আচ্ছা, আপনারা চিঠি লেখেন? হাতে, পেন বা পেন্সিল দিয়ে, কাগজটাগজে?
না মনে হয়। আমরা কিন্তু লিখি। আমরা মানে আমি আর তিতির। কুট্টি কুট্টি কাগজে, বিলের উলটোবাগে, আমাজনের মোড়ক-ছেঁড়া পিজবোর্ডে, এরকম যাতে হোক অহর্নিশ আমাদের চিঠি লেখালেখি হয়।
উঁহু। পেরাইভেট ব্যাপার বাপু। অমন "দ্যাঁকাও দ্যাঁকাও! বলো বলো!" করে ঝুলে পড়লেই তো আর হল না! বরং চিঠি লেখার টেকনিকটা শেখো।
সবার আগে জানতে হবে, উদ্দেশ্যটা কী। মানে এমনি এমনি, নাকি কিছু একটা বায়না সুপ্ত রয়েছে অক্ষরমালার পরপারে, নাকি আড়ির পালা চলছে তাই মানভঞ্জনপ্রক্রিয়া।
আজ্ঞে। আমরা দুজন, তিতিরের ভাষায়, যাকে বলে পরস্পরের "বেস্ট ফ্রেন্ড"। বললে পেত্যয় যাবেন না তিনি ইদানীং আমায় "ব্রো" বলে সম্বোধন করছেন, কারণ বেস্ট ফ্রেন্ডদের নাকি সেরকম সম্বোধন করাই দস্তুর। ব্যাপারটা পি জে মাস্ক না ইউনিকর্ণ কাদের থেকে শেখা হয়েছে জানি না, কিন্তু তার ফলে আমায় লাগাতার কম"ব্রো"মাইজ করে যেতে হচ্ছে।
তো, যা বলছিলুম। বেস্ট ফ্রেন্ডরা যেমন গলাগলি করে গল্প করে, চুপি চুপি সব সিক্রেট শেয়ার করে এবং নিয়মিত ব্যবধানে ঝগড়াঝাঁটি করে কথা বন্ধ করে দেয় - আমরাও করি। হ্যাঁ ভাই, জানি আমি বুড়োধাড়ি মাম্মা, তা বলে বুড়িয়ে যেতেই হবে এটা কে বলেছে! কাজেই আমাদের মাঝেমধ্যেই মিনিট দশ বারোর মুখ দেখাদেখি বন্ধ চলে। খানিক খ্যাঁচাখেঁচির পর সাধারণত তিনি দুম দুম করে বগলে পুতুল নিয়ে রাগের চোটে আমার চটি পরেই পাশের ঘরে চলে যান, আর আমি সাড়ে চারবার ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে নাক টেনে নিজের কাজে মন দিই।
তারপর হয়তো মন দিয়ে নাক বেয়ে ঝাঁপ দেওয়া চশমা সামলাতে সামলাতে কম্পিতে কাজ করছি, হঠাৎ একটা ভাঁজ করা কাগজ উড়ে এসে কীবোর্ডের উপর পড়ে। ভাঁজ খুলেই দেখা যায় ভাব করার শর্ত এসে গেছে। সাধারণত এক্স সংখ্যক আদর ও হামিতেই ব্যাপার মিটে যায়। তেমন তেমন কেস হলে ললিপপের বা আইসক্রিমের ছবি থাকে।
আবার কখনো হয়তো এমনি এমনি চিঠি আসে। বি উলটোলে ডি হয়, কিংবা জানলায় একটা কাক বসেছে, এ ধরণের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খবরও পেয়েছি চিঠি মারফত। আমি নিজেও যে ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ খবর-টবর দিইনি তা নয়। এই চিঠি লেখা নিয়ে বিভ্রাটও যে হয়নি এক আধবার তাও নয়। যেমন ধরুন, এটা বছরখানেক আগের কথা হবে, অসন্দিগ্ধ মা চিঠি খুলে "আই অ্যাম রেস্টিং ইন পিস" পড়ে বিষম টিষম খেয়ে ছুটে গিয়ে আবিষ্কার করেছিল ওটা পিছনে দুটো বালিশ দিয়ে আধশোয়া হয়ে ঠ্যাঙের উপর ঠ্যাঙ তুলে বসে পা নাচাতে নাচাতে "ক্যালভিন অ্যান্ড হবস" পড়ার অবিমিশ্র আনন্দদশার তৈত্তিরীয় ইঞ্জিরি। অথবা, অনেক পাঁয়তারা মেরে চিঠি ভাঁজ করে রকেট বানিয়ে, খাটে বসে থাকা কন্যাকে দরজার আড়াল থেকে ছুঁড়ে সারপ্রাইজ ডেলিভারি করতে গিয়ে সেটা জানলা গলে ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে যাবার পর মায়ের খেয়াল হয় যে ওই কাগজটার উল্টোপিঠে সদ্য আধ ঘন্টা আগেই রান্নাঘর তদারক করে তিনি মুদির ফর্দটি বানিয়েছিলেন।
কিন্তু কখনো কখনো এরকম পত্রালাপ ভারি বিমূঢ় করে দেয়, জানেন।
এই লকডাউন টাইন নেই যখন, তখনকার কথা এটা অবশ্য। নতুন বাসায় নতুনভাবে সব গুছিয়ে নিচ্ছি তখন। মেয়ের নতুন বড় সাইজের সাইকেল কিনে এনেছি গত সপ্তাহে, আবার গতকালই এসে গেছে তার নতুন পড়ার টেবিল চেয়ার - মায়ের সেটটার হুবহু কপি, খালি রং আলাদা। অফিসফেরত দেখি মেয়ে সেই সাইকেলে হু হু পাক খাচ্ছে বিকেলে, সেই চেয়ার টেবিলে বসে মন দিয়ে ছবি আঁকছে, হোমটাস্ক করছে - আর মনটা ফুরফুরে হয়ে যায়। তো সেদিন রাতে ঘরের আলো নিভে যাওয়ার পর, শুয়ে পড়ার পর, টের পেলুম ছোট্টটা খুব কসরৎ করে ঘুমন্ত আমার বালিশের নিচে কীসব যেন ঢোকাল। পোড় খাওয়া মা হলে যা হয়, টের পেলেও, টের পেতে দিইনি যে জেগে আছি।
পরদিন তিনি ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথম কথা, "মাম্মা, তোমার বালিশটা উলটে দ্যাখো।"
আমি অবাক হওয়ার ভান করে বালিশ তুলে দেখি একটা ট্যারাব্যাঁকা ছেঁড়া কাগজ, তাতে লেখা "love and kiss", আর কাল বাড়ি থেকে কাজ করার অনুরোধ, আর একটা ১০ টাকার কয়েন।
বাকি দুটো তো বুঝলুম। কয়েনটা কেন?
জিজ্ঞাসা করে জানলুম, এই নতুন সাইকেল ও পড়ার টেবিল কিনে দিতে আমার প্রচুর টাকা খরচ হয়ে গেছে নিশ্চয়, তিনি তাই তাঁর পিগিব্যাঙ্ক থেকে বার করে এনে দিয়েছেন...লাগলে আরো দেবেন, আমি যেন একটুও চিন্তা না করি, "আরো আছে মা!"
হাসব না কাঁদব বুঝতে পারিনি জানেন। গলাটা খুব ব্যথা করেছিল খালি। বলা বাহুল্য, ও কয়েন আমার আলমারির লকারে ভেলভেটের বাক্সে তোলা আছে।
এক ছোট্টপানা বকবকমবাজ মেয়ের, আর তার সঙ্গে তার মায়ের নতুন করে বড় হবার গল্প।
Showing posts with label house. Show all posts
Showing posts with label house. Show all posts
Sunday, 12 July 2020
Sunday, 17 November 2019
এক নিরীহ রোব্বারের বিকেল
কাউকে কিচ্ছু করিনি মশাই! মনের আনন্দে একটা নিরীহ নিরুপদ্রব রোব্বারের বিকেল কাটাচ্ছিলুম। ভাতঘুম দিয়ে উঠে, রান্নাঘর হাঁটকে দুরকম আচার দু বাটিতে খাবলা করে এনে, কোলে তাকিয়ে নিয়ে বসে পালা করে সে দেবভোগ্য জিনিস চাখছিলুম আর একটা হেব্বি ভয়াল ভয়ংকর বই পড়ছিলুম। পাশের বেডরুম থেকে ফায়ার অ্যালার্মের চেয়েও বিকট জোরে হাঁক এলো।
"মাআয়ায়ায়ায়ায়ায়া! পাঁঁখাটা খুঁলে গেল!!!"
বিষম খেয়ে, আচারের চামচ ছুঁড়ে ফেলে, বালিশ উলটে দে দৌড়। মনে অবশ্য কূট প্রশ্ন জেগেছিল, যে এরকম নিঃশব্দে পাখা কী করে পড়ে যায়, তবে কি পাখার সত্যিকারের পাখা গজিয়ে উড়ে গেল?
হেসে লাভ নেই। এবাড়ির যা বীর বাতাস, প্যাকেট ভর্তি ওষুধ বা রান্নাঘরের কৌটো অতীতে বাতায়নপথে হাওয়ায় উড়ে গেছে। পাখার পক্ষী হওয়াই বা অসম্ভব কিসের!
তা, গিয়ে দেখি, সত্যিই খুলে পড়ে গেছে বটে। পড়ে গিয়ে শুধু যে তার একটা ব্লেড তেড়েবেঁকে গেছে তাই নয়, তার নিচে থাকা সাধের তিনকোনা টেবিলটাও দু টুকরো হয়ে গেছে!
বহু কষ্টে, বহু মাথা খাটিয়ে সেসব সারিয়ে সুরিয়ে সবে আচারের কাছে ফিরতে যাব, পচ্ করে জলে পা পড়ল।
কাঁহাসে জল আয়া রে বাবুয়া?
তদন্ত সমাপনান্তে বোঝা গেল বাথটব লিক করছে। সবে এই সকালেই ফিক্স করা হয়েছে, এর মধ্যেই তার দেহ রাখার দশা দেখে মেজাজ গেল চড়াং করে গরম হয়ে। যন্তরপাতি নিয়ে আবারও লেগে পড়লুম। এ ব্যাপারে আমার কন্যা আমার যোগ্য সহযোগী, তাকে টেপ চাইলে পেনসিল দেয়, দড়ি চাইলে আঠার শিশি। ঘাড় ব্যথা করে, সেসব পুলটিস মেরে, লীকপ্রুফ করে তবে উঠেছি, তিনি গলায় সওয়া চামচ মধু ঢেলে বললেন, "কমোডটাও হেলে গেছে মনে হচ্ছে, মাঁায়ায়া!"
এইবার ভারি রাগ হল। এটা বাড়ি, না দক্ষযজ্ঞ নৃত্যাভ্যাসের পাঠশালা? অ্যাঁ? এটা মেয়ে, না আখখুটে আবদাল্লা? বলি, সব ঘরদোর পরিপাটি করে রেখে, ভালো করে দেখে তবে ঘুমোতে গেছি, আর এর মধ্যেই কিনা এত কিছু বিগড়ে রেখেছে!
কপাল! কপাল! মনে মনে চোখ বন্ধ করে "দীনবন্ধু কৃপাসিন্ধু কৃপাবিন্দু বিতরো" গাইতে গাইতে কমোডবাবাজীকে সিধে করলুম, তারপর চোখে পড়ল দেওয়াল ঘড়িটা চলছে না, তার কাঁটা ঘুরিয়ে দিলুম, গ্যাস সিলিন্ডার লাগালুম, সিঁড়ির ধাপে গাছ বসালুম। তারপর মনে হল, তখন থেকে মনে হচ্ছে আলমারিটা ওই দেওয়ালে মানাচ্ছে না, এতই যখন করলুম ওটাই বা আর বাদ যায় কেন!
এত কাজ মানুষে করে, বলুন তো? তাও রোব্বার বিকেলে?
আবার মিনমিন করছেন কেন?
আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেছে? আমার কর্মকুশলতায় তো?
অ্যাঁ, না? ওই পাখা পড়া...বিপজ্জনক?
দূর মশাই! ওটা কোনো বিপদ হল! ওর চেয়ে ঢের ঢের বেশি বিপদ হতে যাচ্ছিল আজ, তা জানেন?
"ম্যাঁ, এইখান থেকে নিয়ে নিচ্ছি বুঝলে, কিছু টের পাওয়া যাবে না।"
এই মোক্ষম সময়ে মা যদি তার লেখার অতল থেকে কান বাড়িয়ে কথাটা শুনে না ফেলত, যদি তার মগ্নচৈতন্যে প্লটের পিন্ডি চটকে এর অর্থ মরমে না পশিত, যদি সে হাঁ হাঁ করে ঝাঁপিয়ে পড়ে কন্যার হাতের উদ্যত কাঁচি কেড়ে না নিত - তো ঘরের বাহারি ফুলেল পর্দার কোমরের কাছে জন্মের শোধ দু ইঞ্চি বাই দু ইঞ্চি সাইজের দুটো গর্ত হয়ে যেত। হুঁঃ!
অবশ্য, তাতে ডলহাউসের জানলার পর্দা ঘরের পর্দার সঙ্গে ম্যাচিং ম্যাচিং হত।
নিন, দেখুন দিকি, কেমন দাঁড়াল মা মেয়ের হাতের কাজটা?
Tuesday, 24 July 2018
গপ্পোগাছা
ইনি হচ্ছেন আমার কন্যা,
দাদুমণি-দিম্মার নান্নি। তাঁদের দুজনের ছোটবেলা আমি উঁকি মেরে দেখতে যাইনি বটে,
তবে এটুকু মনে আছে আমি জ্ঞান হবার আগে থেকে তাঁদের মুখে গল্প শুনছি, আর নিজে প্রথম
গল্প বানিয়েছিলুম বছর তিনেক বয়েসে। চিত্রসহযোগে।
“কোথাও কেউ নেই, চারিদিকে জঙ্গল,
তার মধ্যে একটা মাছ।“
আর প্রথম গল্প ‘লিখেছিলুম’ এই
তিতিরের এখনকার চেয়েও ছোট বয়েসে। ক্লাস ওয়ানে সম্ভবত। সেটা বলব নাকি? বলব?
“এক রাজা ছিল, তার নাম চম্পা।
আর তার মন্ত্রী ছিল, তার নাম ছিল রামমোহন দাস। একদিন রাজা আর মন্ত্রী সভায় বসে পরামর্শ
করছে, এমন সময়ে দাসী এসে বলল, রানীমা বলেছেন লাল শাড়ি নেব, নীল শাড়ি নেব, হলুদ শাড়ি
নেব, গোলাপী শাড়ি নেব, বেগুনী শাড়ি নেব না।
তাই শুনে রাজা বললেন, রানীরা
অমন বলেই থাকে!”
এতটা ভয়ানক ভবিষ্যদর্শী নাহোক,
তিতিরও মুড হলেই গল্প বানায়। তবে নীচেরটা, তার মুখে শুনলেও, তার গল্প নয়। তিনি
নাকি “হুবহু” এটা স্বপ্ন দেখেছেন।
---
আমি সাইকেল চালাতে চালাতে একটা বিল্ডিং দেখলুম। আমি যেমন বিল্ডিং ব্লক্স
দিয়ে বানাই।
সেটাতে দাদুর হাত ধরে ঢুকে দেখি মুরগীর ঘর। মুরগীরা লাইন দিয়ে রাশি রাশি ডিম পেড়ে রেখেছে।
সেটাতে দাদুর হাত ধরে ঢুকে দেখি মুরগীর ঘর। মুরগীরা লাইন দিয়ে রাশি রাশি ডিম পেড়ে রেখেছে।
এরপর উঠতে উঠতে দেখলুম একটা স্পাইডার। ইয়াব্বড় নেট বানিয়েছে। আমি না, লাফিয়ে
সেটা পেরিয়ে গেলুম। কিন্তু দাদু লাফাতে পারছিল না তাই আবার ফিরে এলুম।
এরপরের তলায় উঠে দেখি একটাও জানলা নেই। দম কোথা থেকে নেবে! দাদু বলল পাখা
আছে তা বলে।
এরপর আরো উপরে, শূন্য,ছাত নেই। বাড়ি শেষ হয়নি।
তারপর না, পা ফস্কে গ্রাউন্ডে পড়ে গেলুম। অ্যালিসের মত। কিন্তু সেখানে এত
এত পিল্লো রাখা ছিল, তাই আমার একটুও লাগল না।
এরপর ‘হঁঃ’ করে উঠে বসে দেখলুম নিজের বিছানায়ই আছি। তখন বুঝলুম স্বপ্ন দেখছিলুম।
----
পুনশ্চ – এইটে লেখার সময় একজন আমার টেবিলে এসে বসলেন, দুধের গ্লাস নিয়ে, উচ্চকিত গলায় গান গাইতে গাইতে।
ভাষাটা বুঝলাম না। জিগালুম। বললেন, “আমি ‘মারাঠী’ গান গাইছি।”
মারাঠী ভাষাটা যে একেবারে জানি না তা না। কিছুই বুঝতে পারছি না দেখে চিন্তিত হয়ে পড়লুম। বহুকাল অনভ্যাসে ভুলে যাচ্ছি মনে হয়। থাক, এ যখন পড়বে তখন আমিও ঝালিয়ে নেব আবার নাহয়।
বুঝতে পারছি না বুঝে, তিনি আমায় বেশ কিছু শব্দের মানেও বলে দিলেন। একটাও আগে শুনিনি। কথ্য শব্দ হয়তো।
“কে শিখিয়েছে রে তোকে? শচীন? না সরিতা?”
তিনি ততক্ষণে দুধ শেষ করে ফেলেছেন। উঠে, গ্লাসটা বেসিনে রাখতে যাবার আগে বলে গেলেন,
“না, ওদের তো আমিই শেখাই।”
ধাঁধা লেগে বসে আছি, দরজার কাছে থেকে তাঁর আরো ব্যাখ্যা,
“মাম্মা, ওদেরকেও না, মানে বলে বলে দিতে হয়। গানগুলো আমি নিজে নিজে বানাই কিনা...”
Labels:
Bangla,
bedtime,
Bengali,
blog,
Bombay,
cartoon,
child,
childhood,
doll,
house,
Indoor play,
play,
story,
Story-telling,
Titir
Monday, 21 May 2018
মিষ্টু
একটা না, ভারী মিষ্টি মেয়ে ছিল। তার নাম ছিল মিষ্টু।
তার মিষ্টি মুখে মিষ্টি হাসি ছিলো, মাথায়
কোঁকড় কোঁকড় চুল ছিলো এক থোপা, চশমার আড়ালে ঝকঝকে দুটো খুশি-খুশি
চোখও ছিল।
আর ছিলো এই এত্তখানি রাগ। গাল ফুলোনো, নাক দিয়ে ধোঁওয়া, কান দিয়ে আগুন বেরোনোর মত এক্কেবারে ফ্রেশ, চনমনে
রাগ। সে রাগের সামনে তার মা বেচারী কাঁচুমাচু, আর টুপমাসি
‘পার্মানেন্ট আড়ি’ খেয়ে কুপোকাৎ!
কেন? ওমা, রাগ হবে না! তার
টুপমাসি যে বেহদ্দ জেলিফিশ! তাকে গল্প লিখবে প্রমিস করে বেমালুম ভুলে তো গেছেই, আবার বলছে নাকি কী কী হয়েছিল সেদিন সেটাও ভুলে মেরে দিয়েছে! এরকম
বেয়াক্কেলে মাসিমণিকে নিয়ে কী করা যায় তোমরাই বলো! মিষ্টু কি যে সে নাকি, মিষ্টু হ’ল তিতিরপাখির গল্পের সবচেয়ে ছোট পাঠক যে
কিনা আবার কমেন্টও করে! আর প্রমিস ইজ প্রমিস! যারা প্রমিস করে এরকম ভুলে যায় তাদের
নাকে যেন বারোমেসে সর্দি হয়!
তো সেদিন কী হয়েছিল জানো?
সেদিন মিষ্টু না, তার মায়ের সঙ্গে গেছিল তিতিরপাখির
সঙ্গে দেখা করতে। দুখানা কাছাকাছি সাইজের টর্ণেডো একসাথে ছেড়ে
দিয়ে দেখেছো কী হয়? মিষ্টুর মা সেদিন হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে তার
এমনিতে লক্ষ্মী শান্ত বুঝদার কন্যা, যোগ্য চ্যালার হাতে পড়লে
‘মা কী ছিলেন আর মা কী হইয়াছেন’ গোছের
ব্যাপারস্যাপার হয়ে যেতে পারে।
প্রথমে ডল হাউস নেমে পড়ল। এইটে তিতিরের মা সদ্য তিতিরকে কিনে দিয়েছে, তাই
এখনো মোটের ওপর আস্ত আছে ব্যাপারটা। খানিক পরেই দেখা গেলো, অ্যালিস
যেমন সেই চাবির ফুটো দিয়ে একচোখে উঁকি মারছিল, এরা দুটোতে
সেরকম মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে, ডলহাউসের ফার্নিচার সেট করছে। না বাপু,
কমোডটা কে বসিয়েছে আমি দেখতে যাইনি – যেই হোক সে যে তারপর হাত ধোয়নি এটা নিয্যশ
বলতে পারি।
তারপর, প্লে ডো বের হ’ল। এটা মিষ্টু নিয়ে এসেছিল বোনুর জন্য। কত রকম রং! তা দিয়ে
একটা ইয়া লম্বা সারা ঘর পাক খেয়ে খেয়ে বানানো ল্যাজ তৈরী হ’ল। না মোটেই আমার নয়। ও নির্ঘাৎ মিষ্টুর মায়ের
হবে, সেই
মাঝখানে থেবড়ে বসে ছিল কিনা!
তারপর কত কিছু যে বানানো চলল প্লে ডো দিয়ে! হাঁস,
শজারু, ত্যারাব্যাঁকা কুমির, প্রজাপতি, হ্যান ত্যান প্যান। তার কিছু কিছু মিষ্টুর
মায়ের মুখে আটকে আটকে তাকে ‘সাজগোজ’ করানোও
হ’ল। তারপর বড়রা একটু নিজ নিজ কাজে মনোনিবেশ করেছে, ওমা
হঠাৎ হুলুস্থূলু!
“আমার ডাক কই গেলো!”
তিতির হলুদ প্লে ডো দিয়ে হাঁসের ছানা বানিয়েছিল। সে আপন খেয়ালে কখন কোথায়
ভেসে গেছে। কিন্তু তা বললে কি আর সে শোনে! বালিশ
সরিয়ে, খাটের নীচে উঁকি মেরে, মিষ্টুর বগলে
- কোথাও খুঁজে না পেয়ে সে মিষ্টুর মা বেচারীকে খপ করে ধরল,
“তুমি আমার ডাক এর ওপর বসে পড়েছো!”
বলেই তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে তার পাৎলুনের তলায় হাত দিয়ে
উত্তোলন প্রচেষ্টা শুরু করে দিল। তাও আবার এক হাতে!
তা, মিষ্টূর মা কিনা আড়েবহরে তিতিরের মাম্মার চেয়ে
সামান্যই কম, আর তিতিরও গোবর গণেশ, ভীম
ভবানী এসব কিছু তো নয় – তাই হাজার টানাটানি করেও পাৎলুনের একটা
অংশ ছাড়া কিছুই তোলা গেলো না। বিরসবদনে তিতির তখন আন্টির ওড়নাটা খুলে নিয়ে মন দিয়ে
একটা ‘পাগগি’
বানাতে বসে গেলো।
তারপর আরো কত কিছু যে হ’ল সে আমরা বড়োরা ভুলে মেরে দিয়েছি। মানে ঘরের মধ্যে অত তাঝঝিম
মাঝঝিম চললে কি আর মনে রাখা যায়! খালি মনে পড়ছে মিষ্টু একবার তিতিরকে
পিঠে ঘোড়া হয়ে বসতে বলেছিল। বলামাত্র তিতির যে হালুম করে লাফিয়ে বসে পড়বে সেটা
বোধহয় সে ভাবেনি। খানিক পরে খুব মিহি গলায় দেখি বলছে, “যা
ভেবেছিলুম, এ যে তার চেয়ে বেশি ভারি!”
তারপর আরো আরো আরো খেলা হ’ল। আলুচ্চপ খাওয়া হ’ল,
যদিও কলকাতার আলুচ্চপ নাকি বোম্বের চেয়ে বাজে (হে ঈশ্বর, কোনদিন বলবে বড়াপ্পাও পৃথিবীর সেরা খাবার!) আরো কী কী সব গোপন গল্প হ’ল দুজনের সেসব আবার আমাদের
মানে বড়োদের শুনতে মানা। না শুনে কী করে গল্প লিখব জিগ্যেস করব ভেবেছিলুম, কিন্তু
কেউই কিনা আমাদের পাত্তা দিচ্ছিল না তাই আমরাও ওদের পাত্তা দিইনি।
যাবার সময়ে বেশ একটু মন খারাপ হচ্ছিল দু পক্ষেরই। বেশ কান্নাকাটি করার
মত মন খারাপ।
কিন্তু সবচেয়ে বিপত্তি হয়েছিল মিষ্টুর মায়ের। দুই কন্যার আবদারে, তাকে
ঐ ‘পাগগি’টা মাথায় দিয়েই সারা পাড়ার চোখের
সামনে বাড়ি থেকে বেরোতে হয়েছিল কিনা!
Subscribe to:
Posts (Atom)



