Sunday, 30 October 2016

বাঁদোর


তিতির না, বাঁদর ওড়াতে ভারি ভালবাসে।

আরে না না আমার মাথা খারাপ হয়নি। বোম্বেতে সত্যিই বাঁদর ওড়ানো হয়। বেলুন দিয়ে তৈরি বাঁদর। জুহু বিচে হু হু করে হাওয়া দেয় তো, ঐ বাঁদরের সঙ্গে লম্বা সুতো দেয়, ঠিক ঘুড়ি ওড়ানোর মত করে লোকে ওড়ায়।

ওগুলো বানায়ও খাসা। গোল বেলুনের মাঝে বেঁধে মাথা ও পেট, লম্বাটে বেলুন দিয়ে হাত আর পা, একটা সরু লম্বা পাকানো গোছের বেলুনের ল্যাজ। এহেন বাঁদর যে তিতিরের পছন্দ হবে সেটা বলাই বাহুল্য। তার ওপর উড়ন্ত বাঁদর। তিতিরের চেয়েও, তার দাদুমণির বেশি পছন্দ দেখি। ছোট্টবেলার ঘুড়ি লাটাই নিয়ে ছাতে ভোকাট্টা করার স্মৃতি ফিরে আসে মনে হয়। তাই সময় সুযোগ হলেই পল্টন নিয়ে জুহু যাবার চেষ্টা করি। কিন্তু ইদানীং সেটা আর হচ্ছে না, অফিসে কাজের চাপে ফেঁসে চিপিটক-মূর্তি ধারণ করিতেছি কিছুকাল ধরে, সময় বার করতেই পারছি না।

কিন্তু পুঁচকি মেয়ের কি বেড়াতে না গেলে ভাল্লাগে, না আমারই ভাল্লাগে ওকে নিয়ে যেতে না পারলে! কাজেই জুহু যখন হচ্ছে না তখন জিজাই সই! মানে রাজমাতা জিজাবাই উদ্যান, অর্থাৎ রানীবাগ, অর্থাৎ বাইকুল্লা জু - বোম্বের একমাত্তর চিড়িয়াখানা।

কলকাতার চিড়িয়াখানা গিয়ে যারা অভ্যস্ত তারা অবশ্য নাক সিঁটকোবে। বলতে গেলে কিছুই প্রায় নেই জন্তু জানোয়ার। কয়েকটা হাতি হরিণ বাঁদর (না উড়ন্ত নয়) জলহস্তী কুমীর নীলগাই নেকড়ে আর কিছুকিঞ্চিৎ পক্ষীকূল চিড়িয়াখানার নাম রোশন করার ঝিমন্ত চেষ্টা করে। এক ঘন্টার বেশি লাগে না ঘুরতে।

কিন্তু কপালগুণে আমার মেয়ে মায়ের সাথে বেই-বেই বড় ভালবাসে। সে সামান্য একটা দোলনাওলা পার্কে নিয়ে গেলেও ভারি খুশি হয়। আরেকটা সুবিধে হল ভারি কাছে, টুক করে আধ ঘন্টায় পৌঁছনো যায়। সুতরাং রোববার জলখাবার খেতে খেতেই ঠিক করলুম আপাতত রাজমাতাকেই দর্শন করে আসি।

সেজেগুজে বেরোতে যা দেরি। তিতিরের প্রশ্নাবলী শুরু হয়ে গেল।
আমারও মন ফুরফুরে, তাই উত্তর দিতে কার্পণ্য নেই।

'মা আমরা জু যাচ্ছি, না?'
'
হ্যাঁ মা। জু যাচ্ছি তো।'

'মা আর কদ্দূর?'
'
আরে এই তো শুরু করলুম। একটু সময় লাগবে দাঁড়া।'

'মা জুতে হাতিগুলোর আমাকে মনে আছে?'
'
হ্যাঁ! ওরা তো রোজ বলে তিতির কবে আসবে, এখনো আসছেনা কেন।'
(
আহ্লাদে তিতির এক গাল হেসে ফেলে।)

'মা আর কদ্দূর?'
'
আরো খানিকটা মা।'

'মা আমি কিন্তু খেলাও কব্বো, আমায় খেলা করতে দেবে তো?'
'
বেশ তো, করিস। স্লিপ দোলনা কিসব আছে তো চ দেখি।'

'কি মজা না, আমরা জু যাচ্ছি?'
'
হ্যাঁ মা।'
(
মা এবার একটু পরিশ্রান্ত)

'মা আর কদ্দূর?'
'
আর একটু সোনা।'

'কুমীর আমায় খেতে আসবে না তো?'
'
না না অমন দুষ্টুমি করলে আমি কুমীরের কান মলে দেব।'

তিতিরের গম্ভীর মুখে আপত্তি,
'
কি করে মলবে? কুমীরের মোটেই কান নেই, কানের ফুটো আছে। আমি ছবি দেখেছি।'
বিব্রত মা মেকাপ দিতে চেষ্টা করে,
'
আহ হ্যাঁ ওই কানের ফুটোয় চাঁটি মারব।'

'মা আর কদ্দূর?'
'
এইবার এসে গেছি, আর একটু রে।'

'মা আর কদ্দূর?'
'
চুপ করে বোস না আর তো একটুখানি।'

'মা আর কদ্দূর?'
শুনতে পাইনি ভাব করে জানলা দেখতে থাকি, আহা কি নীল আকাশ মৃদু সমীরণ ছ্যাঁকছ্যাঁক রোদ উড়ু উড়ু মন...
ধৈর্যর মহতী পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়ে চিড়িয়াখানার গেটে নামি অবশেষে। ছোট্ট মানুষের হাত ধরে গটগট করে ঢুকে পড়ি। পরক্ষণেই হোঁচট খেয়ে পড়তে পড়তে সামলে নিই।

লেঃ! একেই কিছু নেই, তায় আবার চারদিকে খুঁড়ে টুঁড়ে একাকার করে রেখেছে। কি বানাইতেছ হে হরিপদভাই?
হরিপদ না, জাকিরভাই। সব সারাই হচ্ছে। ঝকঝকে নতুন হবে। জনরব নাকি পেঙ্গুইনও আসবে!

বেশ বেশ। আপগ্রেড হচ্ছে দেখে পরম পুলকিত হয়ে পক্ষীঘরের দিকে হাঁটা দিই। ও তিতির, কাকাতুয়া না, ওটা ম্যাকাও। এইদিকে কাকাতুয়া দেখ। আর এদিকে পিছন দিকে ধনেশ পাখি তার ঠোঁট সামলে বসে আছে দেখেছিস? আর এই খাঁচাটায় ব্ল্যাক আইবিস আর পেইন্টেড স্টর্ক, মনে আছে দিম্মা চিনিয়ে দিয়েছিল?

পাখপাখালি দেখে আর কিছু খুঁজে পাইনা। যে খাঁচায়ই উঁকি দিই, সেটাই খালি। এমনকি এঁকেবেঁকে যাওয়া খালটাও। রেগেমেগে খেলার জায়গাটায় চলে গেলুম দুজনে। সেটা পেয়ে অবশ্য তিতিরের আহ্লাদ আর ধরে না। নেচেকুঁদে চড়ে দুলে ঘুরপাক খেয়ে হেসে লাফিয়ে তার দিলখুশ, আম্মো খুশ।

তারপর যে দুটো অবধারিত থাকে, সেই কুমীর আর হাতি দেখিয়ে নিই।
কুমীর জলে পেট ডুবিয়ে শুয়ে ঘুমঘুম করছে, আর হাতিরা তেড়েফুঁড়ে কান আর ল্যাজ নাড়ছে।
তিতিরের তাই দেখেই মহানন্দ। যাই বল বাপু, ভারি তৃপ্তি হয় ঐ হাসিটা দেখলে।

তারপর মা-মেয়ে হাত ধরাধরি করে দোলাতে দোলাতে, পপ কর্ণ কিনে, ভোঁ করে বাড়ি ফিরে আসি। এসে স্নান করার আগে তেল মাখতে মাখতে তিতিরের হঠাৎ খেয়াল হল, 'বাঁদর দেখলুম না তো!'

ভাবলুম বলি দিবারাত্রি রাস্তায় বেরোলেই দেখিস তো, এই জঙ্গল ভরা কলোনিতে তারা সদলবলে বিরাজ করে। যত পায়রা, তত কাঠবিড়ালি আর ততই লালমুখো বাঁদর।

তার আগেই, কন্যা বললেন, 'এই দ্যাকো আমি কি সুন্দর বাঁদোর হইচি!'

আমি মুগ্ধ চোখে তেলচুকচুকে গায়, দু হাঁটু অল্প ভেঙ্গে, দু হাত কুস্তিগীরের পোজে তুলে গাল ফুলিয়ে দাঁড়ানো মেয়ের খুশিমুখ দেখি। নাহ, পরের রোববার এই মিষ্টি বাঁদরটাকে বাঁদর ওড়াতে জুহু নিয়ে যেতেই হবে দেখছি!

Sunday, 11 September 2016

বন্ধুমহল


কন্যা বড় হইতেছেন। আমার যেমন একটি হুল্লোড়ে আড্ডাবাজ বন্ধুর দল আছে, তিতিরেরও তেমনি একটা বেশ খেলুড়ে বন্ধুর দল জুটে গেছে এদ্দিন এ বাড়িতে থাকায়। সেই পেঁপেগাছের গল্পে বলেছিলুম না তাদের কথা? তিতিরের বিকেল মানেই তাড়াতাড়ি দুধ-টুধ খেয়ে নিয়ে, একটা ফুটবল কি ক্রিকেট ব্যাট কি ছোট্ট টেডি বগলে নিয়ে নিচে গিয়ে হাঁকডাক করে তাদের বাইরে আনা। তারপর সেই নানা বয়েসী খুদেরা দঙ্গল ব্যাডমিন্টন কোর্ট জুড়ে দাপাদাপি করে বেড়ায় অন্ধকার না হয়া অবধি।

কি যে খেলে তা বলা ভারি মুশকিল। মানে ক্রিকেট ব্যাট দিয়ে এরা বোধহয় ক্রিকেট ছাড়া আর সব কিছু খেলে ফেলতে পারে, গদার মত ব্যাট বাগিয়ে মারামারি, মাটি-বালির পাহাড় বানিয়ে তাতে ব্যাট পুঁতে দিয়ে পতাকা বানানো, মায় কনুই এর ওপর ব্যাট ব্যালান্স করতে করতে হাঁটার কম্পিটিশন অবধি। কিংবা ফুটবল হয়ে যায় উটপাখির ডিম। কিংবা তিতিরের টেডি আর সজলের ডাইনোসরের মধ্যে মুংলি বনাম শের খান টাইপের যুদ্ধু চলে।

আবার কোন কোন দিন, খেলার জের বাড়ি অবধি গড়ায়। মানে হয়তো বৃষ্টি এসে গেছে, কিংবা খেলে আশ মেটেনি, তিতিরের সাথে তার কোন বন্ধুও বাড়ি এসে হাজির হয় আরো খেলবে বলে। আমি অবশ্য তাতে ভারি খুশি হই, তারাও কেন জানি না আমায় আরেকটা খেলার সাথী হিসেবেই গণ্য করে। কিন্তু মাঝে মাঝে নাজেহালও কিছু কম হই না এসব দিনে। কিন্তু সেটা বলার আগে আরেকটা ভারি মজার কথা মনে পড়ে গেল এই বন্ধুর খেলতে আসা নিয়ে, সেটা আগে লিখেছি বলে তো মনে পড়ছে না – টুক করে বলে নিই?

তিতির তখন ছোট। স্কুল যাচ্ছে সদ্য। হিন্দি ভাষাটা একেবারেই বলতে পারে না, অতি সামান্য বোঝে। তার এক বন্ধু মিহির এসেছে খেলতে। সে বাংলা জানেই না, বলা বাহুল্য। সে আবার তিতিরের চেয়েও আমার সাথে খেলতে বেশি ভালবাসত, আর ভাষাসমস্যাটাও ছিল, তাই আমিও তখন ওদের সাথে খেলতুম। তা আমি একটা খেলনা কুমীর নিয়ে পা টিপে টিপে তার পিছন থেকে আসছি, উদ্দেশ্য মহৎ, চমকে দেব – তিতির ভারি শশব্যস্ত হয়ে তাকে গিয়ে বলল, ‘পিছনমে দেখো, কুমীর আয়া! তুমকো ভয় দেখাতা হ্যায়।”

ছেলেটি কিন্তু দিব্যি বুঝে গেছিল কি বলা হচ্ছে!

এইবার এখনকার গল্প। আগের হপ্তায় না তারো আগের হপ্তায় কবে যেন, বাড়ি ফিরেছি গলদ্ঘর্ম হয়ে। বস্তা বস্তা মালপত্তর নিয়ে, কি সে আর এখন মনে পড়ছে না, হবে কিছু বাজার টাজার, এসে দেখি সজল তার মনীষাদিদির সঙ্গে এসেছে তিতিরের সাথে খেলতে। আমার যেমন মায়া দেখে তিতিরকে, সজলকে তার মনীষাদিদি সামলায়। সজল বেশ একটা গুন্ডা ছেলে, মনীষা ভারি নিরীহ শান্ত মেয়ে, কাজেই সজল মনীষাদিদিকে সামলায় বললেই সঠিক হয় আসলে।   

তো সেসব মালপত্তর রেখে টেখে একটু ভাবলুম একটু বসি, জিরিয়ে নিই। আরে ভাই বয়েস হচ্ছে তো! ও মা, বেশ করে ভিতরের ঘরে বিছানায় গিয়ে গা এলিয়ে দিয়েছি কি দিইনি, পিছন থেকে খিঁক খিঁক করে হাসির আওয়াজে পিলে চমকে গেল। ঘুরে তাকিয়ে দেখি, খাটের পিছনে সরু ফাঁকে সজল উবু হয়ে বসে প্রাণপণে হাসি চাপার চেষ্টা করে যাচ্ছে। বুঝলুম লুকোচুরি খেলা চলছে এদের।

পিঠ ফেলার আশা পরিত্যাগ করে বসার ঘরের সোফায় গিয়ে বসতে গেছি, দেখি সোফা আর ডিভানের মাঝের খাঁজে মনীষা গুটিশুটি মেরে অদৃশ্য হয়ে থাকার কঠিন সাধনায় মগ্ন। আমার চোখে চোখ পড়তেই সে বেচারী এমন লজ্জা পেল, আমি আর সেখানে বসা উচিত বোধ করলুম না।

বারান্দার দিকে এগোতে গিয়ে মায়ার গলা পেলুম ‘ফাইব, সিক, সেবেন...’ মানে তিনি চোর হয়েছেন এবং বারান্দায় দাঁড়িয়ে গুনছেন। বিশ্রামের আশা জলাঞ্জলি দিয়ে ফ্রেশ হতে গেলুম, কি বলব মশাই বাথরুমটা অবধি বেহাত! সেটার দরজা ‘একটুকু ফাঁক করে’ তিতির কচ্ছপের মত মুন্ডু বাড়িয়ে দেখছে আন্টি ধরতে এল কিনা।

এর পরও লোকে বলবে আমার সহনশীলতা কম?

    তবে আজ বৃষ্টি পড়ছে ঝমাঝম। তিতিরের মন ভাল নেই, নিচে খেলতে যেতে পারছে না, জল কাদায় বন্ধুরাও কেউ আসতে চাইছে না বাইরে। জানলা ধরে সোফার পিঠে উঠে বসে আছে আর আপনমনে সেই ছড়াটা বলছে, যেটা আমরাও ছোটবেলায় বলতুম ছাতের দরজায় দাঁড়িয়ে – ‘যা বৃষ্টি ধরে যা/লেবুর পাতায় করমচা’।

    দেখছি, মায়া হচ্ছে, ভাবছি নতুন কি খেলা বানানো যায়, এমন সময় তিতিরের প্রশ্ন, “মা!! লেবুর পাতা কি কাপের মত?”

একটু সময় লেগেছিল, তারপর বুঝলাম তিতির ছড়াটা বুঝেছে ‘লেবুর পাতায় গরম চা’। যুক্তিগ্রাহ্য প্রশ্ন! মানেটা ঠিক বুঝিয়ে দিতে খুব হাসল মেয়ে। তারপর আবার জানলা ধরে বসে ঠিক করে শেখা ছড়াটা বলতে লাগল।

মনটা কেমন করে উঠলো, কেন জানি না অপু দুগ্‌গাকে মনে পড়ে গেল।  আর মনে পড়ল নিজের ছোটবেলা, এইরকম জানলা ধরে পাশের মাঠের দিকে চেয়ে বসে থাকা, সেই একলা, সরল, গল্পের বই বুকে নিয়ে কাটানো দুপুরগুলো। ভালবাসার দুপুরগুলো।

তিতির, কবে বই পড়তে শিখবি রে মা! আরো কত্ত কিছু খেলা বাকি আমাদের, সব কি আর আমি শেখাতে পারব, না বন্ধুরাই পারবে! ঐ বইগুলো ডাকছে যে!

 

Saturday, 20 August 2016

শিশুপালন



    রোববারের সকালবেলা, মাছটাছ এনে, তিতিরকে লেখাপড়া করিয়ে, জামাকাপড় কাচতে দিয়ে, বেশ একটা ‘অ্যাচিভমেন্ট’  মার্কা প্রশান্তি মনে নিয়ে সবে চায়ের কাপ নিয়ে বসে কাগজটি খুলেছি কি খুলিনি, সমাধি হয়ে গেল। মানে, ধুপধাপ করে ঘাড়ে পিঠে কোলে গুচ্ছের স্টাফ্‌ড টয় এসে পড়ল, আমি তাদের তলায় সেই E.T.র মত মুন্ডুটুকু বাদে বাকিটা চাপা পড়ে গেলুম
    “দিম্মা! ও দিম্মা!”
    দিম্মা এখন নেই, কলকাতা গেছেন। সুতরাং চোখ তুলে দেখি তিতির ফিকফিক করে হাসতে হাসতে আমাকেই ডাকছে।
    এবার চোখ পাকাতে হল। মেয়ে ফাজিল চূড়ামণি জানি, তাই বলে মাকে দিম্মা বলে ডাকবে!
    তিতিরের তড়িঘড়ি ব্যাখ্যা, ‘আমি না, আমার বেবিটা ডাকছে তো। তুমি আমার মা না? তাহলে তুমি আমার বেবির দিম্মা হলে তো!’
    হক কথা! আর এহেন প্রোমোশনের পর আর কাগজ পড়ার মত তুচ্ছ কাজ কি করা যায়, বলুন? তাকিয়ে দেখি, বেবিটা একটা ছোট্ট পিঙ্ক টেডি বিয়ার, তাকে আবার অন্য কোন একটা পুতুলের পেন্টু পরানো হয়েছে আর একটা পিচবোর্ডের বাক্সে শোয়ানো হয়েছে। বাক্সশুদ্ধু আমার কোলে ফেলে দিয়ে বেবির মা প্রবল আহ্লাদে সারা ঘর হেলেদুলে লাফিয়ে বেড়াতে লাগল।
    “তুই অমন লাফাচ্ছিস কেন? মা কখনো ওরকম কিলবিল করে দেখেছিস?”
    “আমি তো পুঁচকে! ছোট্ট আছি না এখনো? বেবির থেকে বড়, কিন্তু তোমার মত বড় তো নই!”
    অকাট্য যুক্তির সামনে পড়ে, অতীব গাম্ভীর্য সহকারে বেবির মুখাবলোকন করা ছাড়া কিছু করার থাকল না। দিম্মা যখন হয়েছি, কিঞ্চিৎ কাজ করে দেখাই, ভেবে তাকে বেশ করে কোলে তুলে দোল দিতে লাগলুম। তিতির ডিভানের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে ঠিক একটা মাগুর মাছের মত, ল্যাজের অভাবে পা নাড়াচ্ছিল, আমার এহেন স্নেহময় কর্মে কেন জানি না তার খুব আপত্তি হল। তড়াক করে উঠে বসে বলল, “বেবি ঘুমিয়ে পড়বে তো। এখন ঘুমোলে খাবে কি করে?”
    উফ্‌! দোল থামিয়ে দিয়ে খাওয়ানোর চেষ্টা করব ভাবলুম। একটা গোল বাটিপানা খেলনা দেখতে পেয়ে সেটা নিয়ে বেশ জুত করে বসেছি, আর ভাবছি, সত্যিকারের বেবিটিকে খাওয়াতে কিরকম প্রাণপাত পরিশ্রম করতে হত..তিতির হঠাৎ দেখি আমার কানের পাশে ফোঁশ ফোঁশ করে নিঃশ্বাস ফেলছে।
    “কি হল রে?”
    “ঐটা নিয়েছ কেন? ওটা তো বেবির চানের মগ!”
    “অ্যাঁ! এটা তো দিব্যি একটা বাটি!”
    “তো আমার ঐ সাইজের মগ নেই তো। তাই আমি ওটা চানের মগ করেছি। ওটা থেকে কেউ খায়? আর চান করেনি কিছু না, খাবে কেন এখন?”
    হাল ছেড়ে দিয়ে বললুম, “তাহলে কি করব? আমায় ডাকলে কেন?”
আমার ছোট্ট মাতৃদেবীর বোধহয় আমার মুখ দেখে মায়া হল, আমার কোল থেকে টেডিকে তুলে নিয়ে নানাবিধ কায়দায় তাকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে খেলা করতে লাগল। ঠান্ডা জল হয়ে যাওয়া চা-টা এক চুমুকে শেষ করে আবার কাগজে মন দিয়েছি, বেশ মন দিয়ে পড়ছি, হঠাৎ হাঁউমাউ করে ‘উরি বাবারে উরি বাবারে’ – সেই সাথে টেডি কাগজ ভেদ করে আমার কোলে নিক্ষিপ্ত হল।
আমি তো আঁতকে উঠেছি।
    “কি হল রে?”
    “ইঁহ্‌হ্‌!!! বেবি পটি করে দিয়েছে, তুমি পোষ্কার কর।”
    আমি আপিশ গেলে, তিতিরকে আমাদের মায়ারানী আগলান। তিনি তখন রান্নাঘরে প্রবলবেগে রান্না করছিলেন। এমনিতে, তাঁকে পাঁচবার ডাকলে তিনি আধবার শুনতে পান। এখন, কি করে কে জানে, তিতিরের মুখনিঃস্রৃত ‘পটি’ শব্দটি তাঁর কর্ণগোচর হল। হওয়ামাত্র তিনি খুন্তি টুন্তি ফেলে ঊর্ধবঃশ্বাসে তেড়ে এলেন, “চলো চলো বাথরুমে চলো শিগ্‌গির!”
    বিপন্ন তিতির ও হতভম্ব আমি যতক্ষণে তাকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে উঠতে পারলুম, ততক্ষণে তিতির বাথরুমের দরজায় পৌঁছে গিয়ে মায়ার সাথে কুস্তি লড়ছে। আমার কথা শুনে, একটা এত ক্ষিপ্র ও এফিসিয়েন্ট এফোর্টের এরকম অপচয় দেখে মায়া ভারী ব্যাজার হয়ে রান্নাঘরে ফিরে গেল।
    তারপর তিতির আর আমি সোফায় পাশাপাশি পা ঝুলিয়ে বসে খুব হাসলুম। আমার কোলে শুয়ে, বিক্কুট খেতে খেতে টেডিও হাসল খুব। বিশ্বাস না হয়, এই দেখ তার ছবি।

 
 

Sunday, 14 August 2016

পেঁপেগাছের গল্প



রাত নিঝঝুম। বাড়ির আলো নিভেছে সব।
বিষ্টি বিষ্টি ঠান্ডা হাওয়া। কিন্তু মাথার ওপর ফুল স্পীডে পাখা চলছে, কারণ মশারি খাটানো হয়েছে।
মশারি, মানে ঘরের মাঝে ঘর। তার মধ্যে মা আর পুঁচকেপানা মেয়ে। তার কিলবিল করা আর ফুরোচ্ছে না। একবার মায়ের হাঁটুর ওপর ঠ্যাং তুলে দেয়, তো পরক্ষণেই মুন্ডু দিয়ে কাঁধে গোঁত্তা মারে। নিজের হাতটা নিয়ে তার নতুন অভিনেতার মত সংশয় আছে, কোথায় রাখবে ভেবে পায় না – ফলে নাকে, বুকে, পেটে সর্বত্র থাবড়া খেতে থাকি।
সেই সঙ্গে, সরু সরু গলায় বায়না, “গঁপ্প বঁলো...”
এই অবধি রোজের গল্প। এরপর আমি কোনদিন মরুভূমির (মরুভূমির কথা বলতে গেলেই জনসন আর রনসনকে কেন মনে পড়ে কে জানে!), কোনদিন মহিষাসুরের (এইটা একটা যা-তা  আজগুবী সিরিজ হচ্ছে। বলব পরে কখনো), কোনদিন অলিম্পিক্সের (কারেন্ট অ্যাফেয়ার্সও জানা উচিত, বলুন?) – মানে যেদিন যা মনে আসে সেই গল্প শোনাই তাকে।
আজ একটু অন্যরকম হল।
আমি কিছু বলার আগে, তিতির নিজেই বলে উঠল, “আমার মাথায় আজ প্রচুর ব্যাটারি আছে। ইলেবেন ব্যাটারি। আজ আমি গল্প বলব।”
নিজের সৌভাগ্যে চমৎকৃত হয়ে দু্কান খাড়া করে ফেললুম তৎক্ষণাৎ।
কিসের গল্প বলব?”
“যা খুশি, বল না!”
“না। কি নিয়ে বলব বলতে হবে। এমনি এমনি বলব না।”
মাথা কি আর কাজ করছে তখন! সেই সক্কাল সাড়ে সাতটায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছি, সারাদিন ধরে আপিশে ঘোড়াড্ডিমে তা দিয়ে, তাপ্পর এক ঘন্টা বাস জার্নি করে এসে, ড্রাইভিং লেসন নেবার নামে ট্রেনারের হৃৎকম্প করিয়ে দিয়ে, সংসারের চাট্টি জিনিস কিনে আর চাট্টি ভুলে গিয়ে, বাড়ি ফিরে তিতিরের হোমটাস্ক করিয়ে, তার সাথে নর্তনকুর্দন করে, ডিনার পর্ব সেরে বিছানায় শোবার পর টুপ করে ঘুমে তলিয়ে যেতে ইচ্ছে করে না? যাইহোক, ওই যেগুলো আনতে ভুলে গেছি সেগুলোই মাথায় ঘুরছিল তখন। বলে ফেল্লুম, “একটা পেঁপেগাছের গল্প বল দিকি!”
“পেঁ-পে-গাচ!?” সরল চোখে বিস্ময় আর উৎসাহ মায়ের বিদঘুটে বায়না শুনে। দ্যাখ না দ্যাখ গল্প শুরু।
“একটা না, পেঁপেগাছ ছিল। ব-ড়ো পেঁপেগাছ।”
“কোথায় ছিল?” ব্যাগড়া দিয়ে ফেলি।
“ছিল? ছিল হচ্ছে...বলছি...ছিল রিলির দেশে।”
“অ্যাঁ? কোথায় বললি?”
“রিলি দেশে।”
আমার ঘুমকাতর মস্তিষ্ক ধাঁধার গন্ধ পেয়ে সজাগ। এটা কি বাংলা বর্ণমালা চেনার ফল?
“তিতির... ঋ-৯ দেশে? বাংলা ঋ-৯?”
“আরে না! রিলিইই দেশে, যেখান থেকে একটা দিদুন আমায় ফোন করে!”
বুঝে নিই।
“দিল্লি?”
“হ্যাঁ। ঐ রিলি দেশে ছিল তো পেঁপেগাছটা। তো রিলি দেশে না বুঝলে ভয়ানক ঠান্ডা পড়ে। একদম বরফ পড়ে যায় পেঙ্গুইন আর সীলমাছ দের দেশের মত। তাই পেঁপেগাছটার খুব ঠান্ডা লাগে।”
“তারপর?”
“তারপর...এই সব ছোট ছোট বাচ্চা আছে না এখানে? এই আমি, মিহির, বয় সজল, গার্ল সজল, সৌম্যা – আমরা সবাই গেছি ওখানে।”
(সত্যি ই দুটো সজল আছে বাড়িতে, একটা ছেলে আর একটা মেয়ে)
“বেশ তো। গিয়ে কি করলে?”
“আরে ঠান্ডা তো? আমরা বাচ্চারা মোটা মোটা জ্যাকেট পরে গেছি। আর গিয়ে বলছি ‘পেঁপে খাব, পেঁপে খাব’, কিন্তু গাছটায় একটাও পেঁপে হয়নি। ঠান্ডা বলে হয়নি। তাই আমরা খুব বায়না করছি কিন্তু কিচ্ছু হচ্ছে না। তখন আকাশ থেকে একটা পরী এসে ম্যাজিক করে দিল আর এত এত মিষ্টি পেঁপে হল গাছটায় আর আমরা ইয়াম ইয়াম করে খেয়ে চলে এলুম – হয়ে গেল গপ্পো।”
রেলগাড়ির স্পীডে গল্প শেষ।
“ও তিতির, এটা না খুব ভাল গল্প হয়েছে। এটা আমি লিখে রাখব কেমন?”
“হ্যাঁ। লিখে রেখো না!”
দমাস করে একটা পা এসে পড়ল পেটের ওপর।
“আমি কিন্তু এখন আর গল্প বলতেও পারব না শুনতেও পারব না, আমার ব্যাটারি ফুরিয়ে গেছে।”
এবং বিনা বাক্যব্যয়ে তিনি ব্যাটারি চার্জ করতে লেগে গেলেন, মানে ঘুমিয়ে পড়লেন, আমার একটা হাত ফোনের তারের মত মাথায় ঠেকিয়ে, আঁকড়ে ধরে।

Monday, 1 August 2016

আপ্যায়ন


    এই পর্বটার নাম হওয়া উচিত ছিল “‘বাড়িতে গেস্ট ডাকিবার বিপদ’ অথবা ‘নির্‌মাল্লো বধ’”। না না, বধ করে ফেলেনি সেই অর্থে, তবে বশ করেছে বিলক্ষণ।

     নির্মাল্য একটি আদ্যোপান্ত খাসা ছেলে, আমার ভাতৃতুল্য। বেশ কিছুকালের আলাপ, এই ফেসবুকেই এবং তিতিরপাখির গল্পের সূত্রেই, তা সে পাকাপাকি বোম্বের পাট গুটিয়ে পালানোর তোড়জোড় করছে শুনে বললুম, ‘একদিন আসবিনি?’

     আমার এমন স্নেহময় ডাকের টানেই হোক, কি সেই সঙ্গে খিচুড়ি ইলিশভাজার লোভ দেখিয়েছিলুম বলেই হোক, সুবোধ বালকটি ঠিক সময়মত চলে এল এক ঝিরিঝিরি বৃষ্টির সন্ধেবেলা, সাতিশয় লাজুক লাজুক মুখ করে।

     তারপর টেডি বিয়ারে রূপান্তরিত হল।

     মানে তিতির, এহেন গাবলু গুবলু মামাটিকে, তার খাস তালুকের সম্পত্তি বিবেচনায় সেই যে বগলদাবা করল, ডিনার টাইমে তাকে খেতে না বসানো অবধি আমরা আর নির্মাল্যর সাথে কথা বলার কোন সুযোগই পেলাম না!

     এই অল্পসময়ে নির্মাল্যর কিন্তু প্রভূত শিক্ষালাভ হল, যথা –

     ১) প্লাস্টিকের সাপ দিয়ে কি করে ভয় দেখাতে হয়
     ২) ব্যাঙএর মত কি করে চলতে হয়
     ৩) ন্যাড়ামুন্ডু পাজামা পরা ডলপুতুলকে কি করে কোলে-পিঠে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে হয়
     ৪) কিভাবে মায়ের ট্যাবিতে গেম আনতে হয়
     ৫) আটটা বাজলে ঘড়ির কোন কাঁটা কোন ঘরে থাকে
     ৬) কিভাবে হামাগুড়ি দিয়ে চেয়ারের তলা দিয়ে টেবিলের নিচে ঢুকে আবার অন্যদিকের চেয়ারের তলা দিয়ে বেরিয়ে আসতে হয়

     ইত্যাদি প্রভৃতি।

     মোদ্দা, দুই শিশুর জমেছিল ভাল।

     আমিও অবশ্য কিছু শিক্ষালাভ করলুম। যেমন গেস্টের সাথে কথা বলার আশায় মেয়েকে ট্যাবে খেলার অনুমতি দেওয়া বৃথা। ট্যাব এবং গেস্ট দুই-ই হাতছাড়া হয়ে যায় সে চেষ্টা করলে

তার চেয়েও জরুরি হল, তিতিরকে শেখাতে হবে যে আপ্যায়ন করতে বলা মানে, পিছন থেকে পা টিপে টিপে এসে তার কানের গোড়ায় আচমকা ‘ভালঅঅ করে খাও!!!’ বলে চেঁচিয়ে ওঠা ন!

যাইহোক, এইসব উৎপাত মামাটি হাসিমুখে সহ্য করল (বলেছি তো ভারি ভাল ছেলে)। তারপর তিতির আর তাকে যেতে দিতে চায় না! খালি বলে, ‘তুমি থাকো, তোমার ছাতাটা বাড়ি চলে যাক!’

শেষ অবধি আমার সাথে নিচ অবধি গিয়ে মামাকে বিদায় জানিয়ে আসতে পারবে, এই প্রতিশ্রুতি পেয়ে রাজি হল। তো, লিফটে উঠে দেখি মেয়ের জামার বেল্ট থেকে একটা মাছধরা ছিপ ঝুলছে। জিগ্যেস করাতে তিনি খুব লজ্জা লজ্জা মুখ করে জানালেন যে তিনি কিনা একটু আগে ডগি সেজে ঘুরছিলেন, তাই ওটা তাঁর ‘ল্যাজ্‌’।

ওমা, লিফট থেকে নামার সময় দেখি ছিপটা খুব করে ফ্রকে চাপা দিচ্ছে।

‘কি হল রে?’

‘না বাবা, এখানের আসল কুকুরগুলো যদি আমার ল্যাজ দেখে আমার সাথে ঝগড়া করে?’

তাও তো কথা! সুতরাং ঐ কোঁচড়ে ল্যাজ নিয়েই পেল্লাই চিৎকার করে মামাকে ‘টা টা’ করা হল, তারপর একটাও আসল ডগি দেখে ফেলার আগেই আমরা পাঁই পাঁই করে ঘরে পালিয়ে এলুম।

নির্মাল্যও ওদিকে পাঁই পাঁই করে পরিত্রাহি পালিয়েছিল কিনা সেটা অবিশ্যি জানি না! দেখতে পেলে, জিজ্ঞেস করবেন তো!

Saturday, 9 July 2016

মৌমাছি


আজ বাড়িতে একটা ইয়াব্বড় মৌমাছি ঢুকে পড়েছে

    না সত্যি মৌমাছি নয় তিতির সকাল থেকে মৌমাছি সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছে একটা লাল রঙের বালি আঁচড়ানোর খন্তা কোমরে গুঁজেছেসেটা নাকি মৌমাছির হুল।

    “মৌমাছিটা না, খুব রাগী। কেউ দুত্তুমি করলেই হুল ফুটিয়ে দেয়।”

    ডেমো দিয়ে গেল আমাদের সবাইকে একবার করে হুল ফুটিয়ে। মৌমাছির আবার রাগ হয় হুলের খোঁচা খেয়ে আর্তনাদ না করলে!

    বেশ খানিকক্ষণ চুপচাপ। খেলার ঘরে প্রচুর কার্যকলাপ চলছে টের পাচ্ছি, কিন্তু শনিবারের সকাল, গুচ্ছ গুচ্ছ সাংসারিক কাজ, তাছাড়া আপনমনে খেললে আমরা পারতপক্ষে ‘ডিট্টাব্‌’ করি না।

    হঠাৎ রান্নাঘরে এসে হুলুস্থুলু আবদার, “আমি হানি খাবো! ফুল থেকে হানি খাবো – আমায় একটা বিরাট বড় ফুল এনে দাও!”

    “ও বাবা, তুই হানি খাবি তেমন ফুল কোথায় পাব রে! তুই কৌটো থেকে হানি খা না, চামচ করে? পু বিয়ার এর মত?”

    “নাহ্‌! মৌমাছি কখনো পু বিয়ার হয়? মৌমাছি কখনো কৌটো থেকে হানি খায়? কিচ্ছুই জানো না!”

    বিপদে পড়লুম। কথা ঘুরিয়ে, অন্য গপ্পো টপ্পো বলে, মাথা থেকে হানি উড়িয়ে দেওয়া গেল অবশ্য। ইন ফ্যাক্ট, তিতিরের মাথা থেকে মৌমাছিই উড়িয়ে দেওয়া গেল।

    কিন্তু, তার বদলে এবার বাড়িতে একটা বাজপাখি ঘুরে বেড়াচ্ছে সেটা আবারভাল বাজপাখি তোমাদের কিচ্ছুই করতে হবে না

    এরকম ঢালাও প্রশংসা শুনে একটু সন্দেহ হয়েছিল, জিগ্যেস করেছিলাম, “বাজপাখিটা কি খায় রে?”

    চট্করে ভেবে নিয়ে, কাঁধ ঝাঁকিয়ে মেয়ের জবাব,

    পোকা টোকা খায় নিজেই ধরে নেয় ওসবতোমার কোন চিন্তা নেই

    সেই থেকে আমাকেও শ্যেনচক্ষু হয়ে পাহারা দিতে হচ্ছে, কি জানি যদি ঘরে  কোনোপোকা টোকাবাজপাখির সামনে এসে পড়ে!

Sunday, 3 July 2016

লন্ডনের টুকিটাকি


   

  সব্বার আগে জলদস্যুর গল্পটা বলে নিই। সেই যে কেন্সিংটন গার্ডেনে জাহাজ – পাইরেট শীপ –  দেখল? দেখে এসে অবধি তো তিতিরের মাথায় ওটা ঢুকে গেল রোজ জাহাজের গল্প চাই শুতে গিয়ে তো আমি গল্প শোনাতে শোনাতে শোনালুম জলদস্যু কি

 
    ব্যাস পরদিন থেকে আমাদের খেলার তালিকায় জলদস্যু হই হই করে ঢুকে গেল বিছানার এক প্রান্তে বালিশগুলো জড়ো করে জলদস্যু তিতিরের জাহাজ, আর অন্য প্রান্তে একটা ধুমসো লেপ পাট করে রেখে আমার সম্পত্তি জাহাজ সম্পত্তি রকমারি, কোনদিন হীরে মুক্তো মণি মাণিক্য’, কোনদিন কাপড় চোপড় জুতো মোজা’, কোনদিন রাশি রাশি খেলনা একদিন জাহাজ ভর্তি তেজপাতা ছিল মানে যেদিন জলদস্যুর যা লুঠ করার বাসনা আর কি!
 
    খেলার নিয়ম আছে মনে রেখ, ভ্যাবলা ক্যাবলা ভালমানুষ বণিক জাহাজ নিয়ে মনের সুখে যেতে যেতে (জাহাজ চালাতে চালাতে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে গান গাওয়াটা বাধ্যতামূলক) আচমকা দেখবে পাশের জাহাজ হাড়গোড় আঁকাকালো পতাকা (অভাবপক্ষে রান্নাঘরের তোয়ালে) তুলেছে, মানে জলদস্যু তখন সে ভয়ে খুব জোরে জাহাজ ছুটিয়ে পালাতে চেষ্টা করবে, কিন্তু পারবে না, অমিত বিক্রমে জলদস্যু তার জাহাজ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়বে এই জাহাজে (তাক ঠিক না রাখতে পেরে টাল খেয়ে গেলে বণিকই তাকে ধরে ফেলবে, তাতে হাসির কি হয়েছে শুনি!)
    তারপর হবে যুদ্ধু! জলদস্যুর হাতে ‘কাসল’ থেকে কেনা নরম রবারের তলোয়ার, বণিকের সম্বল মেকানো সেট দিয়ে বানানো তরোয়াল যার আবার মাঝে মাঝে স্ক্রু ট্রু ল্যাগব্যাগ করে খুলে যায়। যুদ্ধুর শেষটা অবশ্য র‍্যান্ডম আজ তিতির জেতে তো কাল আমি একদিন দুজনেই দমছুট হয়ে একসাথে হার মেনে ফেল্লুম তখন তিতিরের পরামর্শে জাহাজের মাল আধাআধি করে রফা করা হল কি সাম্যবাদী মেয়ে বলো দিকি!
  এবার উজানদাদার বাড়ির গল্প বলি এট্টু। আমার বন্ধুর ছেলে উজান। আমরা বেশ কয়েকদিন তাদের বাড়ি গেছিলুম এর মধ্যে। তিতির তাতে যেমন উজানদাদার ভক্ত হনুমান হয়েছে, উজানও তেমনি খুদে শিষ্য পেয়ে বেশ খুশিই হয়েছিল। তিতিরকে বগলদাবা করে, তার প্রিয় খেলা দাবা শেখাতে বসেছিল বিজ্ঞ দাদা। কিন্ত তিতির হল ‘কামারের এক ঘা’ পার্টি। বেশ খানিকক্ষণ ধৈর্য ধরে নিয়মগুলো শোনার পর যেই শুনল রাজা আটকে গেলেই খেলা শেষ, অমনি রাজাটিকে টপ করে তুলে পকেটে ভরে ফেলবার চেষ্টা করছিল। বেরসিক মায়ের হস্তক্ষেপে সেটা হল না। তারপর ঘোড়াগুলোয় চাপা যায় কিনা, গজ মানে হাতির কেন শুঁড় নেই সেসব গবেষণা করল, শেষে বোড়েগুলো নিয়ে ‘ভিন্ডি ভাজা’ রাঁধার চেষ্টা করছে দেখে উজানদাদা তার শিষ্যর দাবা প্রতিভা সম্বন্ধে হতাশ হয়ে রণে ভঙ্গ দিল।
  খাসা দাদু-দিদুনও পেয়েছিল তিতির উজানদাদার বাড়ি পেথথমবার এসে ভাব করে গেসল, পরের বার এসে তো পুরো গলাগলি দোস্তি হয়ে গেল দেখি দাদু যাই বলছেন তিতির সেটা নার্সারি রাইমের সুরে শুনিয়ে দিচ্ছে, ফলে দিদুন হেসে কুটিপাটি, রান্না করতে যেতেই পারছেন না আর দাদু বেচারি স্পীকটি নট তবে তাতে রাগ করার বদলে দেখি দাদু আরো তিতিরভক্ত হয়ে গেলেন, দুজনে মিলে ডাইনোসরের পিঠে কিভাবে স্পাইডারম্যানকে চড়ানো যায় যাতে পড়ে না যায়, সে গবেষণায় লেগে পড়ল
  সেইবারই, উজানদাদা স্পেসশীপ বানিয়ে দেখিয়েছিল তারপর সায়েন্স মিউজিয়ামে গিয়েও আমরা রকেট, স্পেসশীপ এসব দেখলুম তিতির মুগ্ধ তারপর রাত্রিকালীন মা-মেয়ের আলাপচারিতা এই প্রকার
“আমি না, বড় হয়ে স্পেসশীপ চাপব
চেপে কোথায় যাবি?
আমি দূ-উ-র থেকে পিথিবি দেখব। আথথ!
“বাঃ”
“দেখব পিথিবি কেমন লাট্টুর মত ঘোরে
“বেশ তো
“আর স্যাটানেও যাব স্যাটানের কোমরে একটা বেল্ট আছে না? আমি বেল্টটার ওপর দাঁড়াব
“ওরে বাবা! আচ্ছা ঠিক আছে যাবি
“যাবই তো! আমি হুশ করে পেসসিপ চালিয়ে দেব স্যাটানের দিকে
“আর মঙ্গলগ্রহ? রেড প্ল্যানেট?
কি জানি কেন তিতিরের মঙ্গলকে পছন্দ হল না
“নাঃ! আমি আর যাব হচ্ছে চাঁদের বাড়ি মুন
ভেরি গুড। সে তো যাওয়াই যায়।
“স্পেসশীপে চাপলে কি আমারও মাথায় শিং গজাবে?
“অ্যাঁ? শিং?
“ওই যে কারঠুনে দেখায় না? মাথায় কাঁচের গামলা পরে আর তার থেকে শিং বেরোয়?
“ওহ হেলমেট আর অ্যান্টেনা? তা দরকার হলে থাকবে বইকি!
“আমার শিং চাই এক্ষুণি!
আলোচনা বিপজ্জনক মোড় নিচ্ছে দেখে কথা ঘোরালুম
“স্পেসশীপে যেতে হলে কিন্তু অনেক পড়াশোনা করতে হবে তিতির খুব ভাল করে
“তোমার মত বড় হলে?
“না মা, এখন থেকেই
“করব তো! মা স্পেসশীপ কি করে লেখে?
বানানটা বললুম
“আমি কাল থী জিরো থাট্টি বার পেসসিপ লিখব তুমি দেখিয়ে দেবে কেমন?
অতঃপর আমার ছোট্ট নভোচারী ঘুমের দেশে পাড়ি দিল কে জানে কোন গ্রহে!