Sunday, 4 March 2018

হ্যাণ্ড স্যানিটাইজার


বসে বসে ঝাঁটা দেখছি।

চতুর্দিক ঝাঁটাময়।

নাঃ, ঝাঁটার দোকান দিইনি। যদিও চারদিকে যা জঞ্জাল, দিতে ইচ্ছে করে মাঝে মাঝে। তারপর বঙ্কিমের সেই অবিস্মরণীয় পংক্তিগুলো মনে পড়ে যায়,
'
তোর মুখ তো নয়, ঝাঁটা!'
'
আর তোর মন আস্তাকুঁড়, এত ঝাঁটা চালিয়েও সাফ ' না।'
স্মৃতি থেকে উদ্ধৃত, ভুলত্রুটি মার্জনীয়।

সে যাক, কিন্তু এখন বিদ্যানিকেতন সম্মার্জনী-শোভিত।

ফ্যান্সি ড্রেসের অনুষ্ঠান। এগুলো আমাদের সময় কেন যে তত চল ছিল না কে জানে। আমার কত্ত দিনের সাধ ছিল একবার স্পাইডারম্যান সাজার! সে আর ইহজীবনে না গো! তিতিরও মাম্মা-কাট পাবলিক, তিনি চেয়েছিলেন ডোরা দ্য এক্সপ্লোরার সাজতে। কিন্তু জানা গেল এমনি ওমনি ফ্যান্সি ড্রেস নয়, থীমপুজোর মত এও থীমাধারী।ক্লিনিং মেটিরিয়ালসএর ওপর সাজতেই শুধু হবে না, কিছুক্ষণ বক্তৃতাও দিতে হবে।

থীম শোনামাত্র তিতিরের ঘোষণা, “আমি ন্যাতা হবো।

ন্যাতা? মানে ঘরমোছা ন্যাতা? সে কী করে বানাবো, আর হয়ে বলবি কী?”

ঐত্তো কাপড় মুড়ে ঝুলিয়ে দেবে, আর আমি বলব ন্যাতা দিয়ে ঘর মুছুন! বলে মেঝেতে গড়িয়ে গড়িয়ে লুটোপুটি খেয়ে দেখিয়ে দেব।

মানসচক্ষে দেখতে পেলুম, হল ভরা বাচ্চা কাচ্চা, তাদের কারো বাবা, কারো মা, কারো দাদা-নানা-নানী কেউ, কারো কারো কচি কচি ভাইবোন, তটস্থ টিচাররা, স্কুলের গম্ভীর মাথারা, প্রধান অতিথি কোনো গণ্যমান্য ব্যক্তিসবার বিস্মিত বিস্ফারিত চোখের সামনে আমার কন্যা স্টেজের প্রান্ত থেকে প্রান্ত শুয়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে; হলভর্তি লোকের ঠা-ঠা হাসি কানে এসে ধাক্কা মারল।

এই না না, স্টেজে কোথায় কী নোংরা আছে ঠিক নেই, ওসব গড়াগড়ি হবে না।

তিতিরের মুখ মেঘাচ্ছন্ন। বোঝা গেল ঐটির লোভেই ন্যাতায়িত হতে চেয়েছিল। মনের দু;খু কাটাতে পাশবালিশটাকে সাপটে ধরে খাটেই গড়াগড়ি খেতে লাগল।

ওদিকে আমি আকাশ-পাতাল ভাবতে লাগলুম। কী বানানো যায়! সাফ করার সরঞ্জাম ঝাঁটা ন্যাতা ছাড়া আর কী হয়, দেব নাকি ঘরমোছা বালতি করে? বা ভীম বার? লাইফবয় সাবান? ঝুলঝাড়ু? এইটে বেশ মনে ধরল, কিন্তু মুম্বইতে তো জিনিসটার চলই নেই, বুঝবে তো বিচারকরা?

পরদিন গুটিকয় বন্ধুকে জিগালুম। একজন বললে ওয়াশিং মেশিন, সেটা বেশ পছন্দ হল। খাটনি কম, একটা চৌকো বাক্স পরিয়ে দিলেই হবে, আর সামনে গোল ঢাকনা খোলা বন্ধ। কিংবা ভ্যাকুয়াম ক্লীনারও করে দেওয়া যায়, বেশী খাটার ইচ্ছে হলে।

অফিস থেকে আসতেই মেয়ে যথারীতি কোমর ধরে ঝুলে পড়ল তার ভুবনমোহিনী ফোকলা হাসি নিয়ে।

ম্যাঁ!!! আমি ফ্যান্সি ডেসে (ফুকলি তো, উচ্চারণ পিছলে যায়) নাম দিইচি!”

খুব ভালো করেছ মা। আমায় ব্যাগটা রাখতে দাও এবার।

অমনি আমার ব্যাগ কেড়ে নিয়ে কাঁধে করে, তার পা দিয়ে ঠেলা গাড়ি চড়ে সে দাদুমণির কাছেঅফিসচলে যায়। যাবার আগে বাণী ছেড়ে যায়, “আমি না, হ্যাণ্ড স্যানিটাইজার হবো বলেছি।

ধুপ করে ডিভানে বসে পড়ি। নাহয় দুদিন আগেই মেয়েকে স্কুলব্যাগে রাখার জন্য একটা পুঁচকে মিকি মাউস আঁকা হ্যাণ্ড স্যানিটাইজার এনে দিয়েছি, তাই বলে সেটাই বলে এলো!

ঢাকনা কী করে বানাবো রে বাপু!

কিন্তু বলে যখন এসেছে, তখন করতে হবে। একটা লম্বাটে শেপের প্যাকিং বাক্স পড়ে ছিল অনেকদিন, সেটা বধ করে বোতলের বডি হবে ঠিক করে নিই। ঢাকনা হবার উপযুক্ত কিছুর সন্ধানে রান্নাঘরের তাক, খাটের নীচ, আলমারির মাথা ঘেঁটে ফেলি, তিতিরের খেলনার ঝুড়ি হাঁটকিয়ে আমার বহু বহু কানের দুলের একপাটি উদ্ধার করে ফেলি যেগুলোর অন্য পাটি আমিরেখে কী লাভবলে কিছুকাল আগেই বিসর্জন দিয়েছি, পাড়ার দোকান তছনছ করে দিয়ে আসি। শেষে কিছু ফালতো কার্ডবোর্ড খুঁজে পাই, যা দিয়ে, হুঁ হুঁ, আর সঙ্গে ওই যে রান্নাঘরের তাকের নীচে সরিয়ে রাখা থার্মোকলের প্লেট, হুঁ হুঁ, আর থার্মোকলের বাটিও, হুঁ হুঁআইডিয়া হয়ে যায়।

তারও পর কত যে কাজ থাকে! বাক্স মাপমত কেটে সাইজ করা, ঘুরন্ত দুরন্ত মেয়েকে ধরে এনে এনে মা নেওয়া, তারপর তার বাক্স পরা অবস্থাতেই পোঁ করে পালিয়ে যাওয়া, আবার ধরে এনে বাবা বাছা করে বাক্স উদ্ধার, তারপর তাতে কাগজ মারতে গিয়ে কাগজ কম পড়ে যাওয়া, আবার দৌড়ে দোকান গিয়ে রঙ মিলিয়ে কাগজ কিনে আনা, তারপর তাতে ছবি আঁকা লেখা, তারপর সাংঘাতিক কৌশল করে কার্ডবোর্ড পাকিয়ে (আবার ব্রাউনিয়ন মোশনে ঘুরে বেরানো মেয়ের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে মাথার মাপ নিয়ে নিয়ে) মাথা ঘিরে শিশির ঢাকনা বানানো, তাতে নাক মুখের ফুটো কাটা, প্লেট আর বাটিতে কালো রঙ করা, ঢাকনার ওপর প্লেট আটকানো। তারপর তারো ওপর বাটিটা উলটো করে একদিকে লাগিয়ে দিতে সুন্দর টুক করে খোলা বন্ধ করার মত ব্যাপার হয়ে
গেলো।  এর সঙ্গে সঙ্গে, হ্যান্ড স্যানিটাইজার নিয়ে ছোট্ট ইংরিজি স্ক্রীপ্ট মেয়েকে বলতে শেখানো

সেরাত্রে তিতির ঢাকনা হেলমেটের মত মাথায় পরে ঘুমোতে চেয়েছিল। বহু কষ্টে আটকানো গেছে।

তো সেসব তো আগের দিনের গল্প। এখন হলে এসে বসে আছি সবাই, এই শুরু হল বলে অনুষ্ঠান। এবং বসে বসে ঝাঁটা দেখছি। সে যে কত রকমের ঝাড়ু ভাবা যায় না। কারুর খাসা হাতল আছে, কারো শুধুই ফুলঝাড়ু নেতিয়ে পড়ছে বুকের নিচে থেকে। কেউ খ্যাংরার কাঠি বেঁধে এসেছে কোমর ঘিরে। আহা কত নতুন ফুলঝাড়ু আর খ্যাংরা ধ্বংস হয়েছে এই সাজুগুজুর ঠেলায়! কেউ স্রেফ ঝাড়ুদার সেজে হাতে একটা আস্ত ঝাঁটা নিয়ে চলে এসেছে, এটা ভালো বুদ্ধি, ঝাঁটাটা অন্তত ব্যবহার করা যাবে পরে দেখতে দেখতেই পায়ে সুড়সুড়ি খেয়ে লাফিয়ে উঠতে হয়, আরো ঝাঁটা, এবং এটা সত্যিকারের। হল ঝাঁট দিচ্ছে স্কুলের মৌসি।

অনুষ্ঠান শুরু হবার পর দেখলুম, ঝাঁটা তো সংখ্যাগুরু বটেই, ডেটল সাবান আর ডাস্টবীনও নেহাত কম না। গুটিকয় ফিনাইলও ঘুরে বেড়াচ্ছে এদিক ওদিক। সবার মধ্যে অনন্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আমার হ্যাণ্ড স্যানিটাইজার, কালো ঢাকনার ফাঁক দিয়ে তার চম্পা পরা চোখ আর ফোকলা দাঁতের হাসি ঝলসে উঠছে বার বার।

ছোট্ট ছানাপোনা সব, স্টেজে উঠে প্রায় সবাইই মাঝপথে ভুলে যাচ্ছে, কিংবা খেই হারিয়ে ফেলে আধখানা বাক্য বলেই পরেরটায় চলে যাচ্ছে। সে খুব মিষ্টি ব্যাপার। কিন্তু কারো কারো বিপদ তার চেয়েও বেশী। কোমরে খাড়া খাড়া খ্যাংরা ঝাঁটা কাঠি ঘাগরার মতো করে বাঁধা বালকের বসার উপায় নেই, সারাক্ষণ একপাশে দাঁড়িয়ে থেকে থেকে সে গেল চটে। এক আপাদমস্তক ঢাকা চমৎকার ডাস্টবীন স্টেজে উঠতে গিয়ে আটকে গিয়ে যযৌ তস্থৌ হয়ে দাঁড়িয়ে গেল, বেচারি পা নাড়তে পারছে না। তাকে ডাস্টবীনের কবলমুক্ত করে মাইকের সামনে নিয়ে গিয়ে আবার ডাস্টবীন পরানো হল। তার চেয়েও মুশকিল হল এক রংচঙে ঝাঁটার, মাথার উপর দিয়ে খাসা গলিয়ে পরা ব্যাপার ছিল সেটা। মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে আবিষ্কার করল, চোখ নাকের ফুটো থাকলেও মুখের কোনো ফুটো কাটা হয়নি, ফলে কথা শোনা যাচ্ছে না। আবার তার মা দৌড়লো সেটা খুলে দিতে, কস্টিউম বগলে নিয়ে অতঃপর সে মেয়ে তার বক্তব্য পেশ করল।  

তিতির কিন্তু খাসা বলেছে মোটের ওপর। একটু মাঝে আটকে তো সবাই গেছে! তার চেয়েও মজার কাণ্ড কী হয়েছে জানো? ঠিক শেষদিকে এসে হাওয়ায় পুট করে উপরের বাটিটা উলটে গেছিল, ঠিক যেন কেউ স্যানিটাইজারের উপরের ক্যাপটা খুললো।

অ্যাঁ, রেজাল্ট? দূর, বাচ্চাদের শো। ওর আবার রেজাল্ট কী! সব্বাই জিতেছে, সব্বাই একসাথে মজা করে ছবি টবি তুলেছে, হই হই করেছে, দৌড়াদৌড়ি করেছে। হয়ে যাবার পর যে যার কিছু কিঞ্চিৎ ভাঙা তুবড়োনো কাঠি খুলে যাওয়া কি সেলোটেপ ঝুলে থাকা ক্লিনিং মেটিরিয়াল বগলদাবা করে বাড়ি ফিরেছি, কচিমুখের কলকল গল্প আর গালভরা হাসি সহ। এই আনন্দটুকু দেখার জন্য, একটা গোটা ছুটির দিনের খাটনি দিব্যি পোষায়, তাই না!

Saturday, 17 February 2018

মিঠিদিদি


  


“ও তিতির! অমন কিলবিল করিস কেন রে? ঘুম আসছে না?”

“উম্মম্মম্মম...গপ্পো বলো!”

“কিসের গপ্পো বলি বল? উটপাখি? আন্দামানের জারোয়ারা? নাকি সালোকসংশ্লেষের?”

মেয়ে নড়েচড়ে আরো ঘেঁষে আসে। পেটে কনুইয়ের খোঁচা খাই। কাতুকুতু লাগলে আরো বেশি করে জাপটে ধরা নিয়ম। তাতে আরো হাসি পায়, দুজনেরই। 

“তুমি না, বাচ্চা মাম্মার গল্প বলো। সেই যে টুম্পা ছাতে খেলা করছিল আর কাক এসে তার হাঁটু নিয়ে চলে গেল?”

“এই খবরদার তিতির, ও গল্প তুমি শুনে শুনে মুখস্থ করে ফেলেছ। আর আমি মোটেও অমন পচা গল্প বলব না, ওসব তুমি দাদুমণির কাছেই শোনো গে’!”

“আমার বেঁবির গপ্পো চ্চাঁই!”

“বেবি তিতিরের গল্প বলি, হ্যাঁ রে?”

মাথা নাড়ানোর চোটে চিবুকে মোক্ষম গুঁতো খাই। আমার আহত কাতরোক্তিতে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে ভদ্রমহিলা বলে বসেন, “ওসব তো আমিই বলতে পারি, তুমি আবার কী বলবে?”

এত গুল সহ্য হয় না আমার। “তোকে ছমাসে কেমন কোলে করে পায়চারি করে করে ঘুম পাড়াতুম আমি আর দিম্মা মিলে, সে গল্প তুই বলবি? বলতে পারবি? বাজে বকিস না!”

“হুঁ! ওই তো লম্বা বারান্দাটায় পায়চারি করতে করতে, এমনি এমনি করে দোলানো হত আর থামলেই তিতির পটাং করে চোখ খুলে জুলজুল করে তাকাত...”

রণে ভঙ্গ দিই। ব্যাটা দিম্মার কাছে সব গল্প শুনে মুখস্থ করে রেখেছে। আর কোন বেবির গল্প পাই ভাবতে ভাবতেই মনে পড়ে যায়...

জানি তো! আরেকজনের মজার কাণ্ডকারখানা। সে এখন ভারী লক্ষ্মী মেয়ে। কিন্তু মজাদার ছোটবেলার গল্প তো সবারই থাকে, এমনকী আট বছুরে খুকির-ও!

হাত পা সব দিয়ে সাপ্টে ধরে বলতে শুরু করি, “তোকে মিঠিদিদির গপ্পো বলি শোন। মনে আছে তো মিঠিদিদিকে?”

“হুঁউউউ! আমরা বাসের ছাতে চড়েছিলুম।“

ঠিক। ডিসেম্বরের ছুটিতে দুই কন্যার দেখা হয়েছিল সিটি সেন্টার টু তে, তারা খেলনা বাসের ছাতে চেপে চক্কর কাটছিল আর মিঠিদিদির বাবা, সোমনাথ তাদের পাহারা দিয়ে চক্কর কাটছিল, আর অর্পিতা আর আমি চুপি চুপি যত গোপন গল্প করে নিচ্ছিলুম সেই ফাঁকে!

“হ্যাঁ, তা শোন না, সেই মিঠিদিদি যখন খুদে ছিল...”

শুরুতেই পরম ব্যাঘাত। 

“মিঠিদিদি তো এখনও খুদে!”

“আরে ধ্যাৎ! মিঠিদিদি খুদে আর তুই ধেড়ে? তুইও খুদে তো...আচ্ছা বাপু নে, মিঠিদিদি যখন আরো খুদে, প্রায় বেবি ছিল তখনকার গল্প।“

“দুদুন খেত কোলে চেপে?”

“অ্যাইও! তুই গল্পটা বলতে দিবি, না বক্কেশ্বরীর মত বকবক করবি?”

মেয়ে ফিচিক ফিচিক হেসে চুপ করে।

“মিঠিদিদির মাম্মা না, মিঠিদিদির দিম্মার গোপালকে দেবে বলে একটা রুপোর থালা কিনেছে। পুঁচকে থালা। আর সারপ্রাইজ দেবে বলে মিঠিদিদিকে বলে দিয়েছে কাউক্কে যেন না বলে। কিন্তু মিঠিদিদির তো খুব বুদ্ধি, সে ঘাড় নাড়িয়ে তার মাম্মাকে বলে কি, ‘হয়নি, হয়নি, ফেল! গোপাল তো সব টের পায়, তুমি থালা কিনতেই ও জেনে ফেলেছে, তুমি আর ওকে সারপ্রাইজ দিতে পারবেই না!”

তিতির মজা পায়, তারপর ভেবেচিন্তে মন্তব্য করে, “আরে, কিন্তু সেই দিম্মা তো আর টের পায়নি! তাকে তো সারপ্রাইজ দেওয়া গেল, না? তুমি যেমন আমার পুতুলের জন্য চায়ের কাপ ডিশ কিনে এনে সারপ্রাইজ দাও তেমনি তো? বলো না মা, গোপাল-পুতুলের থালা পেয়ে সেই দিদুন কী বলেছিল? ইয়ে য়ে য়ে করে মিঠিদিদির মাম্মার কোলে উঠে গেছিল, আমি যেমন যাই?”

আমি স্বভাববশতঃ ব্যাপারটা কল্পনার চোখে দেখে ফেলি, ফেলে প্রবল মনের জোরে হাস্য সংবরণ করি। মেয়ে ততক্ষণে “আরেট্টা আরেট্টা” বায়না জুড়েছে।

“জানিস তো, মিঠিদিদি খুব ছোট্ট থেকে পড়তে পারে। (ওদিকে গম্ভীর গলার দাবি, আমিও পারি।) হ্যাঁ তুইও পারিস, কিন্তু শোন না। একটা শ্যাম্পু পাওয়া যায় বুঝলি, সেটার নামের বানান হ’ল বি-ই-ই-র...”

“বীর!”

আমার বীরাঙ্গনার সগর্ব উচ্চারণ। গল্পের শুরুটা মাঠে মারা যায় কারণ মিঠিও “বীর”ই পড়েছিল। যাকগে, পরেরটুকু বলি। 

“তারপর একদিন বাসে করে যাচ্ছে ওরা, আর একটা দোকানের সাইনবোর্ড দেখে মিঠিদিদির সারা বাস কাঁপিয়ে চীৎকার, ‘ঐ দেখো বাবার বীর শ্যাম্পুর দোকান’।”

“সবাই হাসল, মা?”

“হ্যাঁ তো। মজার না?”

“হুম। আচ্ছা মা, তুমি কোন শ্যাম্পু মাখো গো?”

অদূর ভবিষ্যতে গোলমাল আসন্ন টের পাই। ধাঁ করে পরের গল্পে ঢুকে পড়ি।

“মিঠিদিদি যখন প্রথম দুর্গাপুজো দেখে তখন তার বয়েস বছর দুই, বুঝলি। তোর মনে আছে তো, তোকেও একবার কলকাতা নিয়ে গেছিলুম দুর্গাপুজো দেখতে?”

“হুঁ, মঈশাসুর। মা, ও মা, মঈশাসুরের গল্প বলবে?”

“না এখন মঈশাসুরের গল্প বলতে পারব না। এখন মিঠিদিদির গল্প হচ্ছে। তা মিঠিদিদি শুনছে সবাই দুগগা মা বলছে...”

কান ফুটো হয়ে গেল। পাশের জন “দুগগা মাঈকি জ্য্য্যায়!” করে হাঁক পেড়েছে। 

“তো শুনে শুনে মিঠিদিদির মনে প্রশ্ন জেগেছে, দুর্গা কার মা? মিঠিদিদির মা তো বুঝিয়ে বলেছে...”

“লোক্‌খী সরসসসোতী কাত্তিক গণশা...”

“হ্যাঁ সে তো বটেই। মিঠিদিদির মা বলেছে, তারপর আরো সবার মা, এই চারদিকে যারা আছে, তোমার বাবা মা তুমি – সবার মা...তা মিঠিদিদি শুনে কী বলেছে জানিস? বলেছে, ‘আর সবার মা হচ্ছে ঠিক আছে, আমার মা নয় – আমার তো মা আছে!”

একটা কচি কচি হাত গলা জড়িয়ে ধরে। পরম পরিতৃপ্তির গলায় এক প্রাজ্ঞ বিজ্ঞ  অভিজ্ঞ ভদ্রমহিলা ছোট্ট মিঠিদিদির কথায় অনুমোদনের শীলমোহর লাগিয়ে দেন, “ঠিকই তো বলেছে! যাদের মা নেই, তাদের মা হোক দুর্গা মা। আমাদের তো নিজের মাম্মা আছেই!”

মিঠিদিদির মাম্মার কাছে এ গল্পটা শুনে প্রথমবার যেমন চোখের কোণ ভিজে গেছিল, আবার তেমন ভিজে ভিজে লাগে। ছোট্ট মানুষেরা, তোরা আছিস বলেই না আমার মত খুব সাধারণ মানুষরা দুর্গা-মা হয়ে ওঠার ম্যাজিকটা খুঁজে পেয়ে যায়!


Sunday, 4 February 2018

সাইকেল

দুপুরবেলা। খেয়েদেয়ে লম্বা হয়েছি। আজ কিনা আলুপোস্ত হয়েছিল, সেটা আবার তিতির খুব ভালবেসে চেয়ে চেয়ে খেয়েছে বলে আমি এবং তার আন্টি দুজনেরই দিল খুশ। তায় আবার খেতে খেতে তুতু-ভুতু পড়েছে, বগা পুলিশের কাণ্ড দেখে হি হি করে হেসেছে। ফলে দাদুমণিও দিব্য খুশ।
সদ্য গতকালই সাইকেলটা সার্ভিসিং করিয়ে এনেছি তাঁর। কাজেই ছোট্ট হৃদয় ঐ সিঁড়ির নিচের পিঙ্ক দ্বিচক্রযানে বাঁধা পড়ে আছে, আকুলিবিকুলি চলছে সাইকেল চালাতে যাবার। ইদিকে রাস্তায়্ একে রোদ ঝাঁ ঝাঁ, তায় দেখতে পাচ্ছি বাম্পারগুলোয় সাদা হলুদ ডোরা কাটা রঙ করার কাজ চলছে, দুজন উবু হয়ে বসে তুলি বোলাচ্ছেন। ভুলিয়ে ভালিয়ে রোদটা না পড়া অবধি কন্যাকে সাইকেল থেকে দূরে রাখতে হবে।
এমন ঝাঁ ঝাঁ রোদ ভরে থাকত সিঁথির দোতলার ছাতটাতেও। সেটা তখনো এমন গাছের টবে ভরাভর্তি হয়ে যায়নি। ফাঁকা জায়গায়, বোঁ বোঁ করে সাইকেল নিয়ে পাক খেত এইরকম ছ-সাত বছরের মেয়েটা। ঝাঁকড়া ঝুমরো চুল মুখেচোখে এসে পড়ত বলে মাঝে মাঝেই মাথা ঝাঁকিয়ে সরিয়ে নিত। উঁহু, তার এমন দেখনদার সাইকেল ছিল না। একটা তিনচাকা ছিল, কার বলো তো? তার দিদার ছোটবেলার। এক বাক্স পিতলের কুচি কুচি রান্নাবাটি আর আদ্যিকালের হারমোনিয়ামটার সঙ্গে সঙ্গে এই সাইকেলটাও সে উত্তরাধিকারে পেয়েছিল দিদা-বড়দিদার সেই কোনকালের ঢালা বিছানা, রঙীন কাচের জানলা আর রোজের লুচি-পরোটার জলখাবারের শিশুকাল থেকে।
এদ্দিন অটুট রইল কী করে? কী যে বলেন না! আগাগোড়া লোহার তৈরী তো, এখনকার প্লাস্টিকের ফঙ্গবেনে জিনিস নাকি! লোহার রড, বসার সীটের বেস, চাকা। দাদু যখন মাচার সম্পত্তি থেকে সেটা টেনে বার করে আনল, তখন কিঞ্চিৎ জীর্ণ মরচে ধরা দশা, সীট আর টায়ার গায়েব। ঘষেমেজে, তার উপর কটকটে আকাশী নীল রঙ করে, সীট টায়ার লাগিয়ে সেটা ছাতে তুলে দিয়েছিল দাদু। মা কলেজ যায়, মেয়ে বাঁই বাঁই করে নীল সাইকেলে চক্কর কাটে। তিনচাকা নিয়ে ব্যালেন্সের খেল খুব একটা সম্ভব হত না, কিন্তু স্পীডের যে কী নেশা! আর চাকায় নিয়মিত তেল দিতে ভুলে গেলেই ক্যাঁচ কোঁচ আওয়াজ। ঐ আওয়াজের জ্বালায় এরকম দুপুরে সাইকেল চালানোটা হত না মেয়ের, চুপি চুপি ছাতে গিয়ে শুরু করলেই হয় দাদু ঘুম ভেঙে ধমক দিত, নয় দিদা এসে ধরে নিয়ে যেত।
তা, আমায় ভুলিয়ে রাখা বড় সোজা ছিল। একটা আগে না পড়া আনকোরা বই হাতে ধরিয়ে দিলেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে অখণ্ড শান্তি। গল্পের বইয়ের অভাব হলে বাংলা ব্যকরণ বা মধুসূদন রচনাবলীও চলত।
কিন্তু আমার বুকে শেল হেনে তিতির এখনো গল্পের বইয়ে ‘নিজে নিজে’ বুঁদ হয়ে যেতে পারে না। তাকে গল্প শোনাতে হয়। কাজেই তাকে ভুলিয়ে রাখার অনেক ফন্দিফিকির করতে হয় এখনো।
“তিতির আয় আমরা অক্ষর দিয়ে ফুল-ফল-পাখি-জন্তু খেলি।”
“ইয়েয়েয়েয়েয়েয়ে!”
তিনটি ভিন্ন অ্যাঙ্গেলে ঝম্পপ্রদান খাটের ওপর। শেষেরটা প্রায় আমার পেটের মধ্যে।
নাগালে পেতেই, জাপটে সাপটে শুইয়ে ফেলি, “বল দেখি পি দিয়ে।”
“পি...পাইনাপল!”
“ফল হ’ল, এবার ফুল বল?”
“প্পপ্পপ্পপ্যারট্‌”
“আচ্ছা বার্ড হ’ল। ফুল?”
“পি ইউ এম এ পুমা!”
“আচ্ছা, অ্যানিম্যালও হ’ল। কিন্তু ফুলটা বল?”
“বুঝলে মা, প্যারট না, পেঙ্গুইন। আমি পেঙ্গুইন বেশি ভালবাসি।“
“ফুল মনে পড়ছে না, তাই তো?”
কিলিরবিলির করে মাথা দিয়ে গুঁতো আর ভুবনমোহিনী হাসি।
“কেন কত তো আছে, প্যানজি, পপি, দিম্মার বাগানে দেখেছিলি না?”
“হুঁউউউ...মাম্মা আমি না ফুল বলব না। কালার বলব হুঁ? পি দিয়ে পাপ্পল্‌!”
ফাঁকিবাজ কি সাধে বলি। যাই হোক আর দুবার এমন খেলার পর বিচ্ছুটা আমায় ‘কিউ’ দিয়ে বলতে দিল। তখন বাধ্য হয়ে অন্য খেলা আমদানি করতে হল। একটা মিনি কালারিং বুক পড়্রে ছিল, তাই হাতে ধরিয়ে বললুম, র‍্যাণ্ডম একটা পাতা খুলে যা ছবি পাবি সেটা আমায় শুধু বর্ণনা দিয়ে বোঝা, কিসের ছবি বলবি না আমি গেস করব। একদম নতুন গেম, সদ্য বানিয়েছি, তাই প্রবল উৎসাহে খেলতে লেগে গেল। এত বকবকানির মধ্যে ঘুমোনোর চেষ্টা বৃথা বুঝে দাদুমণি  উঠে বসেছিল ততক্ষণে, তিনিও যোগদানের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন।
“একজনের নাকে না...(ফিসফিস করে দাদুমণিকে, এটাকে কী বলে গো? ফিসফিস ফিসফিস)...নাকে না...খড়গো আছে।”
“গণ্ডার! এত সহজ হিন্ট দিস না, শক্ত শক্ত দে।“
“উম্মম...আচ্ছা, একজনের শুঁড় আছে।“
“হাতি! বলছি না শক্ত দে?”
“হয়নি, হয়নি, ফেল!” মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে বলে সহর্ষ কন্যা।
অ্যাঁ! হাতি নয় শুঁড় আছে? সে আবার কী? ও, বুঝেছি, শুঁড়ের অবস্থানে ভুল করেছি। মৌমাছি? তাও নয়? তাহলে প্রজাপতি?
“আরে ধ্যাৎ! মাথায় নয়! এমনিই শুঁড় আছে।“
এবার রাম ট্যান খাই। এমনি এমনি কার আবার শুঁড় হয়?
“ছোট্ট শুঁড়। পুঁচকি পানা।“
শুঁড়ের সন্ধানে অ্যানিম্যাল কিংডম হাতড়াই। কে রে ভাই! ওদিকে ফিসফিস চলছে, দাদুরও নাকি নামটা মনে পড়ছে না। ওঃ! পেয়েছি, ‘সূর্যদেবের বন্দী’র ক্যাপ্টেন হ্যাডক-কে মানসচক্ষে দেখতে পেয়েছি!
“ওটাকে পিপীলিকাভুক বলে বুঝলি। পিপীলিকা মানে পিঁপড়ে, আর ভুক মানে যে খায়। ওটা পিঁপড়ে খায়। শিখিয়েছিলুম তোকে আগে, ভুলে গেছিস।“
“আচ্ছা এইটে বলো। একজনের পিছন দিয়ে ধোঁয়া বার হয়।“
হাঁ হয়ে যাই। ওদিকে দাদু উঁকি মেরে ছবিটা দেখে বেদম হাসতে লেগে গেছে।
অনেক কসরৎ করেও এ অসম্ভব জিনিস পারি না। শেষে তিতির বই দেখায়, দেখি...
একটা ট্রাক।
“এ আবার কী! একজন বললি কেন? এক’জন’?”
“আহা, ট্রাকও তো একজন লোক। আমি চোখ মুখ এঁকে দিইনি তাই বুঝছ না।“
বুঝতেই পারছেন এমন গোলমেলে মেয়ের সঙ্গে আমি আর খেলতে রাজি হইনি। তাছাড়া সে রঙ পেন্সিল এনে ট্রাকের চোখ মুখ আঁকতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল তারপর।
একটু আবার চোখটা লেগে এসেছে, মাথার কাছে তারস্বরে চীৎকার -
“হ্যালো লোক!!! রঙ কি শুকিয়েছে এবার?”
চেয়ে দেখি তিনি জানলার সামনে বাবু হয়ে বসে রাস্তায় রং করা দুজনের উদ্দেশ্যে হাঁকডাক জুড়েছেন। ধড়মড় করে উঠে বসতে বসতে স্বগতোক্তি শুনি -
“ও না না, দুজন লোক তো, একের বেশি। তাহলে…”
আবার পাড়া কাঁপানো চীৎকার, “হ্যালো লোকস্‌!”
সব্বোনাশ করেছে। নাঃ, আর বিশ্রামের আশা করে লাভ নেই, রোদটাও আর রাস্তায় নেই, যাই সাইকেলের পিছনে দৌড়ই গে’!