয়াল বাগিয়ে ধপাং ধপাং করে। জঙ্গলে ঢুকে দেখে কি…”
“বাঘ নাঁ!”
“আচ্ছা বাঘ না। দেখে কি একটা…”
“ভাল্লুক নাঁ!”
“অ্যাঁ! আচ্ছা বাঘ ভাল্লুক কিছুই না। দেখে কি একটা বাঁদর। খুব মিষ্টি দেখতে বুঝলি…”
“আমার মত?”
এরকম ভয়ংকর বিপজ্জনক দোরোখা কোচ্চেনের উত্তর দিয়ে ফাঁসি আর কী! না না আমি অত বোকা নই।
“না, ওটা বয় বাঁদর। মানে বাঁদর, বাঁদরী নয়।“
“তাহলে সামু মামুর মত মিষ্টি দেখতে।“
নিশ্চিত প্রত্যয়ের ঘোষণা। যাকগে, সে সামু মামু বুঝবে এখন। আমি গল্প আগে বাড়াই।
“হ্যাঁ সেটা আসলে বেবি ছিল জানিস। সে না, একদম মায়ের কথা শুনত না আর সারাক্ষণ খাবার দাবার ফেলে লাফিয়ে বেড়াত বলে তার মা খুব বকেছিল। তাই সে বাড়ি থেকে পালিয়ে জঙ্গলে চলে এসেছিল।“
যা মাথায়্ আসে তাই বকে যাই। এখনো মাছভাত বাকি, তারপর চিনি দেওয়া দইয়ের বাটি অপেক্ষা করছে।
“আর তারপর না …রাজা আর বাঁদরে যুদ্ধ। সে কী যুদ্ধ ভাবতে পারবি না। শেষে বাঁদর দিয়েছে একটা বিকট বাঁদুরে ভেংচি কেটে – আর রাজা ভয়ে পগারপার।“
“মা? মাম্মা বাঁদর কাঁদছে না?”
যার যেদিকে মন!
“হ্যাঁ রে, মাম্মা বাঁদরের তো খুব মন খারাপ। সে সব জায়গায় ছানা খুঁজতে খুঁজতে এসে রাজপ্রাসাদে হাজির। সেখানে এসে দেখে রাজা মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে তার চেয়েও জোরে হাউ হাউ করে কাঁদছে।
আরে, আরে, কাঁদে না! এই নাও বাঁদুরে বিস্কুট খাও। এবার বলো তো বাছা কী হয়েছে?
আঁ আঁ আঁ …আমার তলোয়ার…অ্যাঁ অ্যাঁ…একটা পাজি বাঁদর… অ্যাঁ অ্যাঁ … নিয়ে নিয়েছে! জঙ্গলের মধ্যে! অ্যাঁ! আমায় ভেংচিও কেটেছে! অ্যাঁ্যাঁ্যাঁ!!!!!!!
বাঁদরের মা তো রাজার মাথায় অনেক হাত বুলিয়ে বিস্কুট টিস্কুট খাইয়ে তাকে শান্ত করল। তারপর মাম্মা বাঁদর, রাজা, মন্ত্রী, সেনাপতি সবাই মিলে জঙ্গলে চলল রাজার তলোয়ার ফিরিয়ে আনতে।
জঙ্গলে গিয়ে দেখে কি, সেই ছানা বাঁদর না, রাজার তলোয়ার দিয়ে গাছ থেকে কলার কাঁদি কেটে নামাচ্ছে। এরা যেই হইহই করে উঠল, সে অমনি মুখ ঘুরিয়ে দেখে, মাম্মা!
ছানা অমনি সব ফেলে একলাফে মায়ের কোলে।
ও মাঁ! খিদে পেয়েছে, বাঈ যাব!
মাম্মা তখন আর বকবে কী, ছানাকে আদর করে কূল পায় না!
তারপর মাম্মা ছানা ট্যাঁকে বাড়ি চলে গেল, গিয়ে ছানাকে চিঁড়ে মুড়কি দুধ কলা দিয়ে ফলার মেখে দিল খেতে, আর রাজা তার তলোয়ার নিয়ে সবাইকে নিয়ে ফিরে গেল রাজপ্রাসাদ। হয়ে গেল গল্প!“
অমনি এই ছানাটাও শেষ চামচ চেটে খেলি করে হুপ্‌ করে এক্ লাফে মায়ের কোলে উঠে পড়ল। তারপর ঘুমু করতে গিয়ে আবার অন্য গল্প…কিন্তু সে আবার পরে আরেকদিন তোমাদের শোনাব।


Sunday, 4 February 2018

সাইকেল

দুপুরবেলা। খেয়েদেয়ে লম্বা হয়েছি। আজ কিনা আলুপোস্ত হয়েছিল, সেটা আবার তিতির খুব ভালবেসে চেয়ে চেয়ে খেয়েছে বলে আমি এবং তার আন্টি দুজনেরই দিল খুশ। তায় আবার খেতে খেতে তুতু-ভুতু পড়েছে, বগা পুলিশের কাণ্ড দেখে হি হি করে হেসেছে। ফলে দাদুমণিও দিব্য খুশ।
সদ্য গতকালই সাইকেলটা সার্ভিসিং করিয়ে এনেছি তাঁর। কাজেই ছোট্ট হৃদয় ঐ সিঁড়ির নিচের পিঙ্ক দ্বিচক্রযানে বাঁধা পড়ে আছে, আকুলিবিকুলি চলছে সাইকেল চালাতে যাবার। ইদিকে রাস্তায়্ একে রোদ ঝাঁ ঝাঁ, তায় দেখতে পাচ্ছি বাম্পারগুলোয় সাদা হলুদ ডোরা কাটা রঙ করার কাজ চলছে, দুজন উবু হয়ে বসে তুলি বোলাচ্ছেন। ভুলিয়ে ভালিয়ে রোদটা না পড়া অবধি কন্যাকে সাইকেল থেকে দূরে রাখতে হবে।
এমন ঝাঁ ঝাঁ রোদ ভরে থাকত সিঁথির দোতলার ছাতটাতেও। সেটা তখনো এমন গাছের টবে ভরাভর্তি হয়ে যায়নি। ফাঁকা জায়গায়, বোঁ বোঁ করে সাইকেল নিয়ে পাক খেত এইরকম ছ-সাত বছরের মেয়েটা। ঝাঁকড়া ঝুমরো চুল মুখেচোখে এসে পড়ত বলে মাঝে মাঝেই মাথা ঝাঁকিয়ে সরিয়ে নিত। উঁহু, তার এমন দেখনদার সাইকেল ছিল না। একটা তিনচাকা ছিল, কার বলো তো? তার দিদার ছোটবেলার। এক বাক্স পিতলের কুচি কুচি রান্নাবাটি আর আদ্যিকালের হারমোনিয়ামটার সঙ্গে সঙ্গে এই সাইকেলটাও সে উত্তরাধিকারে পেয়েছিল দিদা-বড়দিদার সেই কোনকালের ঢালা বিছানা, রঙীন কাচের জানলা আর রোজের লুচি-পরোটার জলখাবারের শিশুকাল থেকে।
এদ্দিন অটুট রইল কী করে? কী যে বলেন না! আগাগোড়া লোহার তৈরী তো, এখনকার প্লাস্টিকের ফঙ্গবেনে জিনিস নাকি! লোহার রড, বসার সীটের বেস, চাকা। দাদু যখন মাচার সম্পত্তি থেকে সেটা টেনে বার করে আনল, তখন কিঞ্চিৎ জীর্ণ মরচে ধরা দশা, সীট আর টায়ার গায়েব। ঘষেমেজে, তার উপর কটকটে আকাশী নীল রঙ করে, সীট টায়ার লাগিয়ে সেটা ছাতে তুলে দিয়েছিল দাদু। মা কলেজ যায়, মেয়ে বাঁই বাঁই করে নীল সাইকেলে চক্কর কাটে। তিনচাকা নিয়ে ব্যালেন্সের খেল খুব একটা সম্ভব হত না, কিন্তু স্পীডের যে কী নেশা! আর চাকায় নিয়মিত তেল দিতে ভুলে গেলেই ক্যাঁচ কোঁচ আওয়াজ। ঐ আওয়াজের জ্বালায় এরকম দুপুরে সাইকেল চালানোটা হত না মেয়ের, চুপি চুপি ছাতে গিয়ে শুরু করলেই হয় দাদু ঘুম ভেঙে ধমক দিত, নয় দিদা এসে ধরে নিয়ে যেত।
তা, আমায় ভুলিয়ে রাখা বড় সোজা ছিল। একটা আগে না পড়া আনকোরা বই হাতে ধরিয়ে দিলেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে অখণ্ড শান্তি। গল্পের বইয়ের অভাব হলে বাংলা ব্যকরণ বা মধুসূদন রচনাবলীও চলত।
কিন্তু আমার বুকে শেল হেনে তিতির এখনো গল্পের বইয়ে ‘নিজে নিজে’ বুঁদ হয়ে যেতে পারে না। তাকে গল্প শোনাতে হয়। কাজেই তাকে ভুলিয়ে রাখার অনেক ফন্দিফিকির করতে হয় এখনো।
“তিতির আয় আমরা অক্ষর দিয়ে ফুল-ফল-পাখি-জন্তু খেলি।”
“ইয়েয়েয়েয়েয়েয়ে!”
তিনটি ভিন্ন অ্যাঙ্গেলে ঝম্পপ্রদান খাটের ওপর। শেষেরটা প্রায় আমার পেটের মধ্যে।
নাগালে পেতেই, জাপটে সাপটে শুইয়ে ফেলি, “বল দেখি পি দিয়ে।”
“পি...পাইনাপল!”
“ফল হ’ল, এবার ফুল বল?”
“প্পপ্পপ্পপ্যারট্‌”
“আচ্ছা বার্ড হ’ল। ফুল?”
“পি ইউ এম এ পুমা!”
“আচ্ছা, অ্যানিম্যালও হ’ল। কিন্তু ফুলটা বল?”
“বুঝলে মা, প্যারট না, পেঙ্গুইন। আমি পেঙ্গুইন বেশি ভালবাসি।“
“ফুল মনে পড়ছে না, তাই তো?”
কিলিরবিলির করে মাথা দিয়ে গুঁতো আর ভুবনমোহিনী হাসি।
“কেন কত তো আছে, প্যানজি, পপি, দিম্মার বাগানে দেখেছিলি না?”
“হুঁউউউ...মাম্মা আমি না ফুল বলব না। কালার বলব হুঁ? পি দিয়ে পাপ্পল্‌!”
ফাঁকিবাজ কি সাধে বলি। যাই হোক আর দুবার এমন খেলার পর বিচ্ছুটা আমায় ‘কিউ’ দিয়ে বলতে দিল। তখন বাধ্য হয়ে অন্য খেলা আমদানি করতে হল। একটা মিনি কালারিং বুক পড়্রে ছিল, তাই হাতে ধরিয়ে বললুম, র‍্যাণ্ডম একটা পাতা খুলে যা ছবি পাবি সেটা আমায় শুধু বর্ণনা দিয়ে বোঝা, কিসের ছবি বলবি না আমি গেস করব। একদম নতুন গেম, সদ্য বানিয়েছি, তাই প্রবল উৎসাহে খেলতে লেগে গেল। এত বকবকানির মধ্যে ঘুমোনোর চেষ্টা বৃথা বুঝে দাদুমণি  উঠে বসেছিল ততক্ষণে, তিনিও যোগদানের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন।
“একজনের নাকে না...(ফিসফিস করে দাদুমণিকে, এটাকে কী বলে গো? ফিসফিস ফিসফিস)...নাকে না...খড়গো আছে।”
“গণ্ডার! এত সহজ হিন্ট দিস না, শক্ত শক্ত দে।“
“উম্মম...আচ্ছা, একজনের শুঁড় আছে।“
“হাতি! বলছি না শক্ত দে?”
“হয়নি, হয়নি, ফেল!” মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে বলে সহর্ষ কন্যা।
অ্যাঁ! হাতি নয় শুঁড় আছে? সে আবার কী? ও, বুঝেছি, শুঁড়ের অবস্থানে ভুল করেছি। মৌমাছি? তাও নয়? তাহলে প্রজাপতি?
“আরে ধ্যাৎ! মাথায় নয়! এমনিই শুঁড় আছে।“
এবার রাম ট্যান খাই। এমনি এমনি কার আবার শুঁড় হয়?
“ছোট্ট শুঁড়। পুঁচকি পানা।“
শুঁড়ের সন্ধানে অ্যানিম্যাল কিংডম হাতড়াই। কে রে ভাই! ওদিকে ফিসফিস চলছে, দাদুরও নাকি নামটা মনে পড়ছে না। ওঃ! পেয়েছি, ‘সূর্যদেবের বন্দী’র ক্যাপ্টেন হ্যাডক-কে মানসচক্ষে দেখতে পেয়েছি!
“ওটাকে পিপীলিকাভুক বলে বুঝলি। পিপীলিকা মানে পিঁপড়ে, আর ভুক মানে যে খায়। ওটা পিঁপড়ে খায়। শিখিয়েছিলুম তোকে আগে, ভুলে গেছিস।“
“আচ্ছা এইটে বলো। একজনের পিছন দিয়ে ধোঁয়া বার হয়।“
হাঁ হয়ে যাই। ওদিকে দাদু উঁকি মেরে ছবিটা দেখে বেদম হাসতে লেগে গেছে।
অনেক কসরৎ করেও এ অসম্ভব জিনিস পারি না। শেষে তিতির বই দেখায়, দেখি...
একটা ট্রাক।
“এ আবার কী! একজন বললি কেন? এক’জন’?”
“আহা, ট্রাকও তো একজন লোক। আমি চোখ মুখ এঁকে দিইনি তাই বুঝছ না।“
বুঝতেই পারছেন এমন গোলমেলে মেয়ের সঙ্গে আমি আর খেলতে রাজি হইনি। তাছাড়া সে রঙ পেন্সিল এনে ট্রাকের চোখ মুখ আঁকতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল তারপর।
একটু আবার চোখটা লেগে এসেছে, মাথার কাছে তারস্বরে চীৎকার -
“হ্যালো লোক!!! রঙ কি শুকিয়েছে এবার?”
চেয়ে দেখি তিনি জানলার সামনে বাবু হয়ে বসে রাস্তায় রং করা দুজনের উদ্দেশ্যে হাঁকডাক জুড়েছেন। ধড়মড় করে উঠে বসতে বসতে স্বগতোক্তি শুনি -
“ও না না, দুজন লোক তো, একের বেশি। তাহলে…”
আবার পাড়া কাঁপানো চীৎকার, “হ্যালো লোকস্‌!”
সব্বোনাশ করেছে। নাঃ, আর বিশ্রামের আশা করে লাভ নেই, রোদটাও আর রাস্তায় নেই, যাই সাইকেলের পিছনে দৌড়ই গে’!


Sunday, 4 June 2017

দাঁত



  
   


সক্কাল বেলা, ভাল করে মুখ ধুইনি পর্যন্ত, “মাম্মা! মাম্মা!!” করে সে কী অনৈসর্গিক আর্তনাদ!

মাম্মাত্ব লাভ করে পাঁচ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এখন যাকে বলে স্থিতপ্রজ্ঞ হয়ে গেছি, কথায় কথায় ভির্মি খাই না আগের মত। কিন্তু এই আর্তনাদে আমার পেটের পিলে গাঁক করে লাফিয়ে পড়ে ডায়াফ্রামে ঠুকে গেল, মাথার উস্কোখুস্কো চুলগুলো আলপিনের মত খাড়া-খাড়া হতে গিয়ে বিনুনিতে বাধা পেয়ে কেমন যেন ছেতরে গেল, আর ফেনামাখা টুথব্রাশটা পটাং করে হাত থেকে বালতির মধ্যে পড়ে গিয়ে আধ বালতি জল নষ্ট হল।

কোনরকমে মুখ ধুয়ে দৌড়ে গেলুম শোবার ঘরে। মেয়ে তখনো শয্যাত্যাগ করেনি, সারারাত ঘুমোনোর পরিশ্রম লাঘব করতে গড়াগড়ি খাচ্ছে মাত্র। এর মধ্যে এমন কী বা হতে পারে যে এভাবে হুঁকোমুখোর মত চেঁচাবে! জেগে জেগে তো আর পঙ্গপালের স্বপ্ন দেখে ভয় পেতে পারে না, আর এত বড় ধেড়ে মেয়ে খাট থেকে পড়ে যেতেও পারে না! এইখানে ভাবনায় লাগাম দিতে হল, কারণ মনে পড়ে গেল ধেড়েতর হয়েও এই কিছুকাল আগেই আমি মেয়ের সাথে পাইরেট শীপ খেলার হুড়োহুড়ি করতে করতে ‘পপাত চ’ হয়েছি!

ততক্ষণে মেয়ের গলা শুনে রান্নাঘর থেকে আন্টি আর বসার ঘর থেকে দাদু সবাই চোখ গোল করে এসে হাজির।

মেয়ে ফিকফিক করে হেসে বলল, “দাঁত নড়ছে!”

হুম্‌! এই কথা! গতকাল বাড়ি ফিরেই এই ঘোষণাটা শুনেছি বটে! তেনার প্রথম দাঁতটি নড়িতেছে।কাল খুব উল্লাস সহকারে আমায় নাড়িয়ে নাড়িয়ে দেখিয়েওছে। সামান্য কম্পমান, সবে শুরু হয়েছে। তা সে তো আজ-ও নড়বে বটেই, এ আর নতুন কথা কি!

নাহ্‌! জীবনে প্রথম দন্তকম্প দেখা কন্যার কাছে এ এক পরম আশ্চর্য! দাঁত কাল নড়ছিল, আবার আজ-ও নড়ছে! সেই আহ্লাদেই অত হাঁকডাক।

তারপর আমি তো রকেটের গতিতে রেডি হয়ে আপিশ চলে গেলুম। আপিশ থেকে ফিরে দেখলুম তিনি পুরো ব্যাপারটা বেশ হৃদয়ঙ্গম করে ফেলেছেন ততক্ষণে। দাদুমণি বুঝিয়ে বলেছে, তারপর দিম্মাকে “কাইপ্‌” করে দেখিয়েছে, তখন দিম্মা আরো বুঝিয়েছে, অবশেষে আন্টিও তার দাঁত পড়ার গল্প শুনিয়েছে। কাজেই তিনি এখন দাঁত নড়া, দাঁত পড়া, নতুন দাঁত গজানো, বুড়ো বয়েসে আবার দাঁত পড়া, দাঁত বাঁধানো, ইঁদুরের গর্ত – সব ব্যাপারে ওয়াকিবহাল হয়ে গেছেন।

ইঁদুরের গর্ত শুনেই তো ফ্যাক করে হেসে ফেললুম। শহরে আবার ইঁদুরের গর্ত! এ বাবদ আমাদের দুই জেনারেশনের আবার কীর্তিস্থাপন করা আছে। আমার পিতৃদেব এক পোক্ত পালিশ কাঠের আলমারির নিচে একটা গর্ত আবিষ্কার করে ধরে নিয়েছিলেন সেটা ইঁদুরের গর্ত, এবং তাঁর প্রথম দাঁতখানি সেই গর্তে সুন্দর করে গলিয়ে দিয়েছিলেন। পরদিন ঠাকুরদাদা আলমারি খুলে জিনিস বার করতে গিয়ে দেখেন নিচের তাকের মাঝমধ্যিখানে এক মরালশুভ্র দন্তরত্ন শোভা পাচ্ছে।

আর আমি? আমাদের কলকাতার বাড়ির শোবার ঘরে একটা জল যাবার ঝাঁঝরি আছে। পুরোনো বাড়ি তো, জল দিয়ে ঘরে ধোয়া হলে জল বেরোবে বলে রাখা থাকত তখন। ঠিক যেমন দেওয়ালে ঘুলঘুলি আছে, জানলায় খড়খড়ি আছে। তা সে যাক, আমি সারা বাড়ি পরিদর্শন করে কেন জানি না সেই দোতলার ঘরের ঝাঁঝরিটাকেই ইঁদুরের গর্ত সাব্যস্ত করেছিলুম। এর থেকে বোঝা যায় ঐ বয়েসে আয়তন নিয়ে কোন আন্দাজ থাকে না, কারণ যেখানে আমি নধর ইঁদুর ন্যাজ খেলিয়ে ঢুকবে বেরোবে ভেবে নিয়েছিলুম সেখানে অনেক কসরৎ করেও কচি দাঁতটা ঢোকাতে পারলুম না, এতই সরু ফাঁক। মাঝখান থেকে আবার দিদা দেখে ফেলে বাড়িশুদ্ধু সবার কি হাসাহাসি!

তো বংশগতি অনুসরণ করে তিতিরও ইঁদুরের গর্ত খুঁজে রেখেছে দেখলুম। কিছুকাল আগে বাড়িতে ইঁদুরের উপদ্রব হয়েছিল, তখন রান্নাঘরের দরজার কাঠ খানিক চিবিয়ে একটা গর্ত করে দিয়েছিল ইঁদুরে। মেয়ে সেখানেই নাকি দাঁতটা ফেলবে।

পট্‌ করে মাথায় ফিচেল বুদ্ধি এল।

“ও তিতির! ফেলে দিবি কেন? এক কাজ কর, তোকে একটা বাহারি দাঁতের কৌটো কিনে দিই, তাতে তুলোর বিছানা করে দেব গয়নার বাক্সে যেমন থাকে। সব দাঁত জমিয়ে রাখিস।”

“তাপ্পর?”

বয়েস বেড়েছে বলেই কি আর বুড়োটে হতে ইচ্ছে করে, বলুন?

“তারপরই তো মজা! বুড়ো হয়ে যখন দাঁত পড়ে যাবে, তখন নিজের দাঁতগুলোই আবার লাগিয়ে নিবি।”

হো হো হি হি খিলখিল খিলখিল। ঘরের সবাই হেসে গড়িয়ে পড়ল।

কিন্তু পরদিনই আর হাসি রইল না তাদের। আমার? আমার আবার কি হবে, আমি এসবের ঊর্ধ্বে। তাছাড়া খাল কেটে কুমিরটা তো আমিই এনেছি!

না, হয়নি বিশেষ কিছুই। পরদিন তিতিরকে নিয়ে চেম্বুর গেছিলুম কেনাকাটা করতে। লিস্টে “দাঁতের কৌটো”ও ছিল গুরুত্বপূর্ণ আইটেম। তা অনেক দেখে দেখে, বেছেবুছে, একটা সুন্দর স্বপ্নিল গোলাপী রঙের কৌটো কিনে এনেছে মেয়ে। বাড়ি এসে তাতে তুলোর আস্তরণও বানিয়ে দিয়েছি।

এইবার, এইমাত্র তিনি ঘোষণা করেছেন যে যেমন কয়েন ফেলে ফেলে কয়েন-ব্যাঙ্ক “ভত্তি” করছেন, তেমনি এই কৌটোটাও দাঁতে “অ্যাক্‌দম ভত্তি” করে দেবেন – এই তাঁর মনোগত বাসনা।

এদিকে কৌটোর যা সাইজ, তাতে শুধু তিতির কেন, তিতিরের মা দিম্মা দাদুমণি বদ্দিদা ছোদ্দিদা মাসিমণি মামাবাবু দাদামশাই সবার বত্রিশ পাটি ভরলেও “ভত্তি” হবে কিনা সন্দেহ! বলি এত দাঁত পাব কোথথেকে শুনি? এরপর যদি কয়েন-ব্যাঙ্ক ভর্তি করার লোভে যেমন বায়না করে করে কয়েন আদায় করছে, সেরকম আমাদের দাঁত ধরেও টানাটানি করে?