আচ্ছা, আপনারা চিঠি লেখেন? হাতে, পেন বা পেন্সিল দিয়ে, কাগজটাগজে?
না মনে হয়। আমরা কিন্তু লিখি। আমরা মানে আমি আর তিতির। কুট্টি কুট্টি কাগজে, বিলের উলটোবাগে, আমাজনের মোড়ক-ছেঁড়া পিজবোর্ডে, এরকম যাতে হোক অহর্নিশ আমাদের চিঠি লেখালেখি হয়।
উঁহু। পেরাইভেট ব্যাপার বাপু। অমন "দ্যাঁকাও দ্যাঁকাও! বলো বলো!" করে ঝুলে পড়লেই তো আর হল না! বরং চিঠি লেখার টেকনিকটা শেখো।
সবার আগে জানতে হবে, উদ্দেশ্যটা কী। মানে এমনি এমনি, নাকি কিছু একটা বায়না সুপ্ত রয়েছে অক্ষরমালার পরপারে, নাকি আড়ির পালা চলছে তাই মানভঞ্জনপ্রক্রিয়া।
আজ্ঞে। আমরা দুজন, তিতিরের ভাষায়, যাকে বলে পরস্পরের "বেস্ট ফ্রেন্ড"। বললে পেত্যয় যাবেন না তিনি ইদানীং আমায় "ব্রো" বলে সম্বোধন করছেন, কারণ বেস্ট ফ্রেন্ডদের নাকি সেরকম সম্বোধন করাই দস্তুর। ব্যাপারটা পি জে মাস্ক না ইউনিকর্ণ কাদের থেকে শেখা হয়েছে জানি না, কিন্তু তার ফলে আমায় লাগাতার কম"ব্রো"মাইজ করে যেতে হচ্ছে।
তো, যা বলছিলুম। বেস্ট ফ্রেন্ডরা যেমন গলাগলি করে গল্প করে, চুপি চুপি সব সিক্রেট শেয়ার করে এবং নিয়মিত ব্যবধানে ঝগড়াঝাঁটি করে কথা বন্ধ করে দেয় - আমরাও করি। হ্যাঁ ভাই, জানি আমি বুড়োধাড়ি মাম্মা, তা বলে বুড়িয়ে যেতেই হবে এটা কে বলেছে! কাজেই আমাদের মাঝেমধ্যেই মিনিট দশ বারোর মুখ দেখাদেখি বন্ধ চলে। খানিক খ্যাঁচাখেঁচির পর সাধারণত তিনি দুম দুম করে বগলে পুতুল নিয়ে রাগের চোটে আমার চটি পরেই পাশের ঘরে চলে যান, আর আমি সাড়ে চারবার ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে নাক টেনে নিজের কাজে মন দিই।
তারপর হয়তো মন দিয়ে নাক বেয়ে ঝাঁপ দেওয়া চশমা সামলাতে সামলাতে কম্পিতে কাজ করছি, হঠাৎ একটা ভাঁজ করা কাগজ উড়ে এসে কীবোর্ডের উপর পড়ে। ভাঁজ খুলেই দেখা যায় ভাব করার শর্ত এসে গেছে। সাধারণত এক্স সংখ্যক আদর ও হামিতেই ব্যাপার মিটে যায়। তেমন তেমন কেস হলে ললিপপের বা আইসক্রিমের ছবি থাকে।
আবার কখনো হয়তো এমনি এমনি চিঠি আসে। বি উলটোলে ডি হয়, কিংবা জানলায় একটা কাক বসেছে, এ ধরণের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খবরও পেয়েছি চিঠি মারফত। আমি নিজেও যে ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ খবর-টবর দিইনি তা নয়। এই চিঠি লেখা নিয়ে বিভ্রাটও যে হয়নি এক আধবার তাও নয়। যেমন ধরুন, এটা বছরখানেক আগের কথা হবে, অসন্দিগ্ধ মা চিঠি খুলে "আই অ্যাম রেস্টিং ইন পিস" পড়ে বিষম টিষম খেয়ে ছুটে গিয়ে আবিষ্কার করেছিল ওটা পিছনে দুটো বালিশ দিয়ে আধশোয়া হয়ে ঠ্যাঙের উপর ঠ্যাঙ তুলে বসে পা নাচাতে নাচাতে "ক্যালভিন অ্যান্ড হবস" পড়ার অবিমিশ্র আনন্দদশার তৈত্তিরীয় ইঞ্জিরি। অথবা, অনেক পাঁয়তারা মেরে চিঠি ভাঁজ করে রকেট বানিয়ে, খাটে বসে থাকা কন্যাকে দরজার আড়াল থেকে ছুঁড়ে সারপ্রাইজ ডেলিভারি করতে গিয়ে সেটা জানলা গলে ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে যাবার পর মায়ের খেয়াল হয় যে ওই কাগজটার উল্টোপিঠে সদ্য আধ ঘন্টা আগেই রান্নাঘর তদারক করে তিনি মুদির ফর্দটি বানিয়েছিলেন।
কিন্তু কখনো কখনো এরকম পত্রালাপ ভারি বিমূঢ় করে দেয়, জানেন।
এই লকডাউন টাইন নেই যখন, তখনকার কথা এটা অবশ্য। নতুন বাসায় নতুনভাবে সব গুছিয়ে নিচ্ছি তখন। মেয়ের নতুন বড় সাইজের সাইকেল কিনে এনেছি গত সপ্তাহে, আবার গতকালই এসে গেছে তার নতুন পড়ার টেবিল চেয়ার - মায়ের সেটটার হুবহু কপি, খালি রং আলাদা। অফিসফেরত দেখি মেয়ে সেই সাইকেলে হু হু পাক খাচ্ছে বিকেলে, সেই চেয়ার টেবিলে বসে মন দিয়ে ছবি আঁকছে, হোমটাস্ক করছে - আর মনটা ফুরফুরে হয়ে যায়। তো সেদিন রাতে ঘরের আলো নিভে যাওয়ার পর, শুয়ে পড়ার পর, টের পেলুম ছোট্টটা খুব কসরৎ করে ঘুমন্ত আমার বালিশের নিচে কীসব যেন ঢোকাল। পোড় খাওয়া মা হলে যা হয়, টের পেলেও, টের পেতে দিইনি যে জেগে আছি।
পরদিন তিনি ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথম কথা, "মাম্মা, তোমার বালিশটা উলটে দ্যাখো।"
আমি অবাক হওয়ার ভান করে বালিশ তুলে দেখি একটা ট্যারাব্যাঁকা ছেঁড়া কাগজ, তাতে লেখা "love and kiss", আর কাল বাড়ি থেকে কাজ করার অনুরোধ, আর একটা ১০ টাকার কয়েন।
বাকি দুটো তো বুঝলুম। কয়েনটা কেন?
জিজ্ঞাসা করে জানলুম, এই নতুন সাইকেল ও পড়ার টেবিল কিনে দিতে আমার প্রচুর টাকা খরচ হয়ে গেছে নিশ্চয়, তিনি তাই তাঁর পিগিব্যাঙ্ক থেকে বার করে এনে দিয়েছেন...লাগলে আরো দেবেন, আমি যেন একটুও চিন্তা না করি, "আরো আছে মা!"
হাসব না কাঁদব বুঝতে পারিনি জানেন। গলাটা খুব ব্যথা করেছিল খালি। বলা বাহুল্য, ও কয়েন আমার আলমারির লকারে ভেলভেটের বাক্সে তোলা আছে।
এক ছোট্টপানা বকবকমবাজ মেয়ের, আর তার সঙ্গে তার মায়ের নতুন করে বড় হবার গল্প।
Sunday, 12 July 2020
Wednesday, 20 May 2020
দ্য লস্ট ওয়ার্ল্ড
যে বন্ধুর ভূমির প্রেক্ষিতে আমাদের কাহিনির সূত্রপাত হইতেছে, তাহা এই দেশের অতি
সাধারণ অঞ্চলগুলির একটি মাত্র। নিয়মিত বর্ষণস্নিগ্ধ সে স্থানের মাটি সরস ও উর্বর, বনানীর
নিবিড় সবুজের অন্তরাল হইতে প্রভাতসূর্য উঁকি মারিয়া নিত্য তাহার কোমল রোদের পরশ বুলাইয়া
দিয়া যায়।
এমত এক সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা ধরিত্রীর বুকে যদিও অনায়াসে কৃষিমাতৃক সভ্যতা
গড়িয়া উঠিতেই পারত, বস্তুত তাহা হওয়াই স্বাভাবিক ছিল – কোনো অজানা রহস্যহেতু এই জমিতে
অদ্যাবধি একটিও মানুষের পা পড়ে নাই। হয়তো সেই কারণেই, সভ্যতার নিবিড়তম গোপন কথাটি আজিও
অতি কৌতূহলী, মুনাফালোভী বা জ্ঞানতাপস কাহারো কৌতূহলী চক্ষে ধরা দেয় নাই।
কথাটি হইল - এ অঞ্চল জনহীন, কিন্তু প্রাণহীন নয়। এই মানবচক্ষুর অন্তরালে, বসতিশূন্য
অঞ্চলে অখণ্ড প্রতাপে, সানন্দে, স্বচ্ছন্দে ঘুরিয়া বেড়ায় একদল অমিতশক্তিধর জীব।
ডাইনোসর!
হ্যাঁ, অবিশ্বাস্য হইলেও এ কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্য।
এই পৃথিবীরই এক নিরিবিলি নির্জনে, আজিকেও সেই প্রাগৈতিহাসিক প্রজাতির এক অনন্য শাখা অপ্রতিহত গতিতে রাজত্ব করিয়া
চলিয়াছে।
তবে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তদ্রনুরূপ পরিবর্তিত হইতে হইতে, আদিম জাতভাইদের সহিত ইহাদের
আকারে প্রকারে উল্লেখযোগ্য তফাৎ হইয়া গিয়াছে বইকি! ইহারা আকারে ক্ষুদ্রতর, ইহাদের দৈহিক
গঠন তুলনায় অনেক পেলব ও নমনীয়। প্রাচীন ডাইনোসর হয় সম্পূর্ণ মাংসাশী, নতুবা বিশুদ্ধ
নিরামিষাশী হইত। কিন্তু ইহারা সর্বভুক। সেইসঙ্গে ইহারা বুদ্ধিমান, বলিষ্ঠ, সুকৌশলী,
ক্ষিপ্র এবং সংযমশীল। তবে সর্বাধিক আশ্চর্য এদের শৃঙ্খলাবোধ ও দলবদ্ধতা। ইহারা যখন
যেস্থলে যায়, সকলে একসঙ্গে যায়। সর্বদা সারি বেঁধে চলাফেরা করিয়া থাকে, একজনের কিছুমাত্র
বিপদে অন্যরা সবাই আগাইয়া আসে সাহায্য করিতে। খাদ্যদ্রব্য যাহা পায়, সকলে মিলিয়া ভাগ
করিয়া খায়। সবচাইতে বড় কথা, মনান্তর বা মতান্তর হয় কিনা জানা নাই, কিন্তু হইলেও কখনো
দলমধ্যে কেউ অন্য কারো সহিত বিবাদ করে না।
ইহাদের দেখিলে মাঝেমধ্যে মনে হইবে, সভ্যতার যথার্থ প্রসার মানবসমাজের পরিবর্তে
ইহাদের মধ্যেই অধিক গতিতে হইয়াছে।
আপাতত, দলটি বিক্ষিপ্তভাবে তৃণভূমিতে অলস পদচারণা করিতেছিল। ইহাদের পারস্পরিক ভাব
বিনিময় বোঝার ক্ষমতা যদি আমাদের থাকিত, তাহা হইলে হয়তো বা শুনিতে পাইতাম যে ইহারা আসন্ন
বর্ষাঋতুর নিমিত্ত খাদ্যসঞ্চয় করিয়া রাখা লইয়া আলোচনা করিতেছে।
সহসা বিনা মেঘে বজ্রপাততুল্য এক ঘটনা ঘটিল। আকাশ হইতে তাহাদের মাথার উপর শুভ্র, কঠিন বরফের ন্যায় খণ্ড খণ্ড কী যেন ঝরিয়া
পড়িতে লাগিল। দলের সকলেই প্রথমে এই আকস্মিক আবির্ভাবে ভীত হইয়া দৌড়াদৌড়ি করিতে
আরম্ভ করিয়াছিল, যে যেখানে সম্ভব, উচ্চাবচ ভূমির খানাখন্দে লুকাইয়া পড়িতেছিল
প্রাণরক্ষার তাগিদে।
যেমনই আচমকা এই শ্বেতখণ্ড ধারাপাত শুরু হইয়াছিল, তেমনই আচমকা তাহা আবার থামিয়াও
গেল কিছুক্ষণ পরে। তখন লুক্কায়িত স্থান হইতে এক এক করিয়া আমাদের গল্পের মূল
চরিত্ররা উঁকিঝুঁকি মারিতে লাগিল। তৎপরে আকাশে তেমনই নির্ভার নীলিমা, তরুলতাগণ তেমনই
সবুজ সতেজ, চারিদিক তেমনই নিঃশব্দ নির্জন - দেখিয়া দুঃসাহসী কয়েকজন সতর্ক পদক্ষেপে
বাহির হইয়া এল। তাহাদেরই একজন, মুখ তুলিয়া বাতাসে কিসের যেন গন্ধ শুঁকিল।
অতঃপর চকিতে ছুটিয়া গেল অপেক্ষাকৃত নিকটস্থ একটি শ্বেতখণ্ডের দিকে।
এক রুদ্ধশ্বাস মুহূর্ত, তাহার পর তাহার দিক হইতে দলের বাকিদের প্রতি যে ইঙ্গিত
প্রদত্ত হইল, তাহার ভাষা আমরা না বুঝিলেও সে যে পরম উৎফুল্ল, তাহা বুঝিতে বাকি থাকে
না।
সঙ্গে সঙ্গে প্রবল এক হর্ষের জোয়ার বহিয়া যাইল যেন সেই ভূমিখণ্ডে। সেটা স্বাভাবিকও
অবশ্য, খাদ্য সংগ্রহের ভাবনা শুরু করিবামাত্র যদি এইরূপ শূন্য হইতে খাদ্য বর্ষণ
হয়, কে না উল্লসিত হইবে? যথার্থ, ঐ শ্বেতখণ্ডগুলি এই প্রজাতির ভক্ষণযোগ্য, শুধু তাহাই
নহে, অতি স্বাদু, অতি মনোরম খাদ্য। এই অকল্পনীয় সৌভাগ্যে তাহাদের উচ্ছ্বল আনন্দ, উদ্বেল
চঞ্চলতা দেখে কে!
খণ্ডগুলি অবশ্য আয়তনে তাহাদের শরীর হইতেও বড়। কিন্তু তাহাতে ইহাদের কিছুমাত্র
দমিয়া যাইবার লক্ষণ দেখা গেল না। কেহ একাই, কেহ বা দুইজনে মিলিয়া ধরিয়া, অটুট ধৈর্যের
সহিত ধীরে ধীরে, এক এক করিয়া খণ্ডগুলি তাহাদের গোপন খাদ্যভাণ্ডারে লইয়া যাইতে শুরু
করিয়া দিল। ক্রমে ক্রমে সবগুলিই নির্বিঘ্নে স্থানান্তরিত হইয়া গেছে, আর একটি কি
দুটি পড়িয়া আছে মাত্র, হেন কালে...
“অ্যাই!!! আমার চিনির কৌটো নিয়ে ওখানে কী করছিস?”
“হুশ্! মা, আস্তে! খেতে দিচ্ছি।“
“কাকে আবার চিনি ছড়িয়ে খাওয়াচ্ছ এখন! দেখি?”
জানলার ধাপিতে কয়েকটা গাছের টব। এবড়ো খেবড়ো মাটি, যেমন হয়। মেয়ের পোঁতা ছোলাগাছগুলো
সবে মাথাচাড়া দিচ্ছে। মা মেয়ের পিছন থেকে মুণ্ডু বাড়িয়ে দেখে সেই মাটিতে একটি দুটি
চিনির দানা তখনো পড়ে, আর ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছে একদল কালো কালো ...
“দেখেছ মা? আমি পুষেছি! ওদের নাম কী বলো তো? চিটিসরাস!”
Saturday, 28 March 2020
বাড়ি
বহু কষ্টে বিদ্যাটি আয়ত্ত করছিলুম জানেন! এমনি এমনি নয়, একটা আস্ত আখাম্বা চারতলা
প্রাসাদোপম বাড়ি বানানোকে কেউ এমনি এমনি কাজ বললে তার কানে গুজিয়ার প্যাঁচ মেরে গায়ের
উপর
আঠেরো পিস বুভুক্ষু ছারপোকা ছেড়ে দেব বলে দিলুম!
সে কি যে সে বাড়ি! সে বাড়ির একতলায় আছে ‘প্রাসাদোপম’ ( শব্দটা বলে ফেলে মহা ভুল
করেছি! সব কিছুতেই এই বিশেষণটা না লাগালে, তিনি গোঁসা হচ্ছেন।) “বাথথুম্”।
প্রচুর আপত্তি করেছিলুম জানেন। এটা মেনে নেওয়া যায়? বাড়িতে ঢুকেই “বাথথুম”! মানে,
কল্পনা করুন, আপনি বন্ধুর বাড়ি গেলেন, বেল বাজালেন, হাসিমুখে বন্ধু এসে দরজা খুলল,
আপনি ভিতরে ঢুকেই হয় বাথটাব নয় কমোডে গুঁতো খেলেন? এরকম বাসায় ঢুকেই গোসলখানায় পদার্পণ
করতে লোকে গোঁসা হবে না?!
তা আর্কিটেক্ট পাত্তাই দিল না। ওটাই নাকি তার ডিজাইন।
সুতরাং হল বাথথুম। সত্যিকারের জল ভরা বাথটাব দিয়ে। (ফোঁস! ঐ বাক্সটায় চুলের ক্লিপগুলো রাখতুম,
সেগুলো আর বাক্সের ঢাকনা কোথায় গেল পরে খুঁজতে হবে আবার!)
তার উপরতলায় খাবার ঘর। কুট্টি কুট্টি কাঠের টেবিল চেয়ার, গত জন্মদিনে কিনে দিয়েছিলুম।
তার উপরে একটা ধুমসো কেকের শেপের মোমবাতি – জ্বালা হবে, না খাওয়া হবে তা নিয়ে অনেকক্ষণ
অবধি দ্বিমত চলছিল, শেষমেশ ঠিক হয়েছে দিনের বেলা খাওয়া হবে আর সন্ধেবেলা জ্বালা
হবে। কে বলেছে you cannot eat your cake and have
too!
খাবার ঘরে একটা পিঙ্ক বাহারি আলমারি রাখা হয়েছে। ওটা দরকার মত ফ্রিজ, ওভেন বা খাবার
তুলে রাখার র্যাক ভেবে নিতে হবে। এসব সামান্য অ্যাডযাস্টমেন্ট যদি না পারেন তো খেলতে
আসেন কেন মশাই! দেখুন, দেখে শিখুন। এইমাত্র আমি আলমারি (ফ্রিজ) থেকে পাস্তা বার করে,
আলমারিতে (ওভেনে) গরম করে আলমারিতে (র্যাকে) তুলে রাখলুম। অবশ্য র্যাক থেকে নামানোর
সময় ওটা পাস্তা থেকে খিচুড়িও হয়ে যেতে পারে। সে যাক!
উপরে চলুন। তিনতলা হচ্ছে শোবার ঘর। খাট, বিছানা, দুটো অতি নয়নমনোহর বাহারী ‘পাপ্পল কালারের’
সোফা্, একটা ততোধিক বাহারি গ্র্যান্ডফাদার ক্লক, একটা হেলে পড়া নারকেল গাছ।
চমকানো নিষিদ্ধ।
ওটাই আর্কিটেক্টের ডিজাইন।
কে বলেছে এমন হয় না? এককালে ‘ওরাকল ফাইনান্সিয়াল সার্ভিসেস’এ কাজ করতুম।
গোরেগাঁওতে তাদের অফিস বিল্ডিং-এর মাঝামাঝি একটা ফ্লোর ওপেন,গুচ্ছের এইরকম চমৎকার পাম গাছ টাছ আছে। এখনো আছে, ওদিক
দিয়ে গেলে দেখতে পাই। তা, অফিস লবিতে যদি হতে পারে, বাড়ির শোবার ঘরেই বা না হবে
কেন বাপু!
তবে, ঘুমোতে ঘুমোতে মাথায় যদি নারকেল খসে পড়ে, এই বলে আমি একটু ক্যাঁওম্যাও
করেছিলুম। তিনি ভারি নিশ্চিন্ত গলায় বললেন, এটার নারকেল খসে পড়ে না, কেটে পাড়তে হয়।
হবেও বা। আর কথা বাড়াইনি, যা মেয়ে, বেশি বললে হয়তো গাছের ডগায় ফেভিকল মাখিয়ে
বসে থাকবে। তারপর সে প্লাস্টিকের নারকেল গাছ আমার ড্রেসিং টেবিলে জন্মের শোধ আটকে যাবে...থাক তার চেয়ে!
এই অবধি খাসা চলছিল বুঝলেন। তিনি হুকুম করছেন হাত পা নেড়ে আর আমি স্যাটাস্যাট মালপত্তর
ফিট করছি। আর একটাই তলা বাকি ছিল , চারতলা, টপ ফ্লোর।
“এটা।“
হাতে নিয়ে মুহ্যমান হয়ে থাকি একটু। প্লাস্টিকের গাছে ল্যাজঝোলা পাখি, আসলে ফ্রুট
ফর্কের সেট। ভারি শখ করে হাতিবাগান থেকে কিনেছিলুম। হাতে গোনা কয়েকদিন খাবার টেবিলে
থাকার পর আশ্চর্যজনক ভাবে গাছটা উধাও হয়ে যাওয়ার পর, খুব স্বাভাবিকভাবেই পাখিগুলো কন্যার
খেলনার ঝুড়িতে ঠাঁই পেয়েছিল। এদ্দিন পরে আমার হাতে আবার সেই গাছটা!
“আরে, রাখো ওটা? উঁহু উঁহু ওদিকে না, এদিকের দেওয়ালে , এই এই এইরকম করে।“
প্রায় আমার ভুঁড়ি বেয়ে উঠে সেটা ঠিক করে সেট করা হল।
আমি ভাবছি এবার পাখি বসবে বুঝে ডালে ডালে। ওমা, একটা ধুমসো লাল গাড়ি হাতে ধরিয়ে
দিল।
“রাখো?”
“ইকী! গাড়ি এত উপরে থাকে না! ইকী! না না…”
কে শোনে কার কথা। ওইটেই নাকি গ্যারেজ। ওখানেই গাড়ি রাখতে হবে।
“নামবে কী করে? রাস্তায় চলতে হবে তো!”
“আহ মা! ব্যাট্মোবাইল দ্যাখোনি? এই তো এইরকম ডানা খুলবে (গাড়িটা দরজা খোলা যায়
দেখে আমিই কিনেছিলুম বটে) আর হুশ্ করে উড়ে যাবে!”
যাক তবে। উড়েই যাক। আমার এমনিতেই হুঁশ
উড়ে যাচ্ছে। কথা না বাড়িয়ে গাড়ি রেখে দিই।
তারপর দুজনের একসঙ্গে খেয়াল হয়।
“ও মা, সিঁড়ি?”
“এই, উঠবে কী করে?”
এগিয়ে পিছিয়ে, এদিক ওদিক থেকে মন
দিয়ে অবলোকন করি। না, সিঁড়ি বলে চালানোর মত কিছু চোখে পড়ে না।
তারপর মাথায় বুদ্ধি আসে। দুটো খালি কৌটো, একফালি লম্বা উলের দড়ি, দুটো রাবার
ব্যান্ড।
নে, তুই আমায় ব্যাটমোবাইল দেখাচ্ছিস, আমি তোকে অরণ্যদেবের গাছবাড়ির ঝুড়ি লিফট
করে দেখালুম। এবার লিফটে চেপে যত খুশি ওঠানামা করা পুতুলদের।
এইবার, আমাদের বাড়ি কিন্তু রেডি!! হেব্বি হয়েছে, যাই বলো! বাড়ির বাসিন্দা দুই
ঝুঁটিবাঁধা কুট্টি কুট্টি পুতুলও এসে গেছে! তবে তারা এবার জামা টামা খুলে বাথটাবে
‘চাং’ করবে, তোমরা ধেড়েরা এখন এখান থেকে যাও দিকি!
Sunday, 17 November 2019
এক নিরীহ রোব্বারের বিকেল
কাউকে কিচ্ছু করিনি মশাই! মনের আনন্দে একটা নিরীহ নিরুপদ্রব রোব্বারের বিকেল কাটাচ্ছিলুম। ভাতঘুম দিয়ে উঠে, রান্নাঘর হাঁটকে দুরকম আচার দু বাটিতে খাবলা করে এনে, কোলে তাকিয়ে নিয়ে বসে পালা করে সে দেবভোগ্য জিনিস চাখছিলুম আর একটা হেব্বি ভয়াল ভয়ংকর বই পড়ছিলুম। পাশের বেডরুম থেকে ফায়ার অ্যালার্মের চেয়েও বিকট জোরে হাঁক এলো।
"মাআয়ায়ায়ায়ায়ায়া! পাঁঁখাটা খুঁলে গেল!!!"
বিষম খেয়ে, আচারের চামচ ছুঁড়ে ফেলে, বালিশ উলটে দে দৌড়। মনে অবশ্য কূট প্রশ্ন জেগেছিল, যে এরকম নিঃশব্দে পাখা কী করে পড়ে যায়, তবে কি পাখার সত্যিকারের পাখা গজিয়ে উড়ে গেল?
হেসে লাভ নেই। এবাড়ির যা বীর বাতাস, প্যাকেট ভর্তি ওষুধ বা রান্নাঘরের কৌটো অতীতে বাতায়নপথে হাওয়ায় উড়ে গেছে। পাখার পক্ষী হওয়াই বা অসম্ভব কিসের!
তা, গিয়ে দেখি, সত্যিই খুলে পড়ে গেছে বটে। পড়ে গিয়ে শুধু যে তার একটা ব্লেড তেড়েবেঁকে গেছে তাই নয়, তার নিচে থাকা সাধের তিনকোনা টেবিলটাও দু টুকরো হয়ে গেছে!
বহু কষ্টে, বহু মাথা খাটিয়ে সেসব সারিয়ে সুরিয়ে সবে আচারের কাছে ফিরতে যাব, পচ্ করে জলে পা পড়ল।
কাঁহাসে জল আয়া রে বাবুয়া?
তদন্ত সমাপনান্তে বোঝা গেল বাথটব লিক করছে। সবে এই সকালেই ফিক্স করা হয়েছে, এর মধ্যেই তার দেহ রাখার দশা দেখে মেজাজ গেল চড়াং করে গরম হয়ে। যন্তরপাতি নিয়ে আবারও লেগে পড়লুম। এ ব্যাপারে আমার কন্যা আমার যোগ্য সহযোগী, তাকে টেপ চাইলে পেনসিল দেয়, দড়ি চাইলে আঠার শিশি। ঘাড় ব্যথা করে, সেসব পুলটিস মেরে, লীকপ্রুফ করে তবে উঠেছি, তিনি গলায় সওয়া চামচ মধু ঢেলে বললেন, "কমোডটাও হেলে গেছে মনে হচ্ছে, মাঁায়ায়া!"
এইবার ভারি রাগ হল। এটা বাড়ি, না দক্ষযজ্ঞ নৃত্যাভ্যাসের পাঠশালা? অ্যাঁ? এটা মেয়ে, না আখখুটে আবদাল্লা? বলি, সব ঘরদোর পরিপাটি করে রেখে, ভালো করে দেখে তবে ঘুমোতে গেছি, আর এর মধ্যেই কিনা এত কিছু বিগড়ে রেখেছে!
কপাল! কপাল! মনে মনে চোখ বন্ধ করে "দীনবন্ধু কৃপাসিন্ধু কৃপাবিন্দু বিতরো" গাইতে গাইতে কমোডবাবাজীকে সিধে করলুম, তারপর চোখে পড়ল দেওয়াল ঘড়িটা চলছে না, তার কাঁটা ঘুরিয়ে দিলুম, গ্যাস সিলিন্ডার লাগালুম, সিঁড়ির ধাপে গাছ বসালুম। তারপর মনে হল, তখন থেকে মনে হচ্ছে আলমারিটা ওই দেওয়ালে মানাচ্ছে না, এতই যখন করলুম ওটাই বা আর বাদ যায় কেন!
এত কাজ মানুষে করে, বলুন তো? তাও রোব্বার বিকেলে?
আবার মিনমিন করছেন কেন?
আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেছে? আমার কর্মকুশলতায় তো?
অ্যাঁ, না? ওই পাখা পড়া...বিপজ্জনক?
দূর মশাই! ওটা কোনো বিপদ হল! ওর চেয়ে ঢের ঢের বেশি বিপদ হতে যাচ্ছিল আজ, তা জানেন?
"ম্যাঁ, এইখান থেকে নিয়ে নিচ্ছি বুঝলে, কিছু টের পাওয়া যাবে না।"
এই মোক্ষম সময়ে মা যদি তার লেখার অতল থেকে কান বাড়িয়ে কথাটা শুনে না ফেলত, যদি তার মগ্নচৈতন্যে প্লটের পিন্ডি চটকে এর অর্থ মরমে না পশিত, যদি সে হাঁ হাঁ করে ঝাঁপিয়ে পড়ে কন্যার হাতের উদ্যত কাঁচি কেড়ে না নিত - তো ঘরের বাহারি ফুলেল পর্দার কোমরের কাছে জন্মের শোধ দু ইঞ্চি বাই দু ইঞ্চি সাইজের দুটো গর্ত হয়ে যেত। হুঁঃ!
অবশ্য, তাতে ডলহাউসের জানলার পর্দা ঘরের পর্দার সঙ্গে ম্যাচিং ম্যাচিং হত।
নিন, দেখুন দিকি, কেমন দাঁড়াল মা মেয়ের হাতের কাজটা?
Monday, 21 October 2019
ভাতঘুম
ভদ্রমহিলা মনের আনন্দে ঘুমোচ্ছিলেন।
না ঘুমোনোর কোনো কারণ নেইও। ভোট উপলক্ষ্যে একটা মুফতে ছুটি পাওয়া গেছে, বাজার যেতে হয়নি, বারোটা নাগাদ হেলেদুলে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে চমৎকৃত হয়ে দেখেছেন তাঁর জন্যই সবাই অপেক্ষায়, মানে একদম ফাঁকা আর কী, তারপর আঙুলে ‘পোলিওর দাগ’ নিয়ে চাট্টি লেবু-শসা কিনে ফিরে এসেছেন রেকর্ড সময়ে, চান করে চিংড়ির মাথা দিয়ে চচ্চড়ি, মটর ডাল, ট্যাংরার ঝাল ইত্যাদি সহযোগে ভাত খেয়েদেয়ে বালিশ আঁকড়ে ভাতঘুম দিচ্ছেন, মনে আনন্দ থাকবে না তো কি অমর আকবর অ্যান্টনি থাকবে?
ঘুমটা একটা মোলায়েম, মাজা, মাখন মাখন ব্যাপার হয়ে এসেছে, স্বপ্ন দেখছেন এক বিয়েবাড়ি গেছেন, তারা বিরিয়ানির নেমন্তন্ন করেছে, কিন্তু খেতে আর দিচ্ছে না বলে আমন্ত্রিতরা ঘোঁট পাকাচ্ছে, অথচ ভদ্রমহিলা নাকে টের পাচ্ছেন রান্না হয়ে গেছে, আমন্ত্রণকারীরা কেউ সেখানে নেই যে জিজ্ঞাসা করবেন, তাই সবাই মিলে সেই লুক্কায়িত বিরিয়ানির খোঁজে যাওয়া হবে বলে টর্চ দড়ি ইত্যাদি জড়ো করা হচ্ছে, এমন সময়ে,
“মা?!!”
চোখ খুলতে না খুলতে কোমরে খোঁচা।
“অ মা!! করি?”
ভদ্রমহিলা তার অব্যবহিত পূর্বে মন দিয়ে নিমন্ত্রণবাড়ির ম্যাপ দেখছিলেন। ভারি সন্দিগ্ধ গলায় বললেন, “করবি? কী করবি? কেনই বা করবি?”
তাঁর ক্ষীণ আশা ছিল মেয়ে হয়তো বলবে ‘অঙ্কের ওয়ার্কশীটটা’, বা ‘গান প্র্যাকটিস’। সে আশায় জলাঞ্জলি দিয়ে তিনি বললেন, “ডেকোরেশন?”
মা ততক্ষণে আবার আধোঘুমে বিরিয়ানির সন্ধানে উতলা হয়ে পড়েছেন, তিনি বললেন, “বিয়েবাড়িতে আবার কী ডেকোরেশন করবি, করাই তো আছে।“
কন্যা তুমুল চেঁচিয়ে জানায় সে বিয়েবাড়িতে কিছু করছে না। সে এই বাড়িতে করছে, এই ঘরে করছে, এবং মায়ের অফিসের ব্যাগে করছে।
ঘুমঘোরেও মায়ের কানে ‘অফিসের ব্যাগ’ শব্দবন্ধদুটি পৌঁছয়, এবং তৎক্ষণাৎ তিনি সটাং উঠে বসে “এই এই খবরদার আমার অফিসের ব্যাগে একদম হাত দিবি না, ইচ্ছে হলে আমার লাল ব্যাগটায় কর গে’” বলে চিক্কুর ছেড়ে আবার ধপাস করে শুয়ে পড়েন।
এবার কন্যা দেড়গজী কত কিছু বলে যায় সে আর তাঁর কানে যায় না।
“মা করি?”
“হুঁ। লাল ব্যাগে।“
অতঃপর তিনি আবার সেই রহস্যময় বিয়েবাড়ির লুক্কায়িত বিরিয়ানির সন্ধানে দলবল নিয়ে চলে যান। সেই ঘোর অ্যাডভেঞ্চারে কখনো তাঁর মুখের উপর বাদুড়ে পাখা বুলিয়ে যায়, কখনো পায়ের উপর স্পষ্ট টের পান সরীসৃপের ছোঁয়া।
আধঘন্টা পরের আপডেট –
ভদ্রমহিলা চোখ খুললেন। ঘুম যেন আঠার মত চোখে জড়িয়ে আছে। পা নাড়তেই কিসব খসখস করে উঠল। হাত তুলে চোখমুখ মুছতে গিয়ে মুখের চামড়া এক লেয়ার উঠে এল যেন হাতে।
ভয় খেয়ে উঠে আয়নার মুখোমুখি বসার পর দেখলেন মুখমণ্ডলে পুরু করে কন্যার ক্রীমের প্রলেপ, তার উপর স্কেচপেনের আঁকিবুকি, যা কিনা তাঁর হাতের তাড়নায় ধেবড়ে গেছে।
সর্বশেষ আপডেট -
ভদ্রমহিলা খাটে বাবু হয়ে বসে, ভয়ানক সব মুখভঙ্গিমা সহযোগে নিজের পায়ের ডিম থেকে সোনালী, লাল, ব্রাউন, স্বচ্ছ নানা কিসিমের সেলোটেপ চড়াং চড়াং করে টেনে খুলছেন। এখনো জানেন না, অন্য ঘরে তাঁর বাজারের লাল ব্যাগ স্কেচপেনে রামধনু রঙ হয়ে, তাঁর ওষুধের বাক্স সারা গায়ে স্টিকার চড়িয়ে এবং এক নিরীহ ঘুমন্ত দাদুমণি মাথায় গোটা চারেক রঙ্গীন ব্যাণ্ড দিয়ে বাঁধা ঝুঁটি নিয়ে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে।
Saturday, 24 August 2019
দ্রিঘাংচু
যেই একটু নিজের কাজে বসব, অমনি অবধারিতভাবে ছোট মানুষটির আগমন ঘটবে। হুস করে ঢুকে
হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে হুস্-তর গতিতে বেরিয়ে যেতে যেতে বলে গেল,
“মাঁ! গণেশটা কী সুন্দর এঁকেছি না? পরশুরামও আছে।“
সে তো দিব্যি নাচতে নাচতে পালাল, আমি এদিকে কাগজটার এপিঠ ওপিঠ আগাপাস্তলা খুঁজে
ট্যান খেয়ে বসে রইলুম। ওপিঠে কিস্যু নেই, এপিঠে দিব্যি নধর গণুবাবা আছেন, তাঁর মাথায়
মুকুট, হাতে কুঠার, সামনে লাড্ডুর থালা, পায়ের কাছে পুঁচকে ও মিচকে ইঁদুর সব আছে, কিন্তু
সেই ক্রোধী মুনিটি কই? তাঁর জটার একগাছা চুলও তো দেখতে পাচ্ছি না!
ইতিমধ্যে লাট্টুর মত
পাক খেতে খেতে তিতির পুনঃপ্রবেশ করেছে।
“অমন ঘুরপাক খাচ্ছিস
কেন, পড়ে যাবি যে!”
“আমি এখন আথ্! আথ্
এমনি করে চলে।”
বড়ই ভাবনার বিষয়। খাটের
পাশের অপ্রশস্ত জায়গায় আহ্নিক গতি হতে থাকলে আমি যাই কোথায়!
আমার চিন্তা টের পেয়েই
হয়তো তিতির আশ্বস্ত করল,
“তোমায় একটা কথা বলতে
এলুম খালি!”
ভনিতা করছে মানেই
গড়বড়, কিছু উৎপটাং বায়না আসছে মনে হয়। তড়িঘড়ি কথা ঘোরাই,
“হ্যাঁ রে, তোর পরশুরাম
কই?”
সলজ্জ হাসি সহযোগে
উত্তর এল, “ওটাই তো বলতে এলুম! ভুল বলেছি, পরশুরাম নয়, পরশু। গণেশের হাতে আছে।"
বেচারি! প্রবাসে বড়
হয়েও বাংলা শব্দভাণ্ডার তার এত বড়সড়, গুলিয়ে গেলে কী আর করা! বাংলা, ইংলিশ, হিন্দি
এবং মারাঠী নিয়ে জাগলারি করতে হলে অমন একটু আধটু হতেই পারে। নাহয় এখনো ‘ফেব্রিক
কালার’কে সমানে ‘ফাইব্রাস কালার’ বলে যাচ্ছে, এই কিছুকাল আগেই আমাদের সে খাবার ‘সার্ভাইভ’
করে দিতে চেয়েছিল – তাই বলে পরশুকে পরশুরাম বলে ফেলেছে বলে হাসব নাকি! শব্দটা জানে
এই না কত!
এইসব বিবেচনা করে খুব
গম্ভীর থাকার চেষ্টা করছিলুম, হাসিটাকে গালভরা পানের মত একবার এদিক একবার ওদিক করছি,
হঠাৎ খেয়াল হল হোমটাস্ক বাকি আছে।
কম্পি টম্পি ফেলে হাঁক
পাড়লুম, “ওরে ল্যাবেঞ্চুশ, বলি সারাক্ষণ ছবি আঁকলে আর নেত্য করে বেড়ালেই চলবে? শিগগির
বইখাতা নিয়ে আয়!”
গতিজাড্য খুব খারাপ
জিনিস বুঝলেন? ওতে গালে হামি পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু কচি মাথার গুঁতোয় চশমাও নাক থেকে
খসে পড়ে যায়।
যাইহোক। পনেরো মিনিট
পরের দৃশ্য।
খাটে বইখাতা ছড়ানো।
মেয়ে ছোট টেবিল পেতে লিখছে। মা অতি বিপন্ন ভাবে নেট হাতড়াচ্ছে।
মায়ের হিন্দির যা অপূর্ব
দক্ষতা, নেট না হাতড়ে উপায়ও নেই। দিম্মা থাকলে তিনিই করান এই সাবজেক্টটি, তিনি
একদা স্কুলে হিন্দি পড়েছেন, কর্মসূত্রে বলেওছেন বহুবার, মায়ের চেয়ে অন্তত ভালো
জানেন। দাদুমণির হিন্দি শোনার অযোগ্য ভয়াবহ, অতএব মায়ের আপাতত গুগলঠাকুর ভরসা।
ক, কা, কি... ইত্যাদি
দিয়ে শব্দগঠন ছিল। দিব্যি চলছিল, ঠেকে গেল ‘ঃ’তে এসে।
তিতির যেই না নাকের ডগায়
চশমা ঠেলে প্রবল সিরিয়াস মুখে বলেছে, “কঃ!” অমনি আমার ‘দ্রিঘাংচু' মনে পড়ে গেছে! তারপর
না হেসে পারা যায়? হাসামাত্র ওদিক থেকে কৈফিয়ত তলব, “হাসছ কেন, হাসছ কেন?” তখন ছোট্টটাকে
বলতেও হয় গল্পটার কথা, তারপর দুজনে মিলে জাপটাজাপটি করে হেসে কুটিপাটি হতেও হয়,
তারপর রাত্রে আসল গল্পটা পড়ে শোনাব কথাও দিতে হয়, তারপর দেখা যায় সর্বনাশ সমুৎপন্ন হইয়াছে।
কঃ দিয়ে আমি কোনো শব্দ
জানি না। কোনোই না।
এদিকে তিতির ‘আমার মা
সব জানে’ গোছের মুখ করে চেয়ে আছে।
কী আর করি, লেখার সময় শব্দ
ভেবে না পেলে যা করি, তাই সাজেস্ট করলুম।
“চ, বার বার বলে দেখি,
ঠিক মাথায় কিছু না কিছু এসে যাবে।“
আরো মিনিট দশ পরের দৃশ্য।
মা আর মেয়ে মুখোমুখি বসে “কঃ?” “কঃ!” করে যাচ্ছে, করেই যাচ্ছে, দাদুমণি আর আন্টি
উঁকি মেরে দেখে পালিয়েছে। এমন সময়ে ডাকাডাকিতে আকৃষ্ট হয়ে নাটকের পরবর্তী কুশীলব
জানলায় এসে বসল, তারপর সেও আমাদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ‘ক্কঃ!’ ‘ক্যাঁঃ’ করতে লেগে
গেল।
কে জানে সেটা কাক না
দ্রিঘাংচু!
Monday, 15 April 2019
নববর্ষ
একে তো অফিস ছিল। শুধু অফিসই ছিল না, কাজও ছিল পাগলপারা।
বাড়ি এসে তিতির ও তার দিম্মাকে নিয়ে ফের বেরোলুম ঘুরতে। বচ্ছরকার দিন বলে
কথা! ঘুরতে ঘুরতে খেয়াল হল, ঘরে পরার চটির স্ট্র্যাপ পটাং হয়েছে। আহা, কী আনন্দ,
এই তো নতুন কিছু কেনার উপলক্ষ্য পাওয়া গেছে!
ডি-মার্ট থেকে যখন বেরোলাম, একহাতে দু লিটার কোল্ডড্রিঙ্ক, অন্যহাতে ঠাসা
উপচে পড়া থলি, সে এত ভারী যে বেঁকে গেছি সেদিকে।
ওদিকে আমি কিন্তু নিজের জন্য ওই একজোড়া ঘরে পরার হাওয়াই-ই কিনেছি!
বাকিসব "কোথা হইতে কী হইয়া গেল" কেস।
বাড়ি এসে দেখলুম, প্লে ডো। স্বাভাবিক। তিতির গত কয়েকদিন ধরেই এটার বায়না
করছিল। তারপর আরো দুই না তিন জোড়া ধুমসো হাওয়াই চটি। কার, কেন, কিচ্ছু জানি না।
একটা বদখৎ দেখতে হাতা, তার সবটাই প্রায় ফুটো। 'খামোকা দাম দিয়ে ফুটো কিনেছ কেন'
বলতে যাওয়ায় যুগপৎ দিম্মা-নান্নীর কণ্ঠনির্ঘোষে যে প্রতিবাদসমুদ্র উৎপন্ন হল তার
কথা আর না বলাই ভালো।
তার প্রতিশোধও নিয়েছি অবশ্য। হাতে পেলুম একটা কাপড়ের টুকরো, সেটা ঝাড়নও হতে
পারে, ঘরমোছা ন্যাতাও হতে পারে, এমনকী পাপোশ হলেও আশ্চর্য হব না। পাওয়ামাত্র
সুন্দর করে মায়ের বাথরুমের রডে টাঙিয়ে দিয়ে এসেছি, কাল চেঁচামেচি করলে বলব
ভেবেছিলুম তোয়ালে বুঝি।
তারপর আরো হাজার গণ্ডা কাজ সেরে ফেললুম।
দিনের শেষে, ক্লান্ত শরীরে ধুপুস করে বিছানায় পড়ে যাবার পরেও দিন ফুরোয় না।
"মা, ও মা?"
"উঁ?"
"সারপ্রাইজ! এই নাও।"
একটা নানারঙের প্যাস্টেল কালারের দাগে ছয়লাপ পুরোনো পেন্সিল বক্স, যাকে
কোনো অজ্ঞাত কারণে তিতির "কম্পাস" বলে। এবছর নতুন কম্পাস পেয়েছে নতুন
ক্লাসে উঠে, তাই এটা বাতিল হয়েছিল। সেইটি হাতে ধরিয়ে দিয়ে, মেয়ে আগ্রহে
হুমড়ি খেয়ে বুকে উঠে পড়ে প্রায়।
"খোলো না? খোলো?"
খুলি।
দুটো পেন। ইয়ার ফোন। আপিশের ড্রয়ারের চাবি। ফোন খোলার কাঠি। গ্লু
স্টিক।
আপিসের ব্যাগের বাইরের খোপে পড়ে থাকে এগুলো। দরকারমত হাতড়ে বার করে
নিই।
পরিপাটি গুছিয়ে রাখা।
আর একটা পুঁচকে প্লাস্টিকের ল্যাজমোটা শেয়াল।
"ওইটে নিয়ে খেলবে মাঝে মাঝে, হুঁ? তোমায় পয়লা বৈশাকে দিলুম, তোমার তো
কম্পাস নেই একটাও..."
নববর্ষে নতুন জিনিস গিফট করার নিয়ম যে করেছিল সে কিচ্ছুই জানে না। আমার যেন
বছর বছর এমন বাতিল গিফটই জোটে।
ভালবাসার পুরোনো হয় না যে!
Labels:
Bangla,
Bengali,
Bombay,
chappal,
D Mart,
Indoor play,
office,
pencil-box,
play,
school,
shoe,
shop,
shopping,
Titir
Sunday, 31 March 2019
ফায়ার ড্রিল
তো তেমন হলে কী করবে?
দাদুমণিকে এইসব শিখতে হচ্ছে এখন। দাদুমণি কিনা অনেক অনেক দিন আগে ইক্কুলে পড়েছিল,
তখন এসব শেখাত না!
আর আন্টিকেও। আন্টি কিনা গ্রামের ইক্কুলে পড়েছে।
মায়ের আপিশে এসব হয়, হলে আবার সিঁড়ি দিয়ে হেঁটে হেঁতে এগারোতলা নামায়, তাই মায়ের
ছাড় আছে।
“এই মনে করো তুমি বসে আছো, এই মনে করো ফায়ার অ্যালার্ম বাজল, এই মনে করো সিঁড়ি”
পাশ দিয়ে যেতে যেতে মা ফুট কাটে, “এই মনে করো গেছো বৌদি রান্না করছে, এই মনে
করো গাছের গায়ে একটা ফুটো...”
গুঁতিয়ে, ঢূঁসিয়ে, ঠেলে মূর্তিমান উৎপাতকে বিদ্যায় করে আবার টিচারের ক্লাস
চলে।
“সিঁড়ি বুঝেছ – লিফটে যাবে না কিন্তু ফায়ার
অ্যালার্ম বাজলে, হুঁ, আটকে যাবে, বুঝবে তখন!”
মা চুপি চুপি উঁকি মেরে দেখে, ভারি আমোদ লাগে নাকে গোল চম্মা মেয়ের গ্রাম্ভারি
চালচলনে। আহা, তাদের সময়ে তো আর এসব ছিল না! স্কুলে লিফটই বা তখন কই!
“দরকারি জিনিস সব গুছিয়ে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে যাবে দরজা দিয়ে। সোওওওওজা
নিচে, ফাঁকা জায়গায়। দাঁড়াবে না, আবার ঠেলাঠেলিও করবে না।“
ওমা, এসবের কয়েকদিন পরেই, রাত্তিরে যেই না মা টিভি চালিয়েছে, অমনি ঘরের আলো
গুলো ধুকপুক করতে লাগল। মা তো অমনি টিভি ফ্রিজ সব বন্ধ করে ইলেক্টিক্কাকুকে ডেকে
পাঠাল।
“কী হঁবে? ও মাঁ কীঁ হবে?”
“থাম বাপু। দেখছিস তো কাকু কাজ করছে!”
এদিকে কাকু টুলে চড়ে প্যাঁচ কষতে
কষতে “শর্ট সার্কিট” শব্দ উচ্চারণ করে ফেলেছেন। অমনি ছোটজন হাউমাউ করে, হুলুস্থূল
করে, পিঠে পটাং করে স্কুলব্যাগটা গলিয়ে রেডি।
অন্ধকারে বুঝিনি তখন,
পরে আন্টির থেকে শুনলুম, আমি যখন কাকুর সঙ্গে টর্চ বাগিয়ে নেত্য করছি, তিনি নাকি তাঁর সব দরকারি জিনিস
নিয়ে তক্ষুনি ঘরে ছেড়ে বেরিয়ে চলে যাবেন বদ্ধপরিকর হয়ে পড়েছিলেন। ভুলিয়েভালিয়ে বহু
কষ্টে তাঁকে শান্ত করা গেছে।
রাতে শুতে এসে জিগালুম,
“হ্যাঁরে, পিঠে স্কুলব্যাগ চাপিয়ে দাঁড়িয়েছিলি কেন?”
“যদি শট্ সাক্কিট্
হত? দরকারি জিনিস গুছিয়ে নিয়ে নেমে যেতে হত না?”
তা হত বটে, মানতে বাধ্য
হই। আচ্ছা, স্কুলব্যাগটাই সবচেয়ে দরকারি মনে হয়েছে কন্যার। তা বেশ।
“আর বাঁহাতে পঈসা
ফেলার ব্যাঙ্কটা নিয়েছিলুম।“
একটা পিগিব্যাঙ্ক আছে
বটে। চেয়ে, ভাল কাজ করে, বাজারের ব্যাগ থেকে কুড়িয়ে, মাকে পটিয়েপাটিয়ে বা কেড়ে নিয়ে
এরকম নানা উপায়ে সেটা প্রায় ভর্তিও হয়ে এসেছে।
গুড, গুড, ভেরি গুড।
একই সঙ্গে লক্ষ্মী সরস্বতী দুই-ই দরকারি বুঝতে শিখে গেছে। এ মেয়েকে আর ঠেকায় কে!
“তা হ্যাঁ রে, ডান
হাতটা খালি রাখলি কেন? তাতে আর কিছু দরকারি জিনিস নিবি না?”
তারপর, দুটো মাথার
বালিশ ঠেকাঠেকি করে, গায়ে গায়ে গুটিসুটি মেরে শুয়ে, একটা ‘দরকারি জিনিস’ খুব
লুকিয়ে লুকিয়ে চোখের কোল বেয়ে গড়িয়ে আসা গরম জলটা মুছে নেয়।
“ওমা, নেব তো! ও হাতে
তো তোমার হাত ধরব। নিয়ে না গেলে যদি পড়ে থাকো একা একা?”
Sunday, 24 March 2019
রাজা ও বাঁদরছানা
“ও তিতির। আর কতক্ষণ ধরে খাবি? মুখ চালা রে!”
“আমি তো যথাসম্ভব দ্রুত খাচ্ছি মা!”
আজ্ঞে। ওই হতভম্ব সরলহৃদয়া স্নেহশীলা (উভয়ার্থে ) মহিলাটি আমিই। হাঁ করে যার দিকে চমৎকৃত চক্ষে চেয়ে আছি, সেও আমারই একমাত্তর নাড়ি ছেঁড়া ধন।
নাহয় শীর্ষেন্দু পড়াই, নাহয় ত্রৈলোক্যনাথ পড়াচ্ছি। তাই বলে একটা আজন্ম বোম্বেতে বড় হওয়া স্কুলে ইংলিশ হিন্দি মারাঠি শেখা ছানা এমন শুদ্ধ বাংলায় জবাব দেবে! এটা বাক্যালাপ, না শরদিন্দুর ঐতিহাসিক উপন্যাস হে!
মনের মধ্যে গুনগুন করে জবাব আসে, আর তুমি নিজে যে সুযোগ পেলেই স্কুলের খাতায় বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষায় রচনা
লিখে আসতে, তার বেলা?
যাকগে যাক। কিন্তু এদিকে সত্যিই যে মুখ বড়ই ধীরে চলছে। সমস্ত মনোযোগ কালি ফুরোনো ডটপেন আর বাতিল টুথব্রাশ দিয়ে ডাইনোসরের ডেন্টাল ক্লিনিং এ। এবার মাকে আসরে নামতেই হয় দেখছি।
"এই শোন না। একটা খাসা গল্প পেয়েছি। মৈ মাসি দিয়েছে৷ শোন না, শুনবি?"
যেই না গল্পের লোভে স্থির হয়ে বসেছে, টপ করে মাছভাতের গোল্লা যথাস্থানে চালান করি।
"হুঁ শোন। একটা না রাজা ছিল। রাজার না একদিন শখ হয়েছে শিকার করতে যাবে।"
"মী-গয়া।"
"ঠিক ঠিক৷ মৃগয়া করতে যাবে। (এটা ছবিতে রামায়ণের ফল)। তো রাজা তো রেডি হল সেই মত - খাকি জামা আর হাফপ্যান্ট পরেছে, চোখে সানগ্লাস, মাথায় টুপি, আর পায়ে বুটজুতো।"
রাজার হাফপ্যান্ট বা টুপি যদি বা সহ্য করে নিয়েছিল, বুটজুতো আর সইল না।
"নায়ায়ায়ায়ায়ায়া! রাজা পায়ে নাগরা পরে।"
আমিও ছাড়তে রাজি নই।
"এহ, যাচ্ছে জঙ্গলে, কত কাঁটা খোঁচা পোকা মাকড় জোঁক আছে তার ঠিক নেই - নাগরা ফাগরা চলবে না।"
খানিক টালবাহানার পর ঠিক হল সে রাজকীয় বুট পরবে, তার ডগাটা নাগরার মত শুঁড়তোলা।
“চলল রাজা তরোয়াল বাগিয়ে ধপাং
ধপাং করে। জঙ্গলে ঢুকে দেখে কি…”
“বাঘ নাঁ!”
“আচ্ছা বাঘ না। দেখে কি একটা…”
“ভাল্লুক নাঁ!”
“অ্যাঁ! আচ্ছা বাঘ ভাল্লুক কিছুই
না। দেখে কি একটা বাঁদর। খুব মিষ্টি দেখতে বুঝলি…”
“আমার মত?”
এরকম ভয়ংকর বিপজ্জনক দোরোখা কোচ্চেনের
উত্তর দিয়ে ফাঁসি আর কী! না না আমি অত বোকা নই।
“না, ওটা বয় বাঁদর। মানে বাঁদর,
বাঁদরী নয়।“
“তাহলে সামু মামুর মত মিষ্টি
দেখতে।“
নিশ্চিত প্রত্যয়ের ঘোষণা। যাকগে,
সে সামু মামু বুঝবে এখন। আমি গল্প আগে বাড়াই।
“হ্যাঁ সেটা আসলে বেবি ছিল জানিস।
সে না, একদম মায়ের কথা শুনত না আর সারাক্ষণ খাবার দাবার ফেলে লাফিয়ে বেড়াত বলে তার
মা খুব বকেছিল। তাই সে বাড়ি থেকে পালিয়ে জঙ্গলে চলে এসেছিল।“
যা মাথায়্ আসে তাই বকে যাই। এখনো
মাছভাত বাকি, তারপর চিনি দেওয়া দইয়ের বাটি অপেক্ষা করছে।
“আর তারপর না …রাজা আর বাঁদরে
যুদ্ধ। সে কী যুদ্ধ ভাবতে পারবি না। শেষে বাঁদর দিয়েছে একটা বিকট বাঁদুরে ভেংচি কেটে
– আর রাজা ভয়ে পগারপার।“
“মা? মাম্মা বাঁদর কাঁদছে না?”
যার যেদিকে মন!
“হ্যাঁ রে, মাম্মা বাঁদরের তো
খুব মন খারাপ। সে সব জায়গায় ছানা খুঁজতে খুঁজতে এসে রাজপ্রাসাদে হাজির। সেখানে এসে
দেখে রাজা মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে তার চেয়েও জোরে হাউ হাউ করে কাঁদছে।
আরে, আরে, কাঁদে না! এই নাও বাঁদুরে
বিস্কুট খাও। এবার বলো তো বাছা কী হয়েছে?
আঁ আঁ আঁ …আমার তলোয়ার…অ্যাঁ
অ্যাঁ…একটা পাজি বাঁদর… অ্যাঁ অ্যাঁ … নিয়ে নিয়েছে! জঙ্গলের মধ্যে! অ্যাঁ! আমায় ভেংচিও
কেটেছে! অ্যাঁ্যাঁ্যাঁ!!!!!!!
বাঁদরের মা তো রাজার মাথায় অনেক
হাত বুলিয়ে বিস্কুট টিস্কুট খাইয়ে তাকে শান্ত করল। তারপর মাম্মা বাঁদর, রাজা, মন্ত্রী,
সেনাপতি সবাই মিলে জঙ্গলে চলল রাজার তলোয়ার ফিরিয়ে আনতে।
জঙ্গলে গিয়ে দেখে কি, সেই ছানা
বাঁদর না, রাজার তলোয়ার দিয়ে গাছ থেকে কলার কাঁদি কেটে নামাচ্ছে। এরা যেই হইহই করে
উঠল, সে অমনি মুখ ঘুরিয়ে দেখে, মাম্মা!
ছানা অমনি সব ফেলে একলাফে মায়ের
কোলে।
ও মাঁ! খিদে পেয়েছে, বাঈ যাব!
মাম্মা তখন আর বকবে কী, ছানাকে
আদর করে কূল পায় না!
তারপর মাম্মা ছানা ট্যাঁকে বাড়ি
চলে গেল, গিয়ে ছানাকে চিঁড়ে মুড়কি দুধ কলা দিয়ে ফলার মেখে দিল খেতে, আর রাজা তার তলোয়ার
নিয়ে সবাইকে নিয়ে ফিরে গেল রাজপ্রাসাদ। হয়ে গেল গল্প!“
অমনি এই ছানাটাও শেষ চামচ চেটে
খেলি করে হুপ্ করে এক্ লাফে মায়ের কোলে উঠে পড়ল। তারপর ঘুমু করতে গিয়ে আবার অন্য গল্প…কিন্তু
সে আবার পরে আরেকদিন তোমাদের শোনাব।
Subscribe to:
Posts (Atom)






