Saturday, 24 August 2019

দ্রিঘাংচু

 
যেই একটু নিজের কাজে বসব, অমনি অবধারিতভাবে ছোট মানুষটির আগমন ঘটবে। হুস করে ঢুকে হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে হুস্‌-তর গতিতে বেরিয়ে যেতে যেতে বলে গেল,
“মাঁ! গণেশটা কী সুন্দর এঁকেছি না? পরশুরামও আছে।“
সে তো দিব্যি নাচতে নাচতে পালাল, আমি এদিকে কাগজটার এপিঠ ওপিঠ আগাপাস্তলা খুঁজে ট্যান খেয়ে বসে রইলুম। ওপিঠে কিস্যু নেই, এপিঠে দিব্যি নধর গণুবাবা আছেন, তাঁর মাথায় মুকুট, হাতে কুঠার, সামনে লাড্ডুর থালা, পায়ের কাছে পুঁচকে ও মিচকে ইঁদুর সব আছে, কিন্তু সেই ক্রোধী মুনিটি কই? তাঁর জটার একগাছা চুলও তো দেখতে পাচ্ছি না!
ইতিমধ্যে লাট্টুর মত পাক খেতে খেতে তিতির পুনঃপ্রবেশ করেছে।
“অমন ঘুরপাক খাচ্ছিস কেন, পড়ে যাবি যে!”
“আমি এখন আথ্‌! আথ্‌ এমনি করে চলে।”
বড়ই ভাবনার বিষয়। খাটের পাশের অপ্রশস্ত জায়গায় আহ্নিক গতি হতে থাকলে আমি যাই কোথায়!
আমার চিন্তা টের পেয়েই হয়তো তিতির আশ্বস্ত করল,
“তোমায় একটা কথা বলতে এলুম খালি!”
ভনিতা করছে মানেই গড়বড়, কিছু উৎপটাং বায়না আসছে মনে হয়। তড়িঘড়ি কথা ঘোরাই,
“হ্যাঁ রে, তোর পরশুরাম কই?”
সলজ্জ হাসি সহযোগে উত্তর এল, “ওটাই তো বলতে এলুম! ভুল বলেছি, পরশুরাম নয়, পরশু। গণেশের হাতে আছে।"
বেচারি! প্রবাসে বড় হয়েও বাংলা শব্দভাণ্ডার তার এত বড়সড়, গুলিয়ে গেলে কী আর করা! বাংলা, ইংলিশ, হিন্দি এবং মারাঠী নিয়ে জাগলারি করতে হলে অমন একটু আধটু হতেই পারে। নাহয় এখনো ‘ফেব্রিক কালার’কে সমানে ‘ফাইব্রাস কালার’ বলে যাচ্ছে, এই কিছুকাল আগেই আমাদের সে খাবার ‘সার্ভাইভ’ করে দিতে চেয়েছিল – তাই বলে পরশুকে পরশুরাম বলে ফেলেছে বলে হাসব নাকি! শব্দটা জানে এই না কত!
এইসব বিবেচনা করে খুব গম্ভীর থাকার চেষ্টা করছিলুম, হাসিটাকে গালভরা পানের মত একবার এদিক একবার ওদিক করছি, হঠাৎ খেয়াল হল হোমটাস্ক বাকি আছে।
কম্পি টম্পি ফেলে হাঁক পাড়লুম, “ওরে ল্যাবেঞ্চুশ, বলি সারাক্ষণ ছবি আঁকলে আর নেত্য করে বেড়ালেই চলবে? শিগগির বইখাতা নিয়ে আয়!”
গতিজাড্য খুব খারাপ জিনিস বুঝলেন? ওতে গালে হামি পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু কচি মাথার গুঁতোয় চশমাও নাক থেকে খসে পড়ে যায়।
যাইহোক। পনেরো মিনিট পরের দৃশ্য।
খাটে বইখাতা ছড়ানো। মেয়ে ছোট টেবিল পেতে লিখছে। মা অতি বিপন্ন ভাবে নেট হাতড়াচ্ছে।
মায়ের হিন্দির যা অপূর্ব দক্ষতা, নেট না হাতড়ে উপায়ও নেই। দিম্মা থাকলে তিনিই করান এই সাবজেক্টটি, তিনি একদা স্কুলে হিন্দি পড়েছেন, কর্মসূত্রে বলেওছেন বহুবার, মায়ের চেয়ে অন্তত ভালো জানেন। দাদুমণির হিন্দি শোনার অযোগ্য ভয়াবহ, অতএব মায়ের আপাতত গুগলঠাকুর ভরসা।
ক, কা, কি... ইত্যাদি দিয়ে শব্দগঠন ছিল। দিব্যি চলছিল, ঠেকে গেল ‘ঃ’তে এসে।
তিতির যেই না নাকের ডগায় চশমা ঠেলে প্রবল সিরিয়াস মুখে বলেছে, “কঃ!” অমনি আমার ‘দ্রিঘাংচু' মনে পড়ে গেছে! তারপর না হেসে পারা যায়? হাসামাত্র ওদিক থেকে কৈফিয়ত তলব, “হাসছ কেন, হাসছ কেন?” তখন ছোট্টটাকে বলতেও হয় গল্পটার কথা, তারপর দুজনে মিলে জাপটাজাপটি করে হেসে কুটিপাটি হতেও হয়, তারপর রাত্রে আসল গল্পটা পড়ে শোনাব কথাও দিতে হয়,  তারপর দেখা যায় সর্বনাশ সমুৎপন্ন হইয়াছে।
কঃ দিয়ে আমি কোনো শব্দ জানি না। কোনোই না।
এদিকে তিতির ‘আমার মা সব জানে’ গোছের মুখ করে চেয়ে আছে।
কী আর করি, লেখার সময় শব্দ ভেবে না পেলে যা করি, তাই সাজেস্ট করলুম।
“চ, বার বার বলে দেখি, ঠিক মাথায় কিছু না কিছু এসে যাবে।“
আরো মিনিট দশ পরের দৃশ্য। মা আর মেয়ে মুখোমুখি বসে “কঃ?” “কঃ!” করে যাচ্ছে, করেই যাচ্ছে, দাদুমণি আর আন্টি উঁকি মেরে দেখে পালিয়েছে। এমন সময়ে ডাকাডাকিতে আকৃষ্ট হয়ে নাটকের পরবর্তী কুশীলব জানলায় এসে বসল, তারপর সেও আমাদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ‘ক্কঃ!’ ‘ক্যাঁঃ’ করতে লেগে গেল।
কে জানে সেটা কাক না দ্রিঘাংচু!

Monday, 15 April 2019

নববর্ষ

নববর্ষ না আমড়া!

একে তো অফিস ছিল। শুধু অফিসই ছিল না, কাজও ছিল পাগলপারা। 

বাড়ি এসে তিতির ও তার দিম্মাকে নিয়ে ফের বেরোলুম ঘুরতে। বচ্ছরকার দিন বলে কথা! ঘুরতে ঘুরতে খেয়াল হল, ঘরে পরার চটির স্ট্র‍্যাপ পটাং হয়েছে। আহা, কী আনন্দ, এই তো নতুন কিছু কেনার উপলক্ষ্য পাওয়া গেছে! 

ডি-মার্ট থেকে যখন বেরোলাম, একহাতে দু লিটার কোল্ডড্রিঙ্ক, অন্যহাতে ঠাসা উপচে পড়া থলি, সে এত ভারী যে বেঁকে গেছি সেদিকে। 

ওদিকে আমি কিন্তু নিজের জন্য ওই  একজোড়া ঘরে পরার হাওয়াই-ই কিনেছি! বাকিসব "কোথা হইতে কী হইয়া গেল" কেস।

বাড়ি এসে দেখলুম, প্লে ডো। স্বাভাবিক। তিতির গত কয়েকদিন ধরেই এটার বায়না করছিল। তারপর আরো দুই না তিন জোড়া ধুমসো হাওয়াই চটি। কার, কেন, কিচ্ছু জানি না। একটা বদখৎ দেখতে হাতা, তার সবটাই প্রায় ফুটো। 'খামোকা দাম দিয়ে ফুটো কিনেছ কেন' বলতে যাওয়ায় যুগপৎ দিম্মা-নান্নীর কণ্ঠনির্ঘোষে যে প্রতিবাদসমুদ্র উৎপন্ন হল তার কথা  আর না বলাই ভালো।

তার প্রতিশোধও নিয়েছি অবশ্য। হাতে পেলুম একটা কাপড়ের টুকরো, সেটা ঝাড়নও হতে পারে, ঘরমোছা ন্যাতাও হতে পারে, এমনকী পাপোশ হলেও আশ্চর্য হব না। পাওয়ামাত্র সুন্দর করে মায়ের বাথরুমের রডে টাঙিয়ে দিয়ে এসেছি, কাল চেঁচামেচি করলে বলব ভেবেছিলুম তোয়ালে বুঝি। 

তারপর আরো হাজার গণ্ডা কাজ সেরে ফেললুম।

দিনের শেষে, ক্লান্ত শরীরে ধুপুস করে বিছানায় পড়ে যাবার পরেও দিন ফুরোয় না।

"মা, ও মা?"

"উঁ?"

"সারপ্রাইজ! এই নাও।"

একটা নানারঙের প্যাস্টেল কালারের দাগে ছয়লাপ পুরোনো পেন্সিল বক্স, যাকে কোনো অজ্ঞাত কারণে তিতির "কম্পাস" বলে। এবছর নতুন কম্পাস পেয়েছে নতুন ক্লাসে উঠে, তাই এটা বাতিল হয়েছিল। সেইটি হাতে ধরিয়ে দিয়ে,  মেয়ে আগ্রহে হুমড়ি খেয়ে বুকে উঠে পড়ে প্রায়।

"খোলো না? খোলো?"

খুলি।

দুটো পেন। ইয়ার ফোন। আপিশের ড্রয়ারের চাবি। ফোন খোলার কাঠি। গ্লু স্টিক। 

আপিসের ব্যাগের বাইরের খোপে পড়ে থাকে এগুলো। দরকারমত হাতড়ে বার করে নিই। 

পরিপাটি গুছিয়ে রাখা।
আর একটা পুঁচকে প্লাস্টিকের ল্যাজমোটা শেয়াল। 

"ওইটে নিয়ে খেলবে মাঝে মাঝে, হুঁ? তোমায় পয়লা বৈশাকে দিলুম, তোমার তো কম্পাস নেই একটাও..."

নববর্ষে নতুন জিনিস গিফট করার নিয়ম যে করেছিল সে কিচ্ছুই জানে না। আমার যেন বছর বছর এমন বাতিল গিফটই জোটে। 

ভালবাসার পুরোনো হয় না যে!



Sunday, 31 March 2019

ফায়ার ড্রিল

তিতিরদের ইক্কুলে ফায়ার ড্রিল করায়, জানো? হঠাৎ করে আগুন টাগুন তো লাগতেই পারে, যেকোনো জায়গাতেই । শট্‌ সাক্কিট্‌ হতে পারে, আরো কত কী!
তো তেমন হলে কী করবে?
দাদুমণিকে এইসব শিখতে হচ্ছে এখন। দাদুমণি কিনা অনেক অনেক দিন আগে ইক্কুলে পড়েছিল, তখন এসব শেখাত না!
আর আন্টিকেও। আন্টি কিনা গ্রামের ইক্কুলে পড়েছে।
মায়ের আপিশে এসব হয়, হলে আবার সিঁড়ি দিয়ে হেঁটে হেঁতে এগারোতলা নামায়, তাই মায়ের ছাড় আছে।  
“এই মনে করো তুমি বসে আছো, এই মনে করো ফায়ার অ্যালার্ম বাজল, এই মনে করো সিঁড়ি”
পাশ দিয়ে যেতে যেতে মা ফুট কাটে, “এই মনে করো গেছো বৌদি রান্না করছে, এই মনে করো গাছের গায়ে একটা ফুটো...”
গুঁতিয়ে, ঢূঁসিয়ে, ঠেলে মূর্তিমান উৎপাতকে বিদ্যায় করে আবার টিচারের ক্লাস চলে।
 “সিঁড়ি বুঝেছ – লিফটে যাবে না কিন্তু ফায়ার অ্যালার্ম বাজলে, হুঁ, আটকে যাবে, বুঝবে তখন!”
মা চুপি চুপি উঁকি মেরে দেখে, ভারি আমোদ লাগে নাকে গোল চম্মা মেয়ের গ্রাম্ভারি চালচলনে। আহা, তাদের সময়ে তো আর এসব ছিল না! স্কুলে লিফটই বা তখন কই!
“দরকারি জিনিস সব গুছিয়ে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে যাবে দরজা দিয়ে। সোওওওওজা নিচে, ফাঁকা জায়গায়। দাঁড়াবে না, আবার ঠেলাঠেলিও করবে না।“
ওমা, এসবের কয়েকদিন পরেই, রাত্তিরে যেই না মা টিভি চালিয়েছে, অমনি ঘরের আলো গুলো ধুকপুক করতে লাগল। মা তো অমনি টিভি ফ্রিজ সব বন্ধ করে ইলেক্টিক্কাকুকে ডেকে পাঠাল।
“কী হঁবে? ও মাঁ কীঁ হবে?”
“থাম বাপু। দেখছিস তো কাকু কাজ করছে!”
এদিকে কাকু টুলে চড়ে প্যাঁচ কষতে কষতে “শর্ট সার্কিট” শব্দ উচ্চারণ করে ফেলেছেন। অমনি ছোটজন হাউমাউ করে, হুলুস্থূল করে, পিঠে পটাং করে স্কুলব্যাগটা গলিয়ে রেডি।
অন্ধকারে বুঝিনি তখন, পরে আন্টির থেকে শুনলুম, আমি যখন কাকুর সঙ্গে টর্চ বাগিয়ে  নেত্য করছি, তিনি নাকি তাঁর সব দরকারি জিনিস নিয়ে তক্ষুনি ঘরে ছেড়ে বেরিয়ে চলে যাবেন বদ্ধপরিকর হয়ে পড়েছিলেন। ভুলিয়েভালিয়ে বহু কষ্টে তাঁকে শান্ত করা গেছে।
রাতে শুতে এসে জিগালুম, “হ্যাঁরে, পিঠে স্কুলব্যাগ চাপিয়ে দাঁড়িয়েছিলি কেন?”
“যদি শট্‌ সাক্কিট্‌ হত? দরকারি জিনিস গুছিয়ে নিয়ে নেমে যেতে হত না?”
তা হত বটে, মানতে বাধ্য হই। আচ্ছা, স্কুলব্যাগটাই সবচেয়ে দরকারি মনে হয়েছে কন্যার। তা বেশ।
“আর বাঁহাতে পঈসা ফেলার ব্যাঙ্কটা নিয়েছিলুম।“
একটা পিগিব্যাঙ্ক আছে বটে। চেয়ে, ভাল কাজ করে, বাজারের ব্যাগ থেকে কুড়িয়ে, মাকে পটিয়েপাটিয়ে বা কেড়ে নিয়ে এরকম নানা উপায়ে সেটা প্রায় ভর্তিও হয়ে এসেছে।
গুড, গুড, ভেরি গুড। একই সঙ্গে লক্ষ্মী সরস্বতী দুই-ই দরকারি বুঝতে শিখে গেছে। এ মেয়েকে আর ঠেকায় কে!
“তা হ্যাঁ রে, ডান হাতটা খালি রাখলি কেন? তাতে আর কিছু দরকারি জিনিস নিবি না?”
তারপর, দুটো মাথার বালিশ ঠেকাঠেকি করে, গায়ে গায়ে গুটিসুটি মেরে শুয়ে, একটা ‘দরকারি জিনিস’ খুব লুকিয়ে লুকিয়ে চোখের কোল বেয়ে গড়িয়ে আসা গরম জলটা মুছে নেয়।
“ওমা, নেব তো! ও হাতে তো তোমার হাত ধরব। নিয়ে না গেলে যদি পড়ে থাকো একা একা?”


Sunday, 24 March 2019

রাজা ও বাঁদরছানা


“ও তিতির।  আর কতক্ষণ ধরে খাবি? মুখ চালা রে!”
“আমি তো যথাসম্ভব দ্রুত খাচ্ছি মা!”
আজ্ঞে। ওই হতভম্ব সরলহৃদয়া স্নেহশীলা (উভয়ার্থে ) মহিলাটি আমিই। হাঁ করে যার দিকে চমৎকৃত চক্ষে চেয়ে আছি, সেও আমারই একমাত্তর নাড়ি ছেঁড়া ধন। 
নাহয় শীর্ষেন্দু পড়াই, নাহয় ত্রৈলোক্যনাথ পড়াচ্ছি। তাই বলে একটা আজন্ম বোম্বেতে বড় হওয়া  স্কুলে ইংলিশ হিন্দি মারাঠি শেখা ছানা এমন শুদ্ধ বাংলায় জবাব দেবে! এটা বাক্যালাপ, না শরদিন্দুর ঐতিহাসিক উপন্যাস হে!
মনের মধ্যে গুনগুন করে জবাব আসে, আর তুমি নিজে যে সুযোগ পেলেই স্কুলের খাতায় বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষায় রচনা লিখে আসতে, তার বেলা?
যাকগে যাক। কিন্তু এদিকে সত্যিই যে মুখ বড়ই ধীরে চলছে। সমস্ত মনোযোগ কালি ফুরোনো ডটপেন আর বাতিল টুথব্রাশ দিয়ে ডাইনোসরের ডেন্টাল ক্লিনিং এ। এবার মাকে আসরে নামতেই হয় দেখছি।
"এই শোন না। একটা খাসা গল্প পেয়েছি। মৈ মাসি দিয়েছে৷ শোন না, শুনবি?"
যেই না গল্পের লোভে স্থির হয়ে বসেছে, টপ করে মাছভাতের গোল্লা যথাস্থানে চালান করি। 
"হুঁ শোন। একটা না রাজা ছিল। রাজার না একদিন শখ হয়েছে শিকার করতে যাবে।"
"মী-গয়া।"
"ঠিক ঠিক৷ মৃগয়া করতে যাবে।  (এটা ছবিতে রামায়ণের ফল) তো রাজা তো রেডি হল সেই মত - খাকি জামা আর হাফপ্যান্ট পরেছে, চোখে সানগ্লাস, মাথায় টুপি, আর পায়ে বুটজুতো।"
রাজার হাফপ্যান্ট বা টুপি যদি বা সহ্য করে নিয়েছিল, বুটজুতো আর সইল না।
"নায়ায়ায়ায়ায়ায়া! রাজা পায়ে নাগরা পরে।"
 আমিও ছাড়তে রাজি নই। 
"এহ, যাচ্ছে জঙ্গলে, কত কাঁটা খোঁচা পোকা মাকড় জোঁক আছে তার ঠিক নেই - নাগরা ফাগরা চলবে না।"
খানিক টালবাহানার পর ঠিক হল সে রাজকীয় বুট পরবে, তার ডগাটা নাগরার মত শুঁড়তোলা।
“চলল রাজা তরোয়াল বাগিয়ে ধপাং ধপাং করে। জঙ্গলে ঢুকে দেখে কি…”
“বাঘ নাঁ!”
“আচ্ছা বাঘ না। দেখে কি একটা…”
“ভাল্লুক নাঁ!”
“অ্যাঁ! আচ্ছা বাঘ ভাল্লুক কিছুই না। দেখে কি একটা বাঁদর। খুব মিষ্টি দেখতে বুঝলি…”
“আমার মত?”
এরকম ভয়ংকর বিপজ্জনক দোরোখা কোচ্চেনের উত্তর দিয়ে ফাঁসি আর কী! না না আমি অত বোকা নই।
“না, ওটা বয় বাঁদর। মানে বাঁদর, বাঁদরী নয়।“
“তাহলে সামু মামুর মত মিষ্টি দেখতে।“
নিশ্চিত প্রত্যয়ের ঘোষণা। যাকগে, সে সামু মামু বুঝবে এখন। আমি গল্প আগে বাড়াই।
“হ্যাঁ সেটা আসলে বেবি ছিল জানিস। সে না, একদম মায়ের কথা শুনত না আর সারাক্ষণ খাবার দাবার ফেলে লাফিয়ে বেড়াত বলে তার মা খুব বকেছিল। তাই সে বাড়ি থেকে পালিয়ে জঙ্গলে চলে এসেছিল।“
যা মাথায়্ আসে তাই বকে যাই। এখনো মাছভাত বাকি, তারপর চিনি দেওয়া দইয়ের বাটি অপেক্ষা করছে।
“আর তারপর না …রাজা আর বাঁদরে যুদ্ধ। সে কী যুদ্ধ ভাবতে পারবি না। শেষে বাঁদর দিয়েছে একটা বিকট বাঁদুরে ভেংচি কেটে – আর রাজা ভয়ে পগারপার।“
“মা? মাম্মা বাঁদর কাঁদছে না?”
যার যেদিকে মন!
“হ্যাঁ রে, মাম্মা বাঁদরের তো খুব মন খারাপ। সে সব জায়গায় ছানা খুঁজতে খুঁজতে এসে রাজপ্রাসাদে হাজির। সেখানে এসে দেখে রাজা মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে তার চেয়েও জোরে হাউ হাউ করে কাঁদছে।
আরে, আরে, কাঁদে না! এই নাও বাঁদুরে বিস্কুট খাও। এবার বলো তো বাছা কী হয়েছে?
আঁ আঁ আঁ …আমার তলোয়ার…অ্যাঁ অ্যাঁ…একটা পাজি বাঁদর… অ্যাঁ অ্যাঁ … নিয়ে নিয়েছে! জঙ্গলের মধ্যে! অ্যাঁ! আমায় ভেংচিও কেটেছে! অ্যাঁ্যাঁ্যাঁ!!!!!!!
বাঁদরের মা তো রাজার মাথায় অনেক হাত বুলিয়ে বিস্কুট টিস্কুট খাইয়ে তাকে শান্ত করল। তারপর মাম্মা বাঁদর, রাজা, মন্ত্রী, সেনাপতি সবাই মিলে জঙ্গলে চলল রাজার তলোয়ার ফিরিয়ে আনতে।
জঙ্গলে গিয়ে দেখে কি, সেই ছানা বাঁদর না, রাজার তলোয়ার দিয়ে গাছ থেকে কলার কাঁদি কেটে নামাচ্ছে। এরা যেই হইহই করে উঠল, সে অমনি মুখ ঘুরিয়ে দেখে, মাম্মা!
ছানা অমনি সব ফেলে একলাফে মায়ের কোলে।
ও মাঁ! খিদে পেয়েছে, বাঈ যাব!
মাম্মা তখন আর বকবে কী, ছানাকে আদর করে কূল পায় না!
তারপর মাম্মা ছানা ট্যাঁকে বাড়ি চলে গেল, গিয়ে ছানাকে চিঁড়ে মুড়কি দুধ কলা দিয়ে ফলার মেখে দিল খেতে, আর রাজা তার তলোয়ার নিয়ে সবাইকে নিয়ে ফিরে গেল রাজপ্রাসাদ। হয়ে গেল গল্প!“
অমনি এই ছানাটাও শেষ চামচ চেটে খেলি করে হুপ্‌ করে এক্ লাফে মায়ের কোলে উঠে পড়ল। তারপর ঘুমু করতে গিয়ে আবার অন্য গল্প…কিন্তু সে আবার পরে আরেকদিন তোমাদের শোনাব।


Saturday, 8 December 2018

খেলাঘর


তিতিরদের এখনকার বাড়িটা ভারী সুন্দর। ভিতরের ঘরে, দেওয়াল জোড়া জানলার এ পাশের কোনায় পড়ার টেবিল, ও পাশে বইয়ের আলমারি। টেবিলে থাক দেওয়া মায়ের অধুনাপাঠ্য বইয়ের ফাঁকে ‘তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম’, আর আলমারিতে তিতিরের নাগালের তাকে ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’। হুঁ হুঁ বাবা, তিতির জানে!

এই দুইয়ের মাঝের খোলা অংশে, সাদা টালি বসানো মেঝেতে তিতিরের ‘খেলাঘর’। ধুমসো দেড়ফুটিয়া ট্রাক থেকে হাফ সেন্টিমিটার সাইজের পুঁতি – সব পাওয়া যায় সেখানে তিতির যখন খেলতে বসে। কোনোদিন বাক্সের উপর বাক্স চাপিয়ে পুলিশ ষ্টেশন হয়, কোনোদিন চিড়িয়াখানা। এই কনস্ট্রাকশন সাইটে মাটি কাটা গাড়ি আর সিমেন্ট মিক্সার ঘুরে বেড়াচ্ছে, তো এই মেলা বসে বেলুন বিক্রি হচ্ছে। যেহেতু ক্রীড়াঙ্গনে ওই হাফ কি এক সেন্টিমিটার সাইজের গড়গড়ে জিনিসের বিশেষ প্রাদুর্ভাব, তাই মা বকের মত ইয়াব্বড় পা ফেলে ডিঙ্গি মেরে হাঁটা চলা করে তিতির খেলতে বসলে।

যদিও তাতেও যে পুরো রেহাই পায় তা নয়।

নিজের কাজে মহাভারত পড়ছে মা। রাজশেখর বসুর মহাভারত রাখা আছে অন্য ঘরে, অন্য বইয়ের আলমারিতে। উঠে দাঁড়িয়ে পা ফেলতেই সড়াৎ করে বিনা আয়াসে তিন ফুট মত এগিয়ে গিয়ে, পরম সাবলীল শরীর ও ব্যালান্সিং ক্ষমতার পরিচয় দিয়ে খাটের কোনায় খটাং করে হাঁটু ঠুলে ফেলল।

“অ্যাঁ তুমি আমার রাস্তা ভেঙে দিলে!!!”

ত্রিভঙ্গমুরারি হয়ে দাঁড়িয়ে মা তখন পায়ের শুশ্রূষা করছে। সেই বা ছাড়বে কেন,

“তুই যে আমার হাঁটু খুলে দিলি তার বেলা?”

মেয়ের মনে মা-কে নিয়ে প্রবল মায়া, নিজেকে কিঞ্চিৎ পরিমাণে মহিলার গার্জেনও জ্ঞান করে সে। অতএব উদ্বেগের হদ্দমুদ্দ হয়ে হাঁটুতে ঠাণ্ডা জল থাবড়ে (কন্সট্রাকশন সাইটে মশলা-গাড়িতে সিমেন্ট মাখতে জল লাগে তা জানো না? কৌটো করে জল নিয়ে এসে বসতে হয় তার জন্য), বোরোলীন লেবড়ে, হামি ও ফুঁ দিয়ে তবে ছাড়ল। একটা পুরোনো শাড়ির ছেঁড়া পাড় (বার্বির শাড়ি) দিয়ে পট্টিও বেঁধে দিতে চেয়েছিল, সেটা আর মা নিতে রাজি হয়নি।

মা খাড়া হয়ে জানতে চায়, ঠিক পায়ের গোড়াতে অতগুলো জুড়ে জুড়ে বানানোর খেলার পাইপগুলো রেখেছিল কেন?

“ওঁগুলো তো জলের নল, রাস্তা সারাচ্ছি না? খুঁড়ে তুলেছি, রাস্তার ধারে অমন করেই তো সাজিয়ে রাখার নিয়ম!”

চোখ পাকিয়ে দেখা যায়, রাস্তাই বটে। কী করছিল কে জানে, আপাতত মায়ের চরণকমলের দৌলতে সারা রাস্তা জুড়ে পর পর পাইপেরা শুয়ে আছে পাশাপাশি।

“তুঁমি আমার রাস্তা ভেঙে দিয়েছ!”

“মোটেই ভাঙিনি, দ্যাখ কী সুন্দর সমান করে দিয়েছি।“

“মা! আইডিয়া! তুমি হচ্ছ রোড রোলার, কেমন?”

সবেগে রাজশেখরবাবুর খোঁজে অন্য ঘরে পলায়ন করা ছাড়া এরপর আর কী বা করার থাকে, বলুন!

---

মা ল্যাপটপে খুটখাট করছে। তিতির খেলাঘরে মত্ত। বিশাল ব্যস্ততা সেখানে, বার্বির জন্মদিন হচ্ছে।

“মাঁ? ও মা?”

“হুঁ?”

“তোমার কোন রংটা পছন্দ?”

“তিতিরের রঙ।“

“আরে ধ্যাৎ! রেড, না ইয়েলো, না পিংক...এইরকম!”

“উঁ? দে পার্পল দে।“

খচর মচর হল কিছুক্ষণ। তারপর কাঁধের পাশে খুদে মুণ্ডূ।

“আমার পাপ্পল নেই ওইগুলো। অন্য রঙ বলো।“

চোখ ফিরিয়ে দেখি বাচ্চাদের জুয়েল বানানো কিটগুলোর সমস্ত পুঁতি ঢিবি করে জড়ো করা। সেফ অপশন বলে দিই, “পিংক”।

খানিক পর খুদে খুদে প্লেটে পিংক ডোনাট, পিংক পাস্তা, পিংক কাস্টার্ড, পিংক কেক আর পিংক কাপে করে পিংক স্ট্রবেরি শেক দেওয়া হয় আমায়।

“ইকি, জলটা এমন গোলাপি করলি কি করে?”

“সিক্রেট!!!” বলে মেয়ে জলরঙের বাক্সটা ইশারায় দেখায়।

চাকুম চুকুম করে সব খেয়ে ফেলি। আহা, মিছিমিছি। কীইইইইইইই ভালো হয়েছে রে!

গর্বিতা কন্যা দুহাত ভর্তি রবারের পুতুল নিয়ে স্নানার্থে যাত্রা করেন এরপর।

মা আরো কাজ করে। হিসেব মিলছে না দেখে আবার নতুন করে শুরু থেকে শুরু করে। আরো অনেকক্ষণ খুটখাট করার পর খেয়াল হয় আন্টির দিয়ে যাওয়া চা জুড়িয়ে জল হয়ে যাচ্ছে। মা তখন পিঠ টান করে আড়মোড়া ভাঙে, চোখ বন্ধ করে একটু ব্রিদিং এক্সারসাইজ করে, তারপর আলতো করে কাপে একটা লম্বা চুমুক দেয়।

তারপর হাঁকপাক করে বাথরুমে দৌড়য়।

ইয়ে, কাপ গুলিয়ে ফেলে জলরং গোলা জল এক চুমুক খেয়ে ফেললে খুব একটা ক্ষতি হয় না, বলুন?



  

Friday, 23 November 2018

শার্ক

হাতে দুধের গ্লাস, গোঁফে সূক্ষ্ম সরের প্রলেপ। বিনুনি বাঁধা ডুগডুগ করে নড়া মুণ্ডুটাকে দেখে ভারি মজা লাগছিল। পঞ্চম চুমুকটা দিয়ে গ্লাস রেখেই সুর খেলিয়ে বায়না ভেসে এল, “মা, মঈশাসুর বলো।“
অগত্যা, তাই বলি।
---
মঈশাসুরের খুব ইচ্ছে হয়েছিল একটা “শাক্‌” পুষবে। লালশাক কি নটেশাক নয় গো, ওই যে জলে থাকে, পিঠে তিনকোনা পাখনা, সেইটে! শাআআআআররররররর্ক্কক্কক্কক্‌!
এদিকে দুগগা মা তো বলে দিয়েছে ‘কভ্‌ভি নেহি!” মঈশাসুরটা তো দুষ্টু, করেছে কী, নিজে নিজে লুকিয়ে লুকিয়ে একটা বেবি শার্ক নিয়ে এসেছে...
[পাঁচ মিনিটের বিরতি। ‘বেবি শার্ক টুট্‌ টু টুট্‌ টু টু’ গেয়ে ট্যুইস্ট নাচার জন্য। যারা ছানা নিয়ে এ গান একবারও শুনেছেন তারা বুঝবেন এর মাহাত্ম্য!]
তো, মঈশাসুর তো সেই শার্ক এনে চানের বালতিতে লুকিয়ে রেখেছে। খুব মজা, ‘শাক্‌’ পুষেছে। কিন্তু হল কী...
[এইখানে আবার দুধ ফিনিশ করার বিরতি। মানে বিরতি না দিলে দুধ যেমন কে তেমন পড়ে থাকছিল কিনা।]
শার্কটা ছিল মহাশার্ক প্রজাতির। পরদিন ঘুম থেকে উঠে মঈশাসুর দেখে সে এইটুকু এক বিঘৎ থেকে এক রাত্তিরেই বেড়ে বালতি ভরে ফেলেছে। তারপর দাঁত টাত মেজে দুধ খেয়ে এসে ঘরে ঢুকেই তো ‘আঁই আঁই আঁই’ চীৎকার করে উঠেছে।
শার্ক লম্ফ মেরে বালতি থেকে বেরিয়ে সারা ঘরে কিলবিল করে বেড়াচ্ছে। মঈশাসুরকে দেখেই সে লক্ষ কোটি ধারালো দাঁত বাগিয়ে তেড়ে এসেছে।
আর যায় কই! মঈশাসুর তো ‘বাঁচাও বাঁচাও’ করে সারা বাড়ি দৌড়চ্ছে! তার পিছু পিছু ল্যাজে নেচে নেচে চলেছে সেই বেবি শার্ক! ‘টুট্‌ টু টুট্‌ টু টু’ গান গাইছিল কিনা জানি না, কিন্তু সে সরস্বতী আর গণেশের পড়ার টেবিলে ল্যাজ বুলিয়ে সব বইখাতা ফেলে দিয়েছে, কার্তিকের ফুটবল নাকে করে নাচাতে গিয়ে জানলার বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে, লক্ষ্মীর নতুন জুতোর ওপর দিয়ে ঘষে গিয়ে সেটা থ্যাবড়া করে দিয়েছে, আর রান্নাঘরে মুখ বাড়িয়ে দুগগামাকে অ্যায়সা মেছো ভেংচি কেটেছে যে আঁতকে উঠে দুগগামার হাত থেকে ফোড়নডালা পড়ে গিয়ে সারা ঘরে সরষে কালোজিরে গড়াগড়ি যাচ্ছে।
দুগগা মা তো খেপে আগুন! কে এসব বাড়িতে ঢুকিয়েছে অ্যাঁ?
দুগগা মার ওই রেগে কাঁই রূপে হাতা খুন্তি নিয়ে তেড়ে আসা দেখেই তো শার্কের হয়ে গেছে! সে এদিক দেখে ওদিকে দেখে, দেখে কি জানলার বাইরেই একটা বড় ঝিল। অমনি শার্ক জানলা পেরিয়ে সোজা সেই ঝিলের নিচে। আর মঈশাসুর দশ হাতের কানমলা আর পিঠে গুমগাম কিল খেয়ে চোখ মুছতে মুছতে নিজের ঘরে।
---
ওহে, পড়াশুনোটা করো এবার? গালে হাত দিয়ে বসে বসে কী ভাবছ?
এঁ, মা, আট্টু বলবে? ওই শার্কটার তাপ্পর কী হল?
আচ্ছা আগে অঙ্কগুলো হয়ে যাক, এক পাতা হাতের লেখা হোক, একটু বাংলা পড়া হোক।
তারপরে মাতাকন্যার ‘ঘন্টাখানেক সঙ্গে হোমটাস্ক’জনিত প্রবল পরিশ্রমের কথা উহ্য থাকুক। ততক্ষণ শার্কটা খেয়ে দেয়ে আরো মোটা হোক, আরো বড় হোক, আরো পাজি হোক।
আবার তার সঙ্গে দেখা হয় স্নান খাওয়া সেরে দুপুরে শুতে এসে। মায়ের কোলের কাছে ভিজে চুল এলানো কচি মুণ্ডু ঢুকে পড়ে, মিহি মিহি গলায় আবার বায়না ওঠে, “মা? গপ্পো? শার্ক?”
---
একদিন না, দেখা গেল, দুজন লোক সেই ঝিলের ধারে পা টিপে টিপে যাচ্ছে। একটা ছোট সাইজের, বিনুনি বাঁধা, অন্যজন বড়, সালোয়ার কামিজ পরা। বড়জনের হাতে একটা ছিপ।
[একজনের উত্তেজিত হয়ে উঠে বসা ও অন্যজনের তাকে আবার ভুলিয়ে ভালিয়ে শোওয়ানোর বিরতি।]
তারপর তো তারা গুছিয়ে বসেছে ঝিলের ধারে। বগা পুলিশ টুলিশ কেউ নেই দেখে নিয়েছে। ছিপ ফেলেছে।
আর ফেলতে না ফেলতে ছিপে টান!
তুলে দেখে কী...
‘মাছ? মাছ? মা, মাছ?”
একটা ছেঁড়া জুতো। গার্ড আঙ্কলদের কারো। বিচ্ছিরি দেখতে, মুখ হাঁ।
[হাসির বিরতি।]
তারপর আবার ছিপ ফেলেছে। খানিক পরে আবার ঠুকরেছে। অমনি তো মা এক টান। আর দেখে কী...
“এবার মাছ? মা চিংড়ি মাছ?”
দেখে কী একগাদা শ্যাওলা আর ঝাঁঝি। সে কী বদ গন্ধ সেগুলোয় তোকে কী বলব!
[‘ইশ্‌ ইশ্‌’ করে প্রবল হাসির বিরতি।]
যা থাকে কপালে, বার বার তিনবার এসব বলে টলে তো আবার ছিপ ফেলেছে। তা এবারও খানিক পরে ফাতনা নড়ছে।
‘কী গো? মাছ, না এবার?”
হেঁইও হেঁইও করে টেনে তুলে দেখে একটা ফুটিফাটা ছেঁড়া তেরপল। কে কবে ফেলে গেছিল কে জানে।
[এখনো মাছ না পাওয়ায় গোঁসা ও গোঁসাভঙ্গের বিরতি।]
তারপর হল কী , সেই শার্কটা জল থেকে মুখ বাড়িয়ে বলল, রাগ কোরো না তিতিরপাখি। আমি আসলে আজ আমার ঘরে সাফ করছিলুম তো, তাই যা যা জঞ্জাল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলেছি সব তোমার ছিপে আটকে গেছে।
কেন তুমি অমন করেছ? আমি কী করে মাছ ধরব তাহলে?
তাই তো! কিন্তু সাফ না করেই বা উপায় কী, লোকে এত এসব ফেলে দেয় জলের মধ্যে আমরা তো থাকতেই পারি না।
তারপর? তারপর তিতির শার্ককে ‘হেল্প’ করল এসব জিনিস ছিপ দিয়ে জল থেকে তুলে দিয়ে – জল একদম ‘পোষ্কার’ হয়ে গেল, আর শার্ক তিতিরকে ‘হেল্প’ করল রাশি রাশি মাছ ওর ছিপে গেঁথে দিয়ে।
---
রাশি রাশি মাছের মধ্যে কটা তেলাপিয়া আর কটা চিংড়ি সে হিসেব দিতে গিয়ে দেখি আরেকজন ঘুমের দেশে। ভারি মিষ্টি একগাল ‘বেবি শার্ক’ মার্ক হাসি মুখে নিয়েই।
‘টুট্‌ টু টুট্‌ টু টু’!